‘সিঙ্কহোল’-রহস্যময় এক সৃষ্টি
বিজ্ঞান ডেস্ক:
বর্তমান সময়ের বেশ আলোচিত একটি ব্যাপার হচ্ছে ‘সিঙ্কহোল’। একটি সিঙ্কহোল এর ধ্বংসযজ্ঞে মুহূর্তেই তলিয়ে যেতে পারে কয়েক শতাধিক বাড়ি-ঘর।হঠাৎ করেই বিশাল এলাকা জুড়ে এমন সব গর্ত তৈরি হওয়ার কারণ কী , কী কারণে প্রকৃতির মাঝে মধ্যে অশান্ত হয়ে এমন সব আচরণ করে তা জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
সিঙ্কহোল মূলত প্রাকৃতিক ভাবে সৃষ্টি হওয়া এক ধরনের গর্ত। এ গর্তের বিশালতা ১ মিটার থেকে ৬০০ মিটার পর্যন্ত হতে পারে । সিঙ্কহোল সম্পর্কে জানতে প্রথমে আমাদের জানতে হবে পানি প্রবাহের কারণে ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগে কি কি ধরনের পরিবর্তন হতে পারে ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগে আমরা এমন কিছু চিত্র দেখি যা দেখলে আপনার মনে হতে পারে প্রকৃতি অপরূপ রূপে সাজিয়েছে পৃথিবীকে । দৃশ্য গুলো পাহাড়ি জমি থেকে ফসলি জমি পর্যন্ত প্রায় সব জায়গায় হতে পারে। এমন সব দৃশ্য তৈরি হওয়ার পেছনে অন্যতম সবচেয়ে বড় কারণে পানির প্রবাহ । মাটির উপরিভাগে এমন ধরনের পানিপ্রবাহ আমরা দেখলেও মাটির নিচের অংশে ঠিক একই ধরনের অসংখ্য পানিপ্রবাহ রয়েছে যা সাধারণত আমরা দেখি না ।
মাটির নিচে ঠিক একই ধরনের পানিপ্রবাহ পৃথিবীর প্রায় সব প্রান্তেই রয়েছেন। একই সাথে মাটির তলদেশে রয়েছে অসংখ্য পাথর। লাইম স্টোন টাইপের এই পাথর গুলোকে মূলত ডাকা হয় কার্বনেট রক বা বেড রক নামে । পানিপ্রবাহ চলমান থাকা অবস্থায় ধীরে ধীরে ছোট আকারের বেডরক গুলো সরে যেতে শুরু করে । বছরের পর বছর ধরে এভাবে পাথর খন্ড গুলো সরে যেতে যেতে একটা সময় বিশাল আকারের গর্তের সৃষ্টি হয় মাটির তলদেশে। বহু বছর ধরে তৈরি হতে থাকা গর্ত যখন বিশাল আকার ধারণ করে তখন তার চারপাশের মাটি এবং পাথর তখন নিমর্জিত হতে থাকে সেই গর্তে । একটা সময় এসে মাটির তলদেশে সেই আয়তন এত বেশি হয়ে যায় যে মাটির উপরিভাগের অংশ সেই চাপ আর ধরে রাখতে পারে না । তেমনি একদিন মাটির নিচের দিকে তলিয়ে যায়, দেবে যাওয়া সেই অংশ গুলোকেই আমরা মূলত সিঙ্কহোল বলে থাকি ।
গভীরতার দিক থেকে সিঙ্কহোল গুলো বাস্তবিক-ই এক-একটি দানবের মতো । ছোটখাটো সিঙ্কহোল গুলোর গভীরতা ১৫ থেকে ২০ মিটার পর্যন্ত যা একটি ছয় তলা ভবনের সমান। বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে গভীরতম সিঙ্কহোলটি হচ্ছে চায়নার ‘জিয়াওমি-তিয়ানকিং সিঙ্কহোল’। পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহত্তম এই সিঙ্কহোলটি ৬২৬ মিটার চওড়া ও ৬৬২ মিটার গভীর। একধরনের বিশেষায়িত রোবট এর মাধ্যমে চাইনিজ প্রকৌশলীরা এর গভীরতম স্থানে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছেন ।
বর্তমান সময়ে পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি সিঙ্কহোল রয়েছে তুরষ্কে । গত তিন মাসের ব্যবধানে তুরষ্কে জন্ম নিয়েছে ৯টির ও বেশি সিঙ্কহোল । বিগত ৫৭ বছরের ইতিহাসে তার্কিতে রয়েছে ৬৫০ টির ও বেশি সিঙ্কহোল । একই ভাবে আমেরিকার ইউ-এস-জি-সির রিপোর্ট বলছে আমেরিকার সব মিলিয়ে প্রায় ২০% জমি রয়েছে যা সিঙ্কহোলের ঝুকিতে রয়েছে । এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুকিতে রয়েছে ফ্লোরিডা, টেক্সাস, অ্যালবামা, ক্যানটাকি , মিশরি এবং পেনসিলভেনিয়া ।
সিঙ্কহোল যে শুধু ভুমিতে হয় বিষয়টি ঠিক তেমন নয় । সাগর মহাসাগরেও রয়েছে অসংখ্য সিঙ্কহোল । ব্রাজিলের গ্রেট ব্লু হোল এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ । ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় আইল্যান্ড আম্বার ক্রিসক্রে অঞ্চলের পানির নিচে এটি অবস্থিত। দক্ষিণ চীন সাগরেও রয়েছে এমন একটি সিঙ্কহোল যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘দ্যা শ্যামসাংগল ব্লু হোল’ । বাহামার গ্রেট ব্লু হোল থেকেও দক্ষিণ চীন সাগরের এই সিঙ্কহোল টি গভীরতা আরো ৩০০ মিটার বেশি ।
সিঙ্কহোল যে শুধু প্রাকৃতিক ভাবে তৈরি হয় তেমনটি নয় । বর্তমান সময়ে মানবসৃষ্ট সিঙ্কহোল এর সংখ্যা অনেক বেশি । গত দুদিন আগে ইসরাইলের তৈরি হওয়া সিঙ্কহোল টি মূলত মানবসৃষ্ট । বছর দুয়েক আগে একই ধরনের আরেকটি সিঙ্কহোল তৈরি হয়েছিল জাপানের টোকিওতে । জনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে এই ধরনের মানব সৃষ্ট সিঙ্কহোল বেশি হয়ে থাকে । বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার কথা ধরা যেতে পারে,যেখানে মাটি তলদেশ দিয়ে বয়ে গেছে অসংখ্য পানির লাইন । লাইন গুলো কখনো কখনো অনিচ্ছাকৃতভাবে ভেঙে যায় কিংবা ফুটো হয়ে যায়, ফলে সেখান থেকে পানি চুইয়ে চুইয়ে মাটির তলদেশে ছড়িয়ে পড়ে । যার ফলে ধীরে ধীরে এক ধরনের প্রবাহমান পানির স্রোতের তৈরি হয় । বছরের পর বছর চলতে থাকা এ অবস্থাটি একটা সময় এত বড় আকার ধারণ করে যে একটা সময় বিশাল এলাকা জুড়ে মাটির নিচে তলিয়ে যায় । যেমনটা অনেকবার হয়েছে জাপান , ইসরাইল, ইউএসএ, রাশিয়া এবং চায়নাতে।

