কলাপাড়ায় এশিয়ার প্রথম পানি জাদুঘর
পটুয়াখালী সংবাদদাতা:
পটুয়াখালীর কলাপাড়া এখন ইতিহাসের অংশ হয়ে গেল। এশিয়া মহাদেশে প্রথমবারের মতো ‘পানি জাদুঘরের’ উদ্বোধন করা হয়েছে। উপজেলার সবজির ভান্ডারখ্যাত নীলগঞ্জ ইউনিয়নের পাখিমারায় কুয়াকাটাগামী মহাসড়কের পাশে এ জাদুঘরের আনুষ্ঠানিক অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছে।
জাদুঘরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে অ্যাকশন এইড বাংলাদেশ এর কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির, কলাপাড়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল মোতালেব তালুকদার, নীলগঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক খান, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আভাসের নির্বাহী পরিচালন রহিমা সুলতানা কাজল, জনপ্রতিনিধি, উন্নয়নকর্মীসহ নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। ব্যতিক্রমধর্মী এ জাদুঘরটি উদ্বোধনের পর থেকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার দর্শনার্থীর ভিড়ে গোটা এলাকা মুখরিত হয়ে ওঠে।
নদী ও পানি সম্পদ রক্ষায় সরকার ও নীতি নির্ধারকদের আরো উদ্যোগী করা। মানুষকে সচেতন করা এবং নদী ও পানি সম্পদ রক্ষার আন্দোলনকে শক্তিশালী করতে “পানি জাদুঘরের” প্রতিষ্ঠা করা হয়। নদীমাতৃক বাংলাদেশের ইতিহাস ঐতিহ্যের প্রধান ধারক নদী ও পানি সম্পদ। দেশটিতে রয়েছে নদী ও পানির সঙ্গে মানুষের জীবন-জীবিকার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের ধারাবাহিকতা।
কিন্তু জলবায়ুর দ্রুত পরিবর্তনজনিত কারণে নদী ভরাট ও হয়ে গেছে। নদী হারিয়ে গেছে মানুষের দখল দৌরাত্মে। মিষ্টি পানির প্রধান উৎস নদী তার উৎসস্থল হারিয়ে ফেলছে। এর প্রভাবে জীবন-জীবিকা হারাচ্ছে মানুষ। কৃষিক্ষেত্রে মারাত্মক বিপর্যয় ধেয়ে আসছে। বিলুপ্ত হয়ে গেছে বিভিন্ন প্রজাতির মিঠা পানির সুস্বাদু মাছ। পশু-পাখির অভয়ারন্য, মানুষের সুস্বাস্থ্য রক্ষায় অন্তরায় হয়ে দাড়িয়েছে নদীপথের দ্রুত বিলোপ। এসবের নেতিবাচক প্রভাব এবং নদী রক্ষায় নেয়া সকল বিষয় উপজীব্য করে উপস্থাপন করা হয়েছে জাদুঘরটিতে।
মনোরম লোকেশনে জাদুঘরটির সামনে স্থান পেয়েছে নদীপথে অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ দেয়ায় পানির প্রবাহ থমকে পরিণত হওয়া বালুরচরের দৃশ্য। যেখানে শোভা পাচ্ছে নদীতে নৌকা চলাচলের পথ স্থায়ীভাবে রুদ্ধ হয়ে যাওয়ার দৃশ্যপট। বিশুদ্ধ পানি ব্যবহারের নির্দেশনা রয়েছে জাদুঘরের মূল দরজায়।
জাদুঘরে রাখা হয়েছে দেশের প্রধান মেঘনা, হালদা, গড়াই, বুড়িগঙ্গা, পায়রা, যমুনা, পদ্মা, তিস্তা, কীর্তনখোলা, আন্ধারমানিক নদী থেকে সংগৃহীত পানির নমুনা। নদীপথে চলা নৌকা। নদীর পানি ব্যবহারের দৃশ্যপট। নদীকেন্দ্রীক জীবন-জীবিকার বিভিন্ন উপকরণ- মাছ ধরার চাঁই, বিভিন্ন ধরনের জাল, ঝুড়ি, খাড়ই, কাঠের সামগ্রী শোভা পাচ্ছে। রয়েছে নদীপথে চলাচল করা বিভিন্ন ডিজাইনের নৌকার চলাচল। আঞ্চলিক নদীপথ ও তার ওপরে সরকারের চলমান ব্রিজ নির্মাণের দৃশ্যপটসহ সামাজিক ম্যাপ উপস্থাপিত রয়েছে। রয়েছে দেশ-বিদেশের নদীর পরিসংখ্যান। নদীপথের নিয়ন্ত্রক দেশের নাম সমুহ। নদীর উৎসস্থল।
উদ্যোক্তা সংস্থা একশন এইড বাংলাদেশের যোগাযোগ কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম জানালেন, বাংলাদেশে ছোট-বড় প্রায় ৭০০ নদী রয়েছে। শত বছর আগে এর সংখ্যা ছিল দ্বিগুন। নদীর সংখ্যা কমায় নদী তীরবর্তী মানুষের জীবন-জীবিকা, সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্যেরও ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। বাঁধ, দুষণসহ নানা কারণে নদী হারিয়ে যাওয়ায় জীবন-জীবিকায় ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বাংলাদেশের পানি সম্পদ ও নদীকে বাঁচাতে নাগরিক সমাজ, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন নানা ঘোষনায় এর গুরুত্ব তুলে ধরলেও সরকারের উদ্যোগ রয়েছে সীমিত পরিসরে।
এরই প্রেক্ষাপটে নদী ও পানি সম্পদ রক্ষায় উন্নত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার লক্ষ্যে পানি জাদুঘর গড়ে তোলার এই পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। পানি জাদুঘরটি উদ্বোধন পরবর্তী মানুষ নদীর প্রয়োজনীয়তা, নদী ভরাট হওয়ায় বিপর্যয়ক্ষেত্রসমুহের ভয়াবহতা দেখতে ভিড় শুরু করে দেয়। ফলে নদী ও পানি সম্পদ রক্ষায় সরকার ও নীতিনির্ধারক মহল আরও উদ্যোগী ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন। এছাড়া সাধারণ মানুষ সচেতন হবে। এসব বাস্তবতা দৃশ্যমান করতেই এ জাদুঘরের নির্মাণ। পানি সম্পদ রক্ষার আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করবে এ যাদুঘরটি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে।
উদ্বোধনী বক্তব্যে প্রফেসর ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, “নদী মরে গেলে বাংলাদেশ মরে যাবে। কারণ পানি ও নদীর জন্যই বেঁচে আছে বাংলাদেশ। অথচ মানুষই এই নদীগুলোকে মেরে ফেলছে।” তিনি আরো বলেন, “পানি জাদুঘরে মূলত এই বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। নদীর কথা, পানির কথাকে উপজীব্য করে এই পানি জাদুঘর। এই জাদুঘর, মানুষকে, সরকারকে, নতুন প্রজন্মকে সচেতন করবে”।
ফারাহ্ কবির বলেন, “বাঁধ, পরিবেশগত বিপর্যয়সহ নানা করণে নদী মরে গেছে, মরে যাচ্ছে। নদীর গতিপথ পরিবর্তন হচ্ছে দিনকে দিন। এর ফলে নদী পাড়ের মানুষের জীবন-জীবিকার উপর মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। আমরা চাই নদীকে নদীর মত বাঁচতে দিতে। তাই এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। সেজন্য সচেতন হতে হবে আমাদেরই। সে কারণেই এই পানি জাদুঘর”।
উপকূলীয় জনকল্যাণ সংঘের সভাপতি জয়নাল আবেদীন জানান, মানুষ জীব-জন্তু কিংবা পশু-পাখির জাদুঘর দেখেছে। কিন্তু পানি জাদুঘরের নাম আগে কেউ শোনেনি। এর গুরুত্ব বোঝা তাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য খুবই জরুরি।
ব্যতিক্রমধর্মী “পানি জাদুঘরটির” উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে নীলগঞ্জের কৃষক-কৃষাণিসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরাজ করে উৎসবমুখর পরিবশে। পাশাপাশি উপমহাদেশে প্রথম জাদুঘরটি কলাপাড়ায় প্রতিষ্ঠার জন্য এখানকার কৃষকমৈত্রী, গণগবেষণা দলের নেতৃবৃন্দ উদ্যোক্ত সংস্থাকে ধন্যবাদ জানান।
শুধু স্থানীয় জনগোষ্ঠী নয়, কুয়াকাটাগামী পর্যটক-দর্শনার্থীকে ক্ষণিকের জন্য থমকে দাঁড়াতে হচ্ছে ব্যতিক্রমধর্মী “পানি জাদুঘরটির” নাম শোনায়। ঘুরে-ফিরে দেখতে শুরু করেছেন আগতরা জাদুঘরটির ভেতর-বাইরে। জানতে চাচ্ছেন কেনইবা পানি জাদুঘর। মোটকথা রাতারাতি কলাপাড়ার পাখিমারার পানি জাদুঘরটির খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ছে এজনপদ থেকে অন্য জনপদে।

