গবাদিপশুর স্বাস্থ্যহানির সম্ভাবনা; প্বার্শপ্রতিক্রিয়া জানা যাবে তাপপ্রবাহ শেষ হলে

বাকৃবি প্রতিবেদকঃ

দেশে পূর্বে এত লম্বা সময় তাপ প্রবাহ দেখা যায় নি। চলমান তাপপ্রবাহের কারণে গবাদিপশুর মৃত্যুসহ মারাত্মক স্বাস্থ্যহানির সম্ভাবনা রয়েছে। দীর্ঘসময় ধরে তীব্র গরমে গবাদিপশুর স্বাস্থ্যের ক্ষতির পরিমাণ জানা যাবে তাপপ্রবাহ শেষ হবার পরে। 

তীব্র তাপপ্রবাহে গবাদিপশুর উপর কেমন প্রভাব পড়েছে জানতে চাইলে ইউএনবিকে এসব তথ্য জানান চুয়াডাঙ্গা জেলা ও শ্রীমঙ্গল উপজেলার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন জন (বাকৃবি) প্রাণি বিশেষজ্ঞ।

চুয়াডাঙ্গার জেলার ভারপ্রাপ্ত প্রাণিসম্পদ অফিসার ডা. মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তীব্র গরমে পোল্ট্রিতে সবচেয়ে বেশি হিটস্ট্রোকের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। মাঠপর্যায়ে গবাদিপশুর ক্ষেত্রে খাওয়া কমিয়ে দেয়ার অভিযোগ শুনা যাচ্ছে। তাপপ্রবাহ শেষ হলে মাঠপর্যায়ে গবাদিপশুর ক্ষয়ক্ষতি কেমন হয়েছে সেটি জানা যাবে।

এসময় শ্রীমঙ্গল উপজেলার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. কর্ণ চন্দ্র মল্লিকও বলেন, তাপপ্রবাহ শেষ হলে মাঠপর্যায়ের সম্পূর্ণ অবস্থা সম্পর্কে জানা যাবে।

তবে বাকৃবির তিনজন প্রাণি বিশেষজ্ঞ প্যারাসাইটোলজি বিভাগের অধ্যাপক অধ্যাপক ড. মো. সহিদুজ্জামান, প্যাথলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আবু হাদী নূর আলী খান এবং ডেয়রি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. হারুন-অর-রশিদ তাপপ্রবাহে গবাদিপশুর কি পরিমাণ ক্ষতি হতে পারে সে সম্পর্কে ধারণা দিয়েছেন এবং ক্ষয়ক্ষতি কমানোর পরামর্শ প্রদান করেছেন।

অধ্যাপক ড. মো. সহিদুজ্জামান বলেন, উষ্ণ তাপমাত্রায় মশা মাছিসহ বিভিন্ন রোগ-জীবাণু বহনকারী কীটপতঙ্গের প্রজনন বৃদ্ধি পেলেও ৪০ থেকে ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এসব কীটপতঙ্গের প্রজনন বন্ধ হয় এবং মারা যায়। 

তিনি আরও বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণতায় শীত প্রধান দেশে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে এসব কীটপতঙ্গ প্রজনন উপযোগী হওয়ায় অনেক কীটপতঙ্গ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত হচ্ছে।  ফলে পশু-পাখি ও মানুষে পরজীবী আক্রমনের ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে।

মুরগির হিট স্ট্রোক প্রতিরোধে অধ্যাপক সহিদুজ্জামান বলেন, মুরগির শরীরে পানি স্প্রে না করারই ভালো হবে। কারণ এতে মুরগি তার শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে বাধাগ্রস্থ হবে এবং ঘরের আর্দ্রতা অতিরিক্ত বৃদ্ধির ফলে শ্বাসকষ্টে মুরগি মারা যাবে। মুরগিকে সকালে ও দিনের উত্তপ্ত সময়ে সার্বক্ষণিক খাবার না দিয়ে বাইরে তাপমাত্রা কিছুটা কমার পর বিকেল থেকে সার্বক্ষণিক খাবার দেয়ার পরামর্শ দেন তিনি। 

আরেক প্রাণি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো. আবু হাদী নূর আলী খান ইউএনবিকে বলেন, প্রাণীর জন্য গরমের মধ্যে মানুষের মতো শরীর ঠান্ডা করে খাবার খাওয়ার তেমন সুযোগ নেই। প্রাণীদের ক্ষেত্রে দেখা যায় তারা রোদের মধ্যেই ঘুরে বেড়াচ্ছে, ঘাসসহ নানা রকম খাবার খাচ্ছে। এতে করে গরমে তাদের শরীর পানিশূন্য হয়ে যেতে পারে। ফলে তাদের সম্পূর্ণ কিডনি বা কিডনির একটি অংশ বিকলাঙ্গ হবার সম্ভাবনাও রয়েছে। 

উচ্চ তাপমাত্রায় গবাদিপশুর মস্তিষ্কে প্রভাব সম্পর্কে তিনি বলেন, তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে মস্তিষ্কের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণকারী অংশ হাইপোথ্যালামাস ভালোভাবে কাজ না করার সম্ভাবনা রয়েছে। তখন শরীরের তাপমাত্রা হয় একদম কমে যাবে না হলে একদম বেড়ে যাবে। এমনকি এ পর্যায়ে গবাদিপশুর হজমক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটতে পারে।

মহিষের শরীরের তাপমাত্রা বেশি হওয়ায় কাদা বা পানিতে ডুবে থেকে তাদের শরীর ঠান্ডা করে। কিন্তু অত্যধিক গরমে পানিও গরম হয়ে থাকে। এতে মহিষের প্রজনন ক্ষমতা কমে যাওয়া বা নষ্ট হবার সম্ভাবনা থাকে বলেও জানান, অধ্যাপক হাদী।

অধ্যাপক ড. মো. হারুন-অর-রশিদ বলেন, এই প্রচন্ড তাপপ্রবাহে গবাদিপশুকে দিনে সর্বনিম্ন তিন থেকে চারবার পানি ছিটাতে হবে বা স্প্রে করতে হবে। বাংলাদেশের অনেক ফার্মে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। গরুকে যেখানে রাখা হয় সেখানকার বায়ু প্রবাহ ঠিক রাখার জন্য ফ্যানের ব্যবস্থা করতে হবে। ফ্যান ঘরের ছাদের সিলিংয়ে না লাগিয়ে দেয়ালের দুই পাশে স্ট্যান্ড ফ্যান

দিতে হবে যাতে ঘরের ভেতরের বায়ুপ্রবাহ ভালো হয়। তাহলে ছাদের গরম সরাসরি গবাদিপশুর শরীরে এসে লাগবেনা।

এছাড়া গবাদিপশুকে দানাদার খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দিতে বলেন অধ্যাপক হারুন। তিনি বলেন, এতে উৎপাদন কিছুটা কমলেও তীব্র গরমে গবাদিপশুর সহনশীলতার পরিমাণ বেড়ে যাবে। অত্যধিক গরমে দুধ দোহন না করে সকালে বা বিকেলে দুধ দোহন করতে হবে। প্রাণীকে পর্যাপ্ত পরিমাণে ঠান্ডা ও পরিষ্কার পানি ঘন ঘন খাওয়াতে হবে যাতে তাদের শরীরে অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা সহনীয় পর্যায়ে চলে আসে।

এছাড়া প্রাণি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন বৈশ্বিক উষ্ণতায় জলবায়ু উপযোগী খামার ব্যবস্থাপনা, খাদ্য ও গবাদি পশু-পাখির জাত নির্বাচন নিয়ে গবেষণা জরুরি হয়ে পড়েছে।  কোন খামার করার আগে প্রাণিসম্পদ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ খামারের জায়গা নির্বাচন, ডিজাইন এবং বায়োসিকিউরিটিসহ জলবায়ু উপযোগী বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত সাপেক্ষে অনুমোদন প্রদান করবে।

  •  
  •  
  •  
  •