বালু খেকো কে এই মিজান ?
দিনাজপুর প্রতিনিধি:
দিনাজপুরের হাকিমপুর উপজেলার পূর্ব দিকে খট্টামাধবপাড়া ইউনিয়নের নয়ানগর গ্রাম এবং বিরামপুর উপজেলার পশ্চিমে কাটলা ইউনিয়নের চৌঘরিয়া গ্রাম। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বয়ে যাওয়া সীমান্তবর্তী শাখা যমুনা নদী এই দুই ইউনিয়নকে ভাগ করেছে। আর এই কারণে নদীর দুই অংশে নয়ানগর ও চৌঘরিয়া বালুমহাল দুইটির ইজারা নিয়েছেন নয়ানগন গ্রামের প্রভাবশালী মিজানুর রহমান।
হাকিমপুর উপজেলা ভূমি কার্যালয় সূত্রে জানাগেছে, বালু মহল দুটি ইজারা নিয়েছেন উপজেলার নয়ানগর গ্রামের বাসিন্দা মিজানুর রহমান।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাকিমপুর উপজেলা খট্টামাধবপাড়া ইউনিয়নের নয়ানগর এবং মাধবপাড়া গ্রামের ৫’শ গজ পশ্চিমে শাখা যমুনা নদীতে শ্যালো চালিত মেশিন বসিয়ে ইজারাদারের লোকজনেরা নদীর মাঝ থেকে বালু তুলছেন। আবার সেসব বালু ট্রাকটরে পরিবহন করে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেখানে রয়েছে হাকিমপুর ও বিরামপুরের দুই ইউনিয়নের লোকজনের পারাপারের নৌকা ঘাট। বালু উত্তোলন এবং পরিবহনের ফলে সেখানকার ফসলী জমি, মংলা-কাটলা সড়ক, মাধবপাড়া গ্রামের ভেতরের পাকা সড়ক এবং ড্রেন ভেঙ্গে ও বিলীন হয়ে গেছে। এরফলে হুমকির মুখে এসব এলাকা।
নদীর দুই অংশের স্থানিয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে নিয়ম উপেক্ষা করে শ্যালো মেশিন দিয়ে (যন্ত্র) অবৈধভাবে বালু তুলছেন তিনি। স্থানিয় সাংসদ অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে নির্দেশ দিলেও বন্ধ হয়নি। এখনো চলছে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন। স্থানিয়দের অভিযোগ, তাহলে মিজানুরের খুঁটির জোর কোথায়?
নয়ানগর ও চৌঘরিয়া নৌকা ঘাটের ইজারাদার নাসির উদ্দিন (৬৫) জানান, আমি প্রায় ৩০ বছর ধরে এই ঘাট চালাচ্ছি। আর গত ১০-১২ বছর ধরে এই ঘাটের পাশ-পাশ থেকে শ্যালো মেশিন দিয়ে বালু তোলা শুরু হয়। বালুর ইজারাদার মিজানুর এই ভাবে বালু তুলছেন। এর আগে অন্যান্য ইজারাদাররা বালু তুলতেন। শ্যালো দিয়ে বালু তোলায় নদীটির পশ্চিম দিকের পাড় ভাঙতে-ভাঙতে প্রায় ৫’শ গজ সরে এসেছে বলেও জানান তিনি।
কাটলা ইউনিয়নের চৌঘুরিয়া গ্রামের রেহানা পারভীন (৫০) জানান, শ্যালো দিয়ে বালু তোলায় নদীটির বিভিন্ন স্থানে গভীর খাদের সৃষ্টি হয়েছে। গত তিন বছর আগে আমাদের গ্রামের এক শিশু নদীর খাদে পড়ে মারা যায়। তখন থেকে গ্রামের মানুষ বালু তোলা বন্ধের দাবী জানিয়ে আসছে। কিন্তু কে শোনে কার কথা। এনিয়ে একবার গ্রামের লোকজনের সাথে মিজানুরের লোকজনদের মধ্যে মারামারি ও মামলা-মোকাদ্দমা হয়েছিল।
ওই গ্রামের আবু সাইদ (৪৬) জানান, নদী ভাঙনে তাঁর দুই একর, সামছুল হকের (৬০) দশ কাঠা, নাসির উদ্দিনের (৬৫) দুই বিঘা জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। তাঁরা সকলেই অভিযোগ করে জানান, এবিষয়ে গত বছর থেকে তাঁরা স্থানীয় সাংসদ শিবলী সাদিক সহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। কিন্তু তাতে কোন লাভ হয়নি। উল্টো বালুমহাল ইজারাদার মিজানুরের সন্ত্রাসীরা তাঁদের বিভিন্ন ভাবে ভয়ভীতি সহ হুমকি-ধামকি দিয়ে থাকেন।
মাধবপাড়া গ্রামের পার্শ্বের নদীর ধারে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে শ্যালো দিয়ে তোল বালু নিতে এসেছে কয়েকটি ট্রাকটর। ট্রাকটর চালকরা জানায়, তাঁরা মোটা বালু ৫’শ টাকা এবং বিট বা রাবিশ বালু ৩’শ টাকা করে কেনেন। হিলিতে প্রতি ট্রাকটর বালু ১২’শ টাকা এবং রাবিশ বালু ৭’শ টাকা দরে বিক্রি করেন। এই ঘাট থেকে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০টি ট্রাকটরে মোটা বালু ও রাবিশ বালু পরিবহন করা হয়। প্রতিটি ট্রাকটর প্রতিদিন কমপক্ষে ৩-৪ বার করে বালু নিয়ে যায়।
কাটলার রামচন্দ্রপুর গ্রামের জুয়েল মিয়া (৩৫), খট্টামাধপাড়ার হাসান বাবু (৩২) জানান, শ্যালো দিয়ে অবৈধ বালু তোলায় নদী তীরবর্তী বহু লোকের শত-শত একর জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে। বালু উত্তোলনে বাঁধা দিতে গেলে বালুমহাল ইজারাদার মিজানুর তাঁদের পুলিশ দিয়ে হয়রানী সহ বিভিন্নভাবে হুমকি দেয়। উপজেলা প্রশাসনও মিজানুরের পক্ষে কথা বলে।
মাধবপাড়া গ্রামের সালেমা বেগম (৪৫), নুরসানা খাতুন (২৫) ক্ষুব্দকণ্ঠে সাংবাদিকদের জানান, কত সাংবাদিক রিপোর্ট করার কথা বলে আমাদের বক্তব্য নিলো, কিন্তু বালু তোলা বন্ধ হলো না। মিজানুর এতোবড় কি হলো। তারা আরও জানান, বালু নিতে আসা ট্রাকটর আসা যাওয়ার কারনে তাঁদের সড়কটি চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। বর্ষাকালে কোন ভাবেই চলাচল করা যায় না। গ্রামের একমাত্র পানি নিষ্কাশনের ড্রেনটিও ভেঙ্গে গেছে।
এদিকে বালু মহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন-২০১০ এর ধারা ৫ এর ১ উপধারা অনুযায়ী পাম্প বা ড্রেজিং বা অন্য কোন মাধ্যমে ভূ-গর্ভস্থ বালু বা মাটি উত্তোলন করা যাবে না। ধারা ৪ এর (খ) অনুযায়ী সেতু কালভার্ট ড্যাম, ব্যারেজ, বাঁধ সড়ক, মহাসড়ক, বন, রেললাইন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনা হলে অথবা আবাসিক এলাকা হতে সর্ব নি¤œ এক কিলোমিটারের মধ্যে বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এবিষয়ে খট্টামাধবপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের সরকার দলীয় চেয়ারম্যান মো. মোকলেছুর রহমান জানান, এলাকাবাসীর একাধিক অভিযোগের প্রেক্ষিতে স্থানীয় সাংসদ শিবলী সাদিক তাঁকে বালু উত্তোলনে শ্যালো মেশিন আটক করার নির্দেশ দেন। বিষয়টি তিনি হাকিমপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং সহকারি কমিশনারকে (ভূমি) জানিয়ে তাদের সহযোগিতা চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রশাসনের সহযোগিতা না পাওয়ায় সেগুলো আটক করতে পারেননি। এখনো ভূক্তভোগিরা এই অভিযোগ নিয়ে প্রতিদিন ইউনিয়ন পরিষদে আসছে।
অভিযুক্ত বালুমহাল ইজারাদার মিজানুর রহমান গত বুধবার মুঠোফোনে দাবী করে জানান, তিনি একজন প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার। দিনাজপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের হর্তাকর্তারা তাকে জানিয়েছে, প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার যদি কেউ হয়, তাহলে ওই ঠিকাদার শ্যালো মেশিন দিয়ে বালু তুলতে পারবে। তাদের এমন কথায় তিনি বালু উত্তোলন করছেন। কে কি বললো, না লিখলো তাতে আমার কোনো যায় আসে না।
এ ব্যাপারে হাকিমপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোছা. শুকরিয়া পারভীন সাংবাদিকদের জানান, হাকিমপুুরে কাউকেই শ্যালো মেশিন দিয়ে (যন্ত্র) বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া নেই। এই ধরনের অভিযোগের বিষয়টি তাঁর জানা নেই। তবে সত্যতা পাওয়া গেলে তিনি তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা নেবেন বলে জানিয়েছিলেন।

