চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে আবারও জালিয়াতি করে পণ্যছাড়
নিউজ ডেস্ক:
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে আবারও অবৈধভাবে পণ্যছাড়ের ঘটনা ঘটেছে। সাইবার অপরাধীরা কাস্টমসের দুই কর্মকর্তার ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সার্ভারে ঢুকে জাল ইমপোর্ট পারমিট (আইপি) সনদ জমা দিয়ে অন্তত ১৫০ টন পণ্য বন্দর থেকে ছাড় নিয়েছে।
এ ঘটনা তদন্তে গত সোমবার চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস। কমিটির প্রধান করা হয়েছে কাস্টমসের যুগ্ম কমিশনার তাফসীর উদ্দিন ভূঁইয়াকে। সাত কর্মদিবসের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পক্ষ থেকেও একটি কমিটি গঠনের প্রস্তুতি চলছে।
বিষয়টি কাস্টমসের নজরে আসে গত ৭ নভেম্বর। গত জুন থেকে অক্টোবরের মধ্যে এসব পণ্য কনটেইনারে চীন, হংকং ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে জাহাজে করে চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছে।
আমদানিকারকদের মধ্যে ছয় প্রতিষ্ঠান ঢাকা ইপিজেডে এবং তিনটি ঈশ্বরদী ইপিজেডের।অবৈধভাবে পণ্য ছাড় করে নেওয়া আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে ঢাকা ইপিজেডের গ্রামীণ নিটওয়্যার লিমিটেড, একটর স্পোর্টিং লিমিটেড, টাইগার কো. লিমিটেড, হেলিকন লিমিটেড, শান্তা ডেনিমস লিমিটেড। আর ঈশ্বরদী ইপিজেডের কুং কেং টেক্সটাইলস (বিডি) কম্পানি লিমিটেড, এমজিএল কম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড, গোল্ড শাইন ইন্ডাস্ট্রিজ ও ব্রাদার্স প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ।
তবে সব চালান খালাসের সঙ্গে সিঅ্যান্ডএফের একই এজেন্ট প্রত্যয় ইন্টারন্যাশনাল জড়িত। প্রতিষ্ঠানটির মালিক হাফিজুর রহমান। ফলে এই জালিয়াতির সঙ্গে তাঁকেই সংযুক্ত হিসেবে ধরে নেওয়া হচ্ছে।হাফিজুর রহমানকে ফোন করা হলে তিনি সাড়া দেননি। বার্তা দিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাতেও কোনো সাড়া দেননি তিনি।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের উপকমিশনার মিজানুর রহমান বলেন, গোপন সূত্রে খবর পেয়ে যাচাই করতে গিয়ে ১১টির মধ্যে ৯টি চালান জালিয়াতির মাধ্যমে পণ্যছাড়ের প্রমাণ পাওয়া যায়। এরপর বন্দরে থাকা একই সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের বাকি চালানের খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, আরো দুটি চালান বন্দরেই আছে। এরপর সেই দুই চালান জব্দ করা হয়। ছাড় হয়ে যাওয়া পণ্যের বিপরীতে ইপিজেড থেকে দেওয়া আইপি যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া যায় যে সেগুলো জাল। এর পরই শুরু হয় তদন্ত।
তিনি বলেন, “ধারণা করছি, সংঘবদ্ধ একটি চক্র কাজটি করেছে। সব পণ্য চালানই গার্মেন্টশিল্পের কাঁচামাল। শুল্কমুক্ত সুবিধায় সেই পণ্য আমদানি হয়, যেগুলোর আমদানি অনুমোদন দেয় ইপিজেড কর্তৃপক্ষ।”
চালানগুলোর কী অবস্থা, জানতে চাইলে কাস্টমসের উপকমিশনার (এআইআর) শরফুদ্দিন মিয়া বলেন, “লক করা দুটি চালানের কনটেইনার খুলে পণ্যের কায়িক পরীক্ষা শুরু হয়েছে গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে। ফল এলেই জানতে পারব, ঘোষণার বিপরীতে কী পণ্য আছে।”
উল্লেখ্য যে, পণ্যছাড়ের ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম কাস্টমসের দুই রাজস্ব কর্মকর্তা আমির হোসেন ও জয়নাব বেগমের ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা হয়।
জানতে চাইলে আমির হোসেন বলেন, “২৩ আগস্টের আগেই আমাকে ইপিজেড থেকে বদলি করে কাস্টম হাউসে নিয়ে আসা হয়। নিয়ম অনুযায়ী কোনো কর্মকর্তা বদলি হলে এরপর তাঁর পাসওয়ার্ড বদল করা হয়। কিন্তু আগের সেই আইডি কেন বাতিল করা হয়নি, তা আমি জানি না। আর এই ঘটনার সঙ্গে আমি কোনোভাবেই সম্পৃক্ত নই।”
চট্টগ্রাম বন্দরে ২০১৯ সালেও একই ধরনের পণ্যছাড়ের জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়েছিল। সেই জালিয়াতির ঘটনায় ফৌজদারি মামলা করে কাস্টমস। দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) বিষয়টির তদন্ত করে। কিন্তু প্রকৃত জালিয়াতচক্রটির বিচার নিশ্চিত হয়নি। এ কারণে আবারও এমন ঘটনা ঘটল।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার মোহাম্মদ ফখরুল আলম বলেন, “তদন্তের সুপারিশের ভিত্তিতে আমরা জড়িতদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করব। ঘটনাটি পিবিআই, র্যাব ও সিআইডিকে দিয়ে তদন্ত করানোর জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে সুপারিশ করা হবে।”
ফখরুল আলম আরো বলেন, “এই ধরনের জালিয়াতি ঠেকাতে রাজস্ব বোর্ডের সার্ভারে লগ ইন করার সময় আমরা এখন মোবাইলে ওটিপি চালু করেছি, কিন্তু সেটাও পূর্ণ সমাধান নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত ব্যবহারকারী সতর্ক ও যত্নবান না হবেন, ততক্ষণ দুর্বলতা থেকেই যাবে।”

