দিনাজপুরে লিচু নিয়ে আতংক!
দিনাজপুর প্রতিনিধি:
বাগানে ঝুলছে প্রকৃতির রসগোল্লা খ্যাত থোকায় থোকায় লাল টসটসে লিচু। মৌসুমের এই ফলটি দেখতে লোভনীয় এবং খেতেও সুস্বাদু। তবে লিচু বাগানের আশপাশের বাসিন্দাদের মধ্যে আছে অজানা ভয় আর আতংক! এ ভয় আর আতংক তাদের শিশুদের নিয়ে।
গত বছরের এই সময়ে ঝড়ে পড়া লিচু খেয়ে দিনাজপুরে মারা যায় ১১শিশু। তাদের মৃত্যু নিয়ে রোগ তত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) কীটনাশকের প্রভাবকে শিশু মৃত্যুর কারণ হিসেবে লিচুকে দায়ী করে। এ নিয়ে শুরু হয় ব্যাপক তোলপাড়। আর এ ঘটনার পর থেকে এখনো আতঙ্ক কাটেনি লিচু পল্লীতে বসবাসকারী পরিবারগুলোর। প্রতিটি মুহূর্ত তাদের কাটছে শঙ্কায়। পাহারা দিয়ে রাখা হয় শিশুদের যেন তারা লিচু বাগানে ঢুকে কীটনাশক দেয়া ঝড়া লিচু কুঁড়িয়ে খেতে না খায়।
এ দিকে বাগান মালিকরা তাদের বাগানে সর্তকতামূলক সাইন বোর্ড ঝুলিয়ে দিয়েছে। তাতে লিখা রয়েছে, “নিরাপদ আম ও লিচু উৎপাদন, বাগানে অনুমোদিত কীটনাশক অনুমোদিত মাত্রায় ব্যবহার করা হয়। বালাইনাশক স্প্রে করার ১৪দিনের মধ্যে আম ও লিচু খাওয়া নিষেধ।” তবে সাইনবোর্ডে কোথাকার অনুমোদিত বালাইনাশক এবং কি মাত্রায় ব্যবহার করা হয় সেটি উল্লেখ নেই।
বাগানে কীটনাশক স্প্রে করার ১৪ দিনের মধ্যে আম ও লিচু খাওয়া নিষেধ উল্লেখ থাকলেও দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার পাল্টাপুর ইউনিয়নের সাদুল্ল্যাপাড়া ধুপি ডাঙ্গা গ্রামের লিচু বাগানে শুক্রবার দেখা গেছে ছোট শিশুরা পড়ে থাকা লিচু কুঁড়িয়ে খাচ্ছে।ওই বাগানের পাহারাদার আন্ধারু বর্মন জানান, তিন দিন পূর্বে বাগানের লিচুতে পোকা রোধে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে। গত বছরে লিচু বাগান বেষ্টিত এলাকার বাসিন্দা মো. রবি চাঁনের ছেলে মো. স্বপন আলী (৫) নামে একটি শিশু মারা যায়। রোগ তত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) তার মৃত্যু কীটনাশকের প্রভাবে হয়েছে বলে নিশ্চিত করে। সে সময়ে বীরগঞ্জের ৪ শিশুসহ জেলায় ১১শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
মৃত শিশু স্বপন আলীর দাদী জরিনা বেওয়া জানান, বাগানের পড়ে থাকা ফেটে যাওয়া লিচু খাওয়ার পর স্বপন আলী প্রচন্ড খিচুনি ও কাঁপুনি দিয়ে শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ে। এরপর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় সে মারা যায়। তবে এবার যদি কোনো শিশু মারা যায় তাহলে এলাকাবাসী ঐক্যবদ্ধভাবে বাগান মালিকের বিরুদ্ধে প্র্রতিরোধ গড়ে তুলবে বলে জানায়।
স্থানীয় বাসিন্দা সুমার আলীর স্ত্রী মহসিনা খাতুন বলেন, ‘বাগানে যখন বিষ স্প্রে করে তখন বিষাক্ত গন্ধে বাড়িতে থাকা যায় না। গত বছরের ঘটনার পর থেকে আমরা শিশুদের লিচু বাগানে গিয়ে লিচু খেতে বাধা দিয়ে থাকি। কিন্তু লিচু গাছগুলি ছোট হওয়ায় হাতের নাগালে লোভনীয় লিচু দেখে শিশুরা বাগানে ছুটে যায়। তারা সবার অগোচরে বাগানে গিয়ে লিচু খায়। তাদের তো আর বেঁধে রাখা যায় না।’
এ ব্যাপারে বীরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘লিচু বাগানে কীটনাশক স্প্রের বিষয়টি আমরা প্রতিনিয়ত মনিটরিং করছি। প্রতিটি বাগানে সচেতনতামূলক সাইনবোর্ড ব্যবহারের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তাছাড়াও নিরাপদ ফল উৎপাদনে বাগান মালিক ও ব্যবসায়ীদের নিয়ে বেশ কয়েকবার বিভিন্ন বাগান এলাকাগুলিতে সভা ও সেমিনার করা হয়েছে। সেই অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং জেলা কৃষি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।’
একই কথা জানালেন, দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক গোলাম মোস্তফা। তিনি বললেন,‘ আমরা লিচু ও আম বাগান মালিকদের নিয়ে বিভিন্ন উপজেলায় দফায় দফায় সভা-সেমিনার করেছি। এবার আর আগের মতো ভুল হওয়ার সম্ভবনা নেই। সবাই সতর্ক হয়েছে।

