হুমকির মুখে দেশের প্রথম সরকারি রাবার বাগান ‘রামু’
কক্সবাজার সংবাদদাতা:
প্রতি বছর উৎপাদন বাড়লেও হুমকির মুখে রয়েছে দেশের প্রথম সরকারিভাবে গড়ে তোলা রামু রাবার বাগান। দিন দিন রাবারের দাম নিম্নমুখী থাকায় এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে যেকোনো সময় রাবার বাগানটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা। এছাড়া রাবার আমদানিতে নামমাত্র শুল্ক বসানো এবং বিক্রিতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট দেশের রাবার শিল্পের বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, দেশে কাঁচা রাবারে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের উদ্যোগে ১৯৬০ সালে কক্সবাজারের রামুর জোয়ারিয়ানালা এলাকায় গড়ে তোলা হয় দেশের প্রথম মাতৃ রাবার বাগান। মালয়েশিয়া থেকে বীজ এনে শুরুতে মাত্র ৩০ একর জমিতে বাগানটি গড়ে তোলা হলেও বর্তমানে এর আয়তন ২ হাজার ৬৮২ একর। এ বাগানে রয়েছে ১ লাখ ৮০ হাজার ৬১৬টি গাছ। এর মধ্যে উৎপাদনশীল গাছের সংখ্যা ৯৪ হাজার ৫৬৮টি।
সরেজমিন দেখা গেছে, বাগানের গাছগুলোয় ঝুলছে ছোট ছোট মাটির পাত্র। গাছের কাটা অংশ দিয়ে সেই পাত্রে চুইয়ে পড়ছে ধবধবে সাদা রাবার কষ। জমা হওয়া কষ সংগ্রহ করে শ্রমিকরা গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন কারখানায়।
বাগানের মাঠ তত্ত্বাবধায়ক আবুল হুদা জানান, মূলত সারা বছরই রাবার উৎপাদন হয়। তবে অক্টোবর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত চার মাস রাবার উৎপাদনের ভর মৌসুম। মৌসুমে প্রতিদিন রামু রাবার বাগান থেকে চার হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার কেজি কষ আহরণ করা হয়। শীতে কষ আহরণ বেশি হয়, বর্ষায় উৎপাদন কমে আসে। এসব কষ আহরণে নিয়মিত-অনিয়মিত প্রায় ২২০ জন শ্রমিক নিয়োজিত।
বাগান থেকে সাদা কষ সংগ্রহের পর সাতদিনের মধ্যে তা প্রক্রিয়াজাত করে শুকনা রাবারে পরিণত করা হয় বলে জানালেন বাগানের কারখানা তত্ত্বাবধায়ক নুরুল আনোয়ার। তিনি জানান, বাগান থেকে কষ এনে শুকনা রাবার শিটে পরিণত করতে সময় লাগে সর্বোচ্চ সাতদিন। এভাবে মৌসুমে প্রতিদিন এ বাগান থেকে ৩০ থেকে ৩৫ টন শুকনা রাবার উৎপাদন হচ্ছে।
রামু রাবার বাগান কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১২-১৩ অর্থবছরে এ বাগানে উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার ২১৭ কেজি রাবার। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ৬৭ হাজার ১৫১ কেজি, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৪৪ কেজি এবং ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মাত্র ছয় মাসেই উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ১১ হাজার কেজি রাবার।
উৎপাদন বাড়লেও হতাশার কথা জানিয়েছেন রামু রাবার বাগানের উপব্যবস্থাপক মো. ওয়াহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘প্রতি কেজি রাবার উৎপাদনে খরচ হয় ১৮৮ টাকা। কিন্তু বর্তমানে বাজারদর ১২০ থেকে ১৩০ টাকা। ২০১২-১৩ অর্থবছরের পর শুধু রামু রাবার বাগানে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে। দাম পড়ে যাওয়ার পাশাপাশি চাহিদা কম থাকায় গত কয়েক বছর গুদামেই পড়ে ছিল বিপুল পরিমাণ রাবার। তবে সম্প্রতি ভারতে রাবার রফতানির সুযোগ তৈরি হওয়ায় এ সংকট অনেকটা কেটেছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে শুধু রামু রাবার বাগান থেকে ২৯৭ টন রাবার ভারতে পাঠানো হয়েছে।’
বর্তমান দুরবস্থা অব্যাহত থাকলে পাঁচ বছরের মধ্যে বেসরকারি বাগানগুলো বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে মন্তব্য করেন মো. ওয়াহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে রাবার শিল্পে বিপর্যয় নেমে আসায় রামু রাবার বাগানের প্রায় দুই শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠতে না পারলে এই মানুষের জীবিকা নির্বাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।’
সূত্র: বণিক বার্তা

