বড়াইগ্রামে খৃষ্টান ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যা : বাড়ির ভাড়াটিয়া আটক
ইসাহাক আলী, নাটোর প্রতিনিধি:
নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়ায় দিনে দুপুরে সুনিল গোমেজ নামে ষাটোর্ধ এক খৃষ্টান মুদি ব্যবসায়ীকে ধারালো অস্ত্রদিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বত্তরা। রবিবার দুপুর ১২টার দিকে বনপাড়া খৃষ্টান পল্লীর মা মারিয়া গীর্জার পশ্চিম পাশে এই ঘটনা ঘটে। নিহত সুনিল গোমেজ বনপাড়া খৃষ্টান পল্লীর যোসেফ গোমেজের ছেলে।
এদিকে এ ঘটনার সাথে ধর্মীয় উগ্রপন্থি গোষ্ঠি জড়িত বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন ওই ধর্ম পল্লীর বাসিন্দারা। তবে প্রশাসন এখনো বিষয়টিকে সেভাবে দেখছে না তারপরও চোখ কান খোলা রেখেই মাঠে নেমেছে পুলিশ এমন দাবী কর্তা ব্যক্তিদের। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে পুলিশ নিহতের বাড়ির ভাড়াটিয়া ট্রাক ড্রাইভার জেলার লালপুর উপজেলার কদিমচিলান গ্রামের শফিকুল ইসলামের ছেলে আব্দুল্লাহ আল মামুন সবুজ (৩০) কে আটক করেছে। এদিকে বিকেলে একটি বেসরকারী টেলিভিশনে নিষিদ্ধ জঙ্গীসংগঠন আইএস এই হত্যার দায় শিকার করেছে বলে খবর প্রচার হওয়ায় নতুন করে আতংক ছড়িয়ে পড়েছে। নড়ে চড়ে বসেছে আইন শৃংখলা বাহিনী।
পুলিশ ও এলাকাবাসী জানায়, প্রতিদিনের মত সুনিল গোমেজ বাড়ী থেকে বের হয় রোববার সকালে গির্জায় যান প্রার্থনার জন্য। প্রার্থনা সেরে তিনি সকাল ৮টার দিকে বাড়ীর সাথেই মুদি দোকান খুলে বসেন। এরপর বেলা ১২ টার দিকে স্থানীয় কিছু লোকজন দোকানে পণ্য কেনার জন্য স্থানীয়রা রক্তাক্ত অবস্থায় সুনিল গোমেজের মৃতদেহ দেখতে পায়। এ সময় সুনীল গোমেজের মৃতদেহটি দোকানের ঝাপের নিচের দেয়ালের উপর ঝুলে ছিল। এ সময় তার হাতের মুঠিতে কিছু টাকা ধরে রাখা ছিল। তার ঘাড়ে পিঠে সহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তবে কারা কখন কিভাবে হত্যা করেছে জানাতে পারেনি তার পরিবারের লোকজন। ধারনা করা হচ্ছে দূর্বৃত্তরা খদ্দের বেশে এসে তাকে হত্যা করে কৌশলে পালিয়ে গেছে। তার ঘাড়ে একই জায়গায় ধারালো অস্ত্রের কয়েকটি কোপের গভীর ক্ষত রয়েছে।
ঘটনার পর র্যাব-৫ এর সিও মাহবুব আলম, নাটোরের পুলিশ সুপার শ্যামল কুমার মুখার্জি, ইউএনও মো. রুহুল আমিন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মুন্সী শাহাবুদ্দীন, সিআইডি ইন্সপেক্টর সেকেন্দার আলী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
এ ব্যাপারে সুনিল গোমেজের একমাত্র মেয়ে স্বপ্না জানান, তার মা কমলা গমেজ সাতদিন আগে চাটমোহরে বাবার বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন। আর স্বপ্না নিজে স্বামীর বাড়িতে থাকায় ঘটনার সময় বাড়িতে পরিবারের কোন সদস্য উপস্থিত ছিলেন না। তবে তার ভাষ্যমতে , ষাটোর্ধ্ব এই বৃদ্ধর সাথে কারো কোন শত্র“তা ছিলনা। তারপরেও এই ধরণের হত্যাকান্ডে নির্বাক তারা। এখন তারা আতংকে আছেন।
এই খৃষ্টান পল্লীর পুরোহিত ফাদার হিউবার্ট রিবেরু বলেন, এ রকম একজন নিরীহ লোকের হত্যাকান্ডে তারা বাক রুদ্ধ। এই মূহুর্তে কোন মন্তব্য করতে তিনি অপারগ তবে তার প্রশ্ন কেন এমন বৃদ্ধ, শান্তি প্রিয় একজন মানুষকে কেন হত্যা করা হলো ? এ ঘটনায় আমরা স্তব্ধ, নির্বাক। কারো সাথে তার কোন বাদানুবাদের কথা কখনও শুনিনি।
এদিকে এ হত্যাকান্ডের পর ওই পল্লীর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বলেন, এর সাথে কোন ধর্মীয় উগ্রপন্থি গোষ্ঠি জড়িত থাকতে পারে। বিষয়টি তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া দরকার। পুরো খ্রিষ্টান পল্লীতে এখন আতংক বিরাজ করছে। দেশের সম্প্রীতি নষ্ট করতে কোন গোষ্ঠি পরিকল্পিত ভাবে এ কাজ করে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে বনপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ভাপরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এসআই আশরাফ জানান , সুনিল গোমেজকে কুপিয়েই হত্যা করা হয়েছে। তবে কারা এই হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত সে বিষয়ে এখনো পরিস্কার নয়। স্থানীয় লোকজন কাউকে হত্যা করতে দেখেনি। পুলিশ বিষয়টি নিয়ে খোঁজ খবর চালিয়ে যাচ্ছে।
সিআইডি ইন্সপেক্টর সেকেন্দার আলী বলেন, প্রাথমিক ভাবে ব্যবসা সংক্রান্ত মনে হলেও সাম্প্রতিক হত্যাকান্ডের সাথে হত্যাকান্ডের সাদৃশ্যতার মিল থাকায় বিষয়টি তাদেরকেও ভাবিয়ে তুলেছে। তাই এর সাথে কোন জঙ্গী সমৃক্ততা আছে কিনা তা মাথায় রেখেই তদন্ত কাজ চলছে। হত্যাকান্ডের এলাকা সংরক্ষণ ও আলামত সংগ্রহ করেছে সিআইডি।
এদিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন কারী নাটোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মুনশী সাহাবুদ্দিন বলেন, তিনি ঘটনাস্থলে রয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে পরিবারের লোকজন আত্মীয় স্বজন ও এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে তারা তেমন কিছুই জানাতে পারছেন না। কি কারণে এ ঘটনা ঘটেছে তা এখনও উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি। চাঁদাবাজী সংক্রান্ত কোন ঘটনা থাকতে পারে বলে প্রাথমিক ভাবে ধারনা করা হচ্ছে। তবে তার মতে আই এস বা কোন জঙ্গী সম্পৃক্ততা তারা এখনো খুজে পাননি। তবে নিহতের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে।
ঘটনার কয়েক ঘন্টা পর সাইট ইন্টিলিজেন্স এর বরাত দিয়ে একটি বেসরকারী স্যাটেলাইট টেলিভিশন জঙ্গিগোষ্ঠি আইএস এই হত্যার দায় শিকার করেছে বলে প্রচার শুরু করায় জনমনে নতুন করে আতংক ছড়িয়ে পড়েছে। প্রশাসনের তদন্তে ভিন্নতা যুক্ত হয়েছে।

