করোনা ভাইরাস মহামারী মোকাবেলায় হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা

মো. এম. এন. আজিম
মানুষ আজ ২০ বছরেরও কম সময়ে ব্যবধানে তৃতীয় গুরুতর করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করছে, ২০০২-২০০৩ সালে SARS এবং ২০১২ সালে MARS এরপর মানব জীবন ও বিশ্ব অর্থনীতি অনেকটা ভেঙ্গে পড়ে। উপলব্ধি হয় রোগ সনাক্তকরণ এবং কার্যকর ভ্যাকসিনের বিকাশের যা এখন ও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসাবে রয়ে গেছে। করোনা ভাইরাস মহামারী (কোভিড ১৯) নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বিশ্বব্যাপী সম্মিলিত প্রচেষ্টার বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতিগুলিও বিবেচনা করা উচিত। করোনা-ভাইরাস রোগের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে দ্রুত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা।

কোভিড-১৯ এর লক্ষণগুলিতে অন্যান্য করোনাভাইরাসের মত শ্বাসযন্ত্রের অসুস্থতার তিনটি তীব্রতা বৈশিষ্ট্য রয়েছে: তীব্র শ্বাসযন্ত্রের প্রদাহ, জটিল শ্বাসকষ্টের লক্ষণ, নিউমোনিয়া। কোভিড-১৯ সংক্রমণ ও লক্ষণরোগীর বয়স এবং রোগীর প্রতিরোধ ক্ষমতা সিস্টেমের অবস্থার উপর নির্ভর করে। করোনা মহামারী মোকাবেলার জন্য উপযুক্ত থেরাপিউটিক সিস্টেম হিসাবে যৌক্তিক কাঠামো হল হোমিওপ্যাথি। কারণ হোমিওপ্যাথি সুস্থ মানবদেহে পরীক্ষা করা হয়,কোন প্রাণীর ওপর নয়। সুতরাং এর কার্যকারিতা নিয়ে কোন সন্দেহ হওয়ার কথাই আসেনা।

হোমিওপ্যাথি একটি প্রাকৃতিক থেরাপি পদ্ধতি এবং একটি পরীক্ষামূলক বিজ্ঞান। এটি রোগের নয়, বরং লক্ষণের চিকিৎসা। হোমিওপ্যাথিতে একজন চিকিৎসক সংক্রমণের পর রোগীর চিকিৎসা তার দেহে সময় প্রকাশিত লক্ষণগুলির উপর নির্ভর করে দিয়ে থাকেন এবংঔষধ হয় অতি লঘু দ্রবণ যাতে রোগীর দেহে কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়না। কোভিড-১৯ রোগটি দ্রুত ডিভোমোপমেন্টে থাকা অবস্থায় সুবিধা হল হোমিওপ্যাথিক ঔষধ রোগীরদেহে প্রকাশিত লক্ষণগুলির সামগ্রিকতার উপর নির্ভর করে এবং কোন প্যাথলজি নির্ভরশীল নয়।

অ্যালোপ্যাথি বা প্রচলিত পদ্ধতিতে ওষুধ প্রয়োগে প্যাথলজির সন্ধান না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়, তবে হোমিওপ্যাথিতে চিকিৎসা শুরুর জন্য কোন রোগের প্রকাশিত লক্ষণগুলিই বিবেচ্য। রোগ যত ভয়াবহ হোক, হোমিওপ্যাথি কখন রোগকে বিবেচনায় আনেনা, বিবেচনায় নেয় রোগে প্রকাশ পাওয়া লক্ষণগুলিকে। সুতরাং, হোমিওপ্যাথি রোগীর জন্য তাৎক্ষণিক এবং খুব সহায়ক।

প্রতিটি রোগে রোগীর দেহে যে লক্ষণগুলি প্রকাশ পায় তা সন্ধানের পর হোমিওপ্যাথিক ঔষধ প্রয়োগ করলে তা ওই লক্ষণের ফলে যে প্যাথলজির সৃষ্টি হয় তার পূর্ণ বিকাশকে আটকাতে পরে। হোমিওপ্যাথির ধারণাটি হল যে কোন পদার্থ অধিক সেবনে কোন স্বাস্থ্যবান ব্যক্তির শরীরে সৃষ্টরোগে যে লক্ষণ হতে পারে, সেই লক্ষণগুলিই কোন রোগে সৃষ্ট লক্ষণ গুলি নিরাময় করতে পারে।

হোমিওপ্যাথি রোগের নয়, রোগীর চিকিৎসা করে। রোগ যে নামেই হোক না কেন রোগীর প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ লক্ষণ সমষ্টিই হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা ব্যবস্থার মূল বিষয়। করোনাভাইরাস অতি ক্ষুদ্র এবং অল্প শক্তিসম্পন্ন একটি ভাইরাস। এই ভাইরাসে আক্রান্ত মানেই মৃত্যু নয়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আক্রান্ত ব্যক্তির জীবনীশক্তির প্রভাবে জীবাণুটি পরাজিত হয়, ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি এমনিতেই ভালো হয়ে যায় কোনো প্রকার ওষুধের ব্যবহার ছাড়াই। মোট কথা- যার ইমিউনিটি বা জীবনীশক্তি বা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি তার এই ভাইরাসে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা একেবারেই কম। যেমন শিশুদের এই ভাইরাসে আক্রান্ত হবার হার একেবারেই কম, কারণ শিশুদের জীবনীশক্তি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক বেশি।

হোমিওপ্যাথিক ওষুধ কখনই সরাসরি কোনো জীবাণুর বিরুদ্ধে কাজ করে না, সিলেকটিভ হেমিওপ্যাথিক ড্রাগ নির্দিষ্ট রোগীর জীবনীশক্তি বা ইমিউনিটি বা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে ওই রোগীকে সুস্থ করে তোলে- সে যে রোগই হোক না কেন। পৃথিবীতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মহামারিতে হোমিও ওষুধ এভাবেই সফলতা পেয়েছে, তা আজকের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা তথাকথিত শিক্ষিত সমাজ ও মেনে নিয়েছে এবং হোমিওপ্যাথি হয়েছে বিশ্বে ২য় বহুল ব্যবহৃত চিকিৎসা পদ্ধতি। এই সময়ে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর লক্ষণ চারটি ধাপে প্রকাশ পাচ্ছে এবং এই চারটি লক্ষণ হোমিওপ্যাথিক ওষুধের সঙ্গে শতভাগ মিলে, ফলে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর শতভাগ আরোগ্যই সম্ভব হতে পারে সঠিক ওষুধ নির্বাচনে।

ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইনের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পুলিশ সদস্য হোমিও চিকিৎসা নিয়ে ভাল ফল পেয়েছেন। সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক বোর্ডের চেয়ারম্যান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে করোনা প্রতিরোধে হোমিও চিকিৎসা গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে হোমিওপ্যাথি ওষুধ ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে ভারতের ‘আয়ুস মন্ত্রণালয়’। আয়ুর্বেদ, ইউনানি, হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা বিষয়ক মন্ত্রণালয়টি এক বিবৃতিতে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধের উপায় সংক্রান্ত নানা তথ্য প্রকাশ করেছে।

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, করোনা মোকাবেলায় উপযুক্ত ওষুধ তাদের হাতে রয়েছে। ভ্যাকসিন বা অ্যালোপ্যাথি ওষুধ নয়, হোমিওপ্যাথিতেই করোনা প্রতিরোধ করা যাবে। ভারতের আয়ুস মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে টুইট করে জানানো হয়েছে, হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় করোনাভাইরাস প্রতিরোধ করা যায়। করোনা আক্রান্তের উপসর্গ সারানোর জন্য হোমিওপ্যাথি ওষুধ অত্যন্ত কার্যকর বলে জানানো হয়েছে।

ভারতের নওদার প্রত্যন্ত গ্রাম সর্বাঙ্গপুরে ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ডা. নীলাঞ্জন রায় করোনার রোগীদের হোমিওপ্যাথির চিকিৎসা দিচ্ছেন। স্থানীয়রা বলছেন ‘লকডাউনের জেরে বন্ধ রয়েছে গাড়ি ঘোড়া। হোমিও ডাক্তার হলেও চিকিৎসা পরিষেবা তো মিলছে।’ কিন্তু এই করোনা আবহেও একজন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক দিয়ে হাসপাতাল চলে? এ রকম প্রশ্নে নওদার স্বাস্থ্য আধিকারিক মুকেশ কুমার সিংহ বলেন, ‘জেলায় এমবিবিএস ডাক্তারের বড় অভাব। তাই হোমিও চিকিৎসক দিয়েই গ্রামীণ হাসপাতাল চলছে।’ (সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা)

করোনায় হোমিওপ্যাথির আরও সাফল্য হল ব্রিটেনের প্রিন্স চার্লস করনোমুক্ত হয়েছেন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায়। প্রিন্স চার্লসের শরীর থেকে করোনার জীবাণু দূর করতে হোমিওপ্যাথিকেই কাজে লাগানো হয়েছিল। ভারতের ব্যাঙ্গালুরুর বিখ্যাত হোমিও চিকিৎসক ডা. মাথাই। দীর্ঘদিন ধরেই হোমিওপ্যাথি নিয়ে তিনি গবেষণা করে চলেছেন। তার সাফল্য নতুন দিশা দেখাচ্ছে ভারতকে। কোভিড-১৯ মোকাবেলায় এই ওষুধ এবং থেরাপি কাজে লাগিয়ে উপকৃত হওয়া যায় তা পরীক্ষা শুরু হয়েছে ভারতে। কেন্দ্রের নিযুক্ত স্পেশাল টাস্ক ফোর্স ওই চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে গোটা বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন।

হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় প্রতিকার একটি নির্দিষ্ট প্যাথলজির সমস্ত ক্ষেত্রে নিরাময় করার সম্ভাবনা নেই। তবে পূর্বোক্ত লক্ষণগুলি থেকে শ্বসনতন্ত্রের ক্ষেএে প্যাথলজির প্রাথমিক পর্যায়ে যেমন অ্যাকোনিটাম নেপেলাস বা আর্সেনিকাম অ্যালবাম বা ইউপেটেরিয়াম পারফোলিয়াম বা গেলসেমিয়াম বা ইপেকাকুয়ানা ও পরবর্তী পর্যায়ে ব্রায়োনিয়া বা ফসফরাস প্রধান ওষুধ হিসাবে এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে অ্যান্টিমোনিয়াম টারটারিকাম বা ব্যাপটিসিয়া বা কর্পুর অফিসিনালিস ইত্যাদি হোমিওপ্যাথিক ঔষধ ব্যবহার কর যেতে পারে। যা 200c বা 1m পোটেনশিতে রোগীদের দেওয়া যেতে পারে।

চিরকালীন সুরক্ষিত ঔষধ হোমিওপ্যাথি এর আগেও বিভিন্ন মহামারীতে পরীক্ষা করা হয়েছে এবং সর্বত্র মিলেছে ভূয়সী সাফল্য। জামানি, অমেরিকা, কানাডা, ভারত, বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও। এর আগে হোমিওপ্যাথির মাধ্যমে ডেঙ্গু রোগের নিয়ন্ত্রণ যেভাবে সম্ভব হয়েছে তা সত্যই প্রশংসনীয়। হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা অন্তর্ভুক্ত করতে এবং এটি প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসাগুলির সাথে তুলনা করে মহামারী গবেষণা চালিয়ে যেতে হবে। কমপক্ষে ২০০-৪০০ ব্যক্তির দুটি পৃথক গ্রুপে এলোমেলোভাবে রোগীদের নিয়োগ করা উচিত এবং যথাক্রমে প্রতিষ্ঠিত এবং হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা গ্রহণ করা উচিত। উভয় গ্রুপের ফলাফলের মূল্যায়ণ প্রকাশ করতে পারে যে কোন গ্রুপে বেঁচে থাকার, সাধারণ স্বাস্থ্যের পরিস্থিতি ইত্যাদিতে এবং কোন পরিমাণে উচ্চতর ফলাফল রয়েছে। এছাড়াও হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার খরচ অনেক কম ও ডায়াগনোসিস খুবই সিরিয়াস কন্ডিসন না হলে করতে হয়না।

  •  
  •  
  •  
  •  
ad0.3

Tags: , ,