গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতাল পল্লীতে খাদ্য সংকটে আতঙ্ক

জিল্লুর রহমান পলাশ, গাইবান্ধা প্রতিনিধি:
রংপুর চিনিকলের আওতাধীন গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাহেবগঞ্জ (বাগদা-কাটা) এলাকার জমি থেকে আধিবাসীদের (সাাঁওতাল) উপর হামলা চালিয়ে স্থাপিত শতশত একচালা ঘর আগুনে পুড়ে ফেলে উচ্ছেদ ও লুটপাটের ঘটনার পাঁচ দিনেও আতঙ্ক কাটেনি মাদারপুরের সাঁওতাল পল্লীতে।

এছাড়া আধিবাসীদের (সাঁওতাল) উচ্ছেদ করার পর ধ্বংস স্তপ (রচিক) কর্তৃপক্ষ ট্রাক্টর দিয়ে মাটির সাথে মিশে দিয়ে আখ রোপন ও চারপাশ তার কাঁটার বেড়া দেওয়া হয়েছে। ফলে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের লোকজন স্ত্রী, সন্তান নিয়ে সাপমারা ইউনিয়নের সাঁওতাল পল্লী মাদারপুর গ্রামে অবস্থান করছেন।

তবে এখানে স্ত্রী, সন্তান ও মেয়েরা অবস্থান করলেও পুলিশের দায়ের করা মামলায় গ্রেফতার ভয়ে পুরুষ শুন্য হয়ে পড়েছে মাদারপুর সাঁওতাল পল্লীতে। ফলে শতশত সাঁওতাল পরিবারে খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে এসব পরিবারের অনেকে খেয়ে না খেয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে।

এরআগে, পুলিশ পাহাড়ার (রচিক) কর্মাচারী-শ্রমিক এসব জমিতে আখ রোপন করতে গেলে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে সাঁওতালের ছোড়া তীরবিদ্ধ হয়ে ৯ পুলিশ আহত হয়। এছাড়া কয়েক দফায় সংঘর্ষে সাঁওতাল ও চিনিকলের প্রায় ৩০ জন শ্রমিক-কর্মচারী আহত হয়। পরে এ ঘটনায় গোবিন্দগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) কল্যাণ চন্দ্র বাদি হয়ে ৩৮ জন নামীয় ও অজ্ঞাত ৩০০ জনকে আসামী করে একটি মামলা দায়ের করেন।

মামলার পরদিন মঙ্গলবার (৭ নভেম্বর) পুলিশ অভিযান চালিয়ে দীজেন টুটু, চরণ সরেন, বিমল কিশকু ও মাঝিয়া হেমভ্রম নামে চার আদিবাসীকে গ্রেফতার করে। এছাড়া সংঘর্ষে দু’জন আধিবাসী (সাঁওতাল) নিহত হন। তারা হলেন, দিনাজপুর জেলার ঘোড়াঘাট উপজেলার চান্দুপর গ্রামের মৃত জ্যেঠা মাদ্রির ছেলে মঙ্গল মাদ্রি ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের শ্যামল হেমভ্রম।

তবে এ ঘটনার পর এখনো ১৫ জন সাঁওতাল নিখোঁজ রয়েছে বলে দাবি করছেন সাঁওতাল সম্প্রদায়ের জমি উদ্ধার সংহতি কমিটির সহ-সভাপতি ফিলিমন বাস্কে। বর্তমানে এসব ঘটনায় এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। তবে দুই সাঁওতাল নিহতের ঘটনা ঘটলেও এখনও এ নিয়ে থানায় মামলা হয়নি।

অপরদিকে, চিনিকলের এসব জমি দখল ও উচ্ছেদের নেপথ্যে ছিলেন স্থানীয় কয়েজন প্রতিনিধি। এমনটাই অভিযোগ করলেন সাঁওতাল সম্প্রদায়ের লোকজন। তাই সাঁওতাল পল্লীতে আবারও হামলার আতষ্কে ভূগছেন সাঁওতালরা। এছাড়া গত ৮ মাসে কয়েক দফায় সাঁওতালদের সঙ্গে পুলিশ ও চিনিকল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটায় চরম নিরাপত্তহীনতায় ভূগছেন সাঁওতাল পল্লীতে অবস্থান নেওয়া সাঁওতালরা।

বৃহস্পতিবার (১০ নভেম্বর) দুপুরে সাপমারা ইউনিয়নের মাদারপুর সাঁওতাল গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, পুরো সাঁওতাল পল্লীতে প্রায় পুরুষ শুন্য। এখানে নারীরা থাকলেও কাউকে দেখে তারা ভয়ে নিজেকে আড়াল করেন। কয়েকদিন ধরে সাঁওতাল পল্লীর ছেলে-মেয়েরা স্কুলেও যেতে পারছেনা। এমনকি পুরুষ না থাকায় মেয়ে ভয় ও নিরাপত্তহীনতার কারণে হাট-বাজার ও আশপাশেও বেড় হতে পারছেন না।

কথা হয় সাঁওতাল পল্লীর রুমিলা কিসকুর (৫০) সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমরা গরীব ও নিচু জাতের মানুষ। সামান্য কৃষি কাজ করে সংসার চলে। কিছুদিন আগে কষ্টের টাকা দিয়ে মিলের জমিতে একচালা ঘর তুললাম, কিন্তু পুলিশের উপস্থিতিতে তা ভেঙ্গে দেওয়া হলো। পরে ছেলে-মেয়েকে নিয়ে পুরানো বসতবাড়িতে গেলাম। সেখানেও হামলা চালিয়ে গরু-ছাগল লুট করা হলো। এখন আমারা কোথায় দাঁড়াব, আর আমাদের এ ক্ষতিপুরণ কে দেবে’।

ফুলমতি মুরমু (৫৫) বলেন, ‘খামারের জমিতে ঘর ছিল। তাতে কোন রকম দিনাতিপাত করছি। কিন্তু সেই ঘর আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ায় সব শেষ হয়ে গেছে। এখন আর মাথা গোজার কোন ঠাঁই নেই। কি আছে কপালে তাও জানা নেই। প্রতিদিন শিশু-বৃদ্ধদের নিয়ে খেয়ে না খেয়ে দিনকাটাচ্ছি। আমাদের সরকারি সাহায্য দরকার’।

এছাড়া সাঁওতাল পরিবারের ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্জলী মুরমু (৪৫), নিমুনি টুডু (৪০) তেরেজা মুরমু (৫৫) তরন মুরমু (৪৫), মিকাই মুরমু (৪৮), শ্যামল (৪০) ও সুভাস (৪৫) বলেন, ‘আন্দোলন সংগ্রাম করে গত ১ জুলাই খামারের প্রায় ১০০ একর জমি দখলে নিয়ে আমরা শতশত একচালা ঘর নির্মাণ করি। তখন থেকে সবাই খেয়ে না খেয়ে সেখানে কোনরকম দিনাদিপাত করছিলাম। কিন্তু এখন সেই ঘর ঘরে থাকা সম্পদ সব আগুনে পুড়ে শেষ হয়েছে। এমন ঘটনার বিচার কি পাব না সরকারের কাছে’।

রংপুর চিনিকলের ব্যবস্থাপক আব্দুল আউয়াল বলেন, ‘আইন শৃংখলা বাহিনী ও স্থানীয় জনগণের সহযোগিতায় চিনিকলের জমি দখল মুক্ত করা হয়েছে। এসব জমিতে এখন থেকে আখচাষের পাশাপাশি ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বেশ কিছু প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে’।

গোবিন্দগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুব্রত কুমার সরকার বলেন, ‘বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আছে। পুলিশের উপর হামলার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় এ পর্যন্ত চার জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছাড়া অন্য কাউকে গ্রেফতার বা হয়রানি করা হবে না। এছাড়া আধিবাসী সম্প্রদায়ের দুজন নিহতের ঘটনায় কেউ লিখিত অভিযোগ করেনি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে’।

গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. আবদুল হান্নান বলেন, ‘চিনিকলের দখল হওয়া জমি আইনি প্রক্রিয়ায় উদ্ধার করা হয়েছে। সাঁওতাল পরিবার এখন কর্মহীন হয়ে পড়ায় তারা নানাভাবে নিরাপত্তহীনতায় ভূগছেন। তবে তাদের সরকারীভাবে সহযোগিতা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে’।

প্রসঙ্গত: রংপুর চিনিকল কর্তৃপক্ষ ১৯৬২ সালে আখ চাষের জন্য গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাহেবগঞ্জ (বাগদা-কাটা) এলাকায় সাঁওতাল সম্প্রদায়ের কাছ থেকে ১৮৪২ একর জমি অধিগ্রহন করে। তখন থেকে এসব জমিতে উৎপাদিত আখ চিনিকলে সরবরাহ করা হচ্ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন ওইসব জমিতে মিল কর্তৃপক্ষ আখ চাষ না করে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালীর কাছে লিজ প্রদান করে। তারা লিজ নেয়ার পর ওইসব জমিতে তামাক, ধান, শাক-সবজিসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ করতে থাকে। এছাড়া এসব জমিতে অন্তত ১২টি পুকুর খনন করে মাছ চাষ করছে প্রভাবশালীরা। এ বছর কিছু জমিতে আখ চাষ করা হলেও সেই আখের চেহারা এতই খারাপ যে তা বাঁশের কঞ্চির চেয়েও চিকন।

পরে এসব জমি বাপ-দাদার দাবি করে আন্দোলনে নামে আধিবাসী (সাঁওতাল) সম্প্রদায়ের লোকজন। আন্দোলনের এক পর্যায়ে তারা গত ১ জুলাই এই খামারের প্রায় ১০০ একর জমি আবাদী জমিতে ছোট ছোট কুড়ে ঘর নির্মাণ করে দখলের চেষ্টা চালায়। ইতোমধ্যে তারা সেখানে ধান ও মাসকালাই চাষ শুরু করে। ওইদিন থেকে তারা তীর-ধনুক নিয়ে জমি পাহাড়া দেয়। সর্বশেষ গত রবিবার (৬ নভেম্বর) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত পুলিশের সঙ্গে আধিবাসীর (সাঁওতাল) ও কতিপয় দখলকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে ৯ পুলিশসহ উভয় পক্ষের অন্তত ৩০ জন আহত হয়।

  •  
  •  
  •  
  •  

Tags: