স্মরণীয় বরণীয় একজন ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

সাহিত্য ডেস্ক:
বহুভাষাবিদ, ভাষাবিজ্ঞানী, দার্শনিক ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ভারতীয় উপমহাদেশের স্মরণীয়, বরণীয় বাঙালি ব্যক্তিত্ব। বিভিন্ন ভাষায় তাঁর অসামান্য দখল ছিল। ১৯৬৩ সালে তিনি বাংলা একাডেমি কর্তৃক গঠিত বাংলা একাডেমির পঞ্জিকার তারিখ বিন্যাস কমিটির সভাপতি নিযুক্ত হন। তাঁর নেতৃত্বে বাংলা পঞ্জিকা আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত রূপ পায়।

পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষা ও ভাষাতত্ত্ব নিয়ে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’র গবেষণা কর্ম রয়েছে। তিনি ২৪টি ভাষা আয়ত্ত্ব করেছিলেন, এগুলোর মধ্যে ১৮টি ভাষার ওপর তাঁর বিশেষ পাণ্ডিত্য ছিলো। বিশেষ করে সংস্কৃতের ওপর তাঁর পাণ্ডিত্য ছিল অসাধারণ। ভারতীয় উপমহাদেশে তিনিই প্রথম বাংলা ভাষায় ইরানের বিশিষ্ট কবি হাফিজ ও ওমর খৈয়ামের বই অনুবাদ করেন। জ্ঞান-সাধনার উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার তাঁকে ‘চলমান বিশ্বকোষ’ বলা হতো।

এই মহান ভাষাবিদের ৪৭তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ১৯৬৯ সালের ১৩ জুলাই তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শহীদুল্লাহ হলের পাশে সমাহিত করা হয়। ভাষাক্ষেত্রে তাঁর অবদান স্মরণ করে মৃত্যুর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ঢাকা হলের নাম পরিবর্তন করে তাঁর নামে রাখা হয়। এছাড়াও তাঁর নামে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের নামকরণ করা হয়।

ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম এমেরিটাস অধ্যাপক পদ লাভ করেন। একই বছর ফ্রান্স সরকার তাঁকে সম্মানজনক পদক নাইট অফ দি অর্ডারস অফ আর্টস অ্যান্ড লেটার্স দেয়। তিনি যখন বাংলা ভাষার প্রথম সহজবোধ্য ‘বাংলা ব্যাকরণ` লিখলেন তখন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর খুশী হয়ে তাকে একটি চিঠি লেখেন। ওই চিঠিতে তিনি বলেন, ‘আপনার বাংলা ব্যাকরণখানি পড়ে বিশেষ সন্তুষ্ট হয়েছি। ব্যাকরণখানি সকল দিকেই সম্পূর্ণ হয়েছে। এতে ছাত্রদের উপকার হবে। বইখানি আমার শান্তি নিকেতনের বাংলা বিভাগের অধ্যাপকদের দেব। তাঁরা তা শ্রদ্ধাপূর্বক ব্যবহার করবেন।`

কবি, শিক্ষাবিদ, গবেষক ও লেখক অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান বলেন, ‘ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে প্রধানত বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে, এই উপমহাদেশে এমন এক অনন্য প্রতিভা যাঁর পরিচয় শুধু প্রশংসার শব্দ উচ্চারণ করে দেয়া চলে না। তিনি জ্ঞানকে শুধু গ্রহণই করেননি, সর্বত্র সেই জ্ঞানের তাপ ছড়িয়েছিলেন। ভাষা সাধনার ক্ষেত্রে তাঁর কৌতূহল এবং অন্বেষণের কৃতিত্ব অসাধারণ। ধর্ম ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও তিনি উল্লেখযোগ্য কর্মকাণ্ডের অধিকারী হয়েছিলেন।’

ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’র জন্ম পশ্চিমবঙ্গের অবিভক্ত চব্বিশ পরগণা জেলার পেয়ারা গ্রামে ১০ জুলাই ১৮৮৫ সালে। ছোটবেলায় তিনি বেশ আমুদে ছিলেন বলে সবাই তাকে ‘সদানন্দ` নামে ডাকতেন। ৪ বছর বয়সে গ্রামের মক্তবে তাঁর শিক্ষায় হাতেখড়ি হয়। তাদের পরিবার ছিল আরবী, ফার্সি ও উর্দুতে শিক্ষিত পরিবার। শহীদুল্লাহ’র বাবা ৫টি ভাষা জানতেন। ১০ বছর বয়সে তিনি তাঁকে হাওড়া জেলার সালদিয়া মাইনর স্কুলে ভর্তি করে দেন। স্কুলে তিনি আরবী-ফার্সির বদলে সংস্কৃতিকেই বেছে নিয়েছিলেন এবং সংস্কৃতিতে বরাবরই প্রথম হতেন। একজন মুসলমান ছাত্রের এই কৃতিত্ব দেখে স্কুলের হিন্দু শিক্ষক অবাক হয়ে যেতেন!

সংস্কৃতের প্রতি বিশেষ আকর্ষণের কারণে পরবর্তীতে তিনি এমএ পড়ার জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করেন। কিন্তু সংস্কৃতের হিন্দু শিক্ষক সত্যবৃত সামশ্রমী একজন মুসলমান ছেলেকে সংস্কৃতের শাস্ত্র ‘বেদ` পড়াতে কিছুতেই রাজী হননি। ভর্তি পরীক্ষায় পাস করা সত্ত্বেও সংস্কৃত পড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন দেখে শহীদুল্লাহ ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন। মামলাটি দিল্লী হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়, শহীদুল্লাহকে সংস্কৃতি পড়তে দেওয়া হোক, অন্যথায় বিশ্ববিদ্যালয়ে তার জন্য একটি সাবজেক্ট চালু করে তাকে পড়ানোর ব্যবস্থা করা হোক। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আদালতের দ্বিতীয় নির্দেশ অনুযায়ী `ভাষাতত্ত্ব বিভাগ` নামে নতুন একটি ফ্যাকাল্টি চালু করেন। শহীদুল্লাহ সেখানেই ভর্তি হন এবং ১৯১২ সালে সংস্কৃতে এমএ পাস করেন।

১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগের একমাত্র শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। এরপর একটানা ২৩ বছর তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। সেখানে তিনি দু`বছর আইন বিষয়ে অধ্যাপনা করেছেন।

১৯২৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দু`বছরের ছুটি নিয়ে উচ্চশিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে তিনি প্যারিস যান। ফরাসী ভাষার মাধ্যমে বাংলা ভাষার সবচেয়ে পুরনো কাব্যগ্রন্থ ‘চর্যাগীতি` নিয়ে দুই বছর গবেষণা করে তিনি ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯২৮ সালে দেশে ফিরে শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি পত্র-পত্রিকার বাংলা ও ইংরেজিতে প্রবন্ধ লিখতে শুরু করেন। তাঁর প্রথম প্রবন্ধের বই ‘ভাষা ও সাহিত্য` প্রকাশিত হয় ১৯৩১ সালে। এরপর তিনি একের পর এক বই লিখতে থাকেন। তাঁর লেখা বইয়ের সংখ্যা একশ`র কাছাকাছি আর দেশি-বিদেশি ভাষায় লেখা তাঁর প্রবন্ধের সংখ্যা কয়েকশ।

১৮১৮ সালে তিনি ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পত্রিকা`র যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯১৯ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে শরৎকুমার লাহিড়ী গবেষণা সহকারী পদে যোগ দেন। ১৯২০ সালে তিনি শিশু-কিশোরদের জন্য ‘আঙুর’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা বের করেন।

তাঁর জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের একটি পত্র। শহীদুল্লাহ তখন ওকালতি করতেন। ওই পত্রে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য তাঁকে ওকালতি ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। এই একটি মাত্র পত্রে সেদিন শহীদুল্লাহর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন স্যার আশুতোষ। স্যার আশুতোষের এই অবদানের কথা শহীদুল্লাহ জীবনে কখনো ভোলেননি। তিনি তাঁর ‘বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থটি স্যার আশুতোষের নামে উৎসর্গ করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন।

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ মাতৃভাষা সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরই দেশের রাষ্ট্রভাষা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হলে বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার পক্ষে যে ক’জন ব্যক্তি জোরালো বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। তাঁর এই ভূমিকার ফলে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পথ অনেকখানি প্রশস্ত হয়।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে তাঁর অনেকগুলো মূলবান গবেষণাগ্রন্থ রয়েছে। বইগুলো বাংলাভাষা ও সাহিত্য ভালোভাবে বুঝতে আমাদের সাহায্য করে। তাঁর গবেষণামূলক গ্রন্থ ও প্রবন্ধের সংখ্যা প্রায় ৪০। এ ছাড়া তিনি ৪১টি পাঠ্যবই লিখেছেন, ২০টি বই সম্পাদনা করেছেন। বাংলা সাহিত্য বিষয়ে তাঁর লিখিত প্রবন্ধের সংখ্যা ৬০টিরও বেশি। ভাষাতত্ত্ব বিষয়ে রয়েছে ৩৭টি রচনা। অন্যান্য বিষয়ে বাংলা, ইংরেজি মিলিয়ে সংখ্যা দাঁড়ায় ২৮০টি। এছাড়া তিনি তিনটি ছোট গল্প এবং ২৯টি কবিতাও লিখেছিলেন।

বই ছিলো তাঁর জীবনের একান্ত সঙ্গী। ভালো বই পেলে তিনি আহার নিদ্রা ভুলে যেতেন। পড়ার সময় তিনি এতো আত্মনিমগ্ন থাকতেন যে তাঁর বাইরের কোনো কিছুতেই হুঁশ থাকতো না। এ নিয়ে তাঁকে মাঝে মাঝে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হতো । এমনি একটি ঘটনা একবার ঘটেছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে। একদিন তিনি একটি নির্জন কক্ষে বসে নিমগ্ন ছিলেন গ্রন্থপাঠে। এদিকে লাইব্রেরি বন্ধ হয়ে গেছে, সবাই চলে গেছে তা তার খেয়াল ছিল না। যখন খেয়াল হল তখন চারদিকে দরজা জানালা সব বন্ধ হয়ে গেছে। বাইরে থেকেও তালা লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। অবশেষে অনেক কষ্টে একটি জানালা খুলে তিনি একজনকে ডেকে নিজের অবস্থার কথা জানালেন- তিনি ভেতরে আটকে পড়েছেন। খবর পেয়ে ছুটে এলো দারোয়ান। দরজা খুলে তাকে মুক্ত করা হলো। তিনি সারা জীবন কাটিয়েছিলেন ভাষা গবেষণার কাজে।

  •  
  •  
  •  
  •