স্বাবলম্বী মানুষের প্রতিকৃতি গাইবান্ধার জাকির হোসেন
জিল্লুর রহমান পলাশ, গাইবান্ধা প্রতিনিধি:
স্বাবলম্বী মানুষের প্রতিকৃতি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কাটবাড়ী ইউনিয়নের বাগদাহাট গ্রামের জাকির হোসেন। অল্প সময়ের ব্যবধানে দু’টি পুকুর থেকে এখন তার ২৬টি পুকুর। মাছ উৎপাদন করে তার বছরে আয় ৩৫ লাখ টাকা। জাকিরের মাছ চাষ দেখে এলাকার অনেকেই এখন মাছ চাষের দিকে ঝুঁকছেন।
ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার মাছ চাষীদের প্রেরণায় ২০০৬ সালে দু’টি পুকুরে মাছ চাষ শুরু করেন জাকির। পর্যায়ক্রমে বাড়তে থাকে পুকুরে সংখ্যা। বর্তমানে নিজ বাড়ি সংলগ্ন একশ একর জায়গাজুড়ে রয়েছে তার ছোট-বড় ২৬টি পুকুর। পুকুর পারে সারিসারি লাগানো হয়েছে আম, পেয়ারা, সুপারী, লেবু, লেচু, জাম, নারিকেলসহ বিভিন্ন প্রজাতির ফলজ-বনজ গাছ। মাছ উৎপাদন করে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করায় ২০১০ সালে হ্যাচারিতে বিভিন্ন জাতের রেনুপোনা এবং ২০১১ সালে নিজেই বাড়িতে মেশিন দিয়ে মাছের খাদ্য উৎপাদন শুরু করেন। বাজারের খাদ্যের চেয়ে তার তৈরিকৃত খাদ্য অনেকাংশে পুষ্টিকর এবং দামেও সাশ্রয়ী। নিজের তৈরি খাদ্য ব্যবহার করায় খুব দ্রুত জাকির মাছ চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছে। তার পুকুরের রয়েছে গোলসা, টেংরা, পাবদা, কৈ, শিং, দেশি মাগুর, বাটা মুশা, তেলাপিয়া, রুই, পাঙ্গাস, বোয়াল, চিতলসহ বিভিন্ন দেশী-বিদেশী মাছ। এসব দেখভালের জন্য ৩৫ জন শ্রমিক দিনরাত কাজ করছে জাকির হোসেনের ওয়ালী মৎস্য হ্যাচারিতে।
মাছ চাষের পাশাপাশি জাকির হোসেনের রয়েছে ২৩টি গরু, নিজ বাড়ির ছাদে লাগানো হয়েছে উন্নতমানের পেয়ারা ও আতা ফলের ২০টি ফলের গাছ। সংসার জীবনে তার ঘরৈ রয়েছে বাবা-মা, স্ত্রী ও দুই ছেলে। বড় ছেলে ওয়ালী আহম্মেদ গোবিন্দগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে এবং ছোট ছেলে অনিক মাহমুদ বাগদা বিকিরন কিন্ডার গার্ডেনে ২য় শ্রেণিতে পড়ালেখা করছে। সংসারের কাজের ফাঁকে তার স্ত্রী আঞ্জুয়ারা বেগম সার্বক্ষণিক তাকে সহায়তা করনে বলে জানান জাকির হোসেন।
গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার বাগদা গ্রামের মোজাম্মেল হক বলেন, জাকির মাছ চাষে সফল যুবক। তিনি প্রায় ১০ বছর আগে নিজের ২টি পুকুরে মাছের চাষ করলেও এখন তার ২৬টি পুকুর রয়েছে। এসব পুকুরে মাছের খাবার তিনি নিজেই তৈরি করেন। যা স্বল্প দামে ও হাতের নাগালে পাওয়া যায়। তিনি সঠিক পরিচর্যা ও সময়মত খাদ্য সরবরাহ করার কারণে মাছ চাষের কোন অসুবিধা হয়না তার।
দিনাজুপুরের মোস্তফা মিয়া ও রফিকুল ইসলাম জানান, জাকির হোসেন মৎস্য চাষ করে করে স্বাবলম্বী হয়েছে। তার এ প্রকল্প দেখতে আমরা দিনাজপুর থেকে এসেছি। আমরাও এ ধরণের প্রকল্প হাতে নিয়ে নিজ উদ্যোগে মাছ চাষ করার চিন্তাভাবনা করছি।
গোবিন্দগঞ্জ বাগদাহাটের ওয়ালী মৎস্য হ্যাচারির কর্মচারী বিষা শেখ বলেন, জাকির ভাইয়ের ২৬টি পুকুর দেখশোন করছি। এখানে ৩৫ জন শ্রমিক প্রতিদিন কাজ করে। মাছের খাদ্য উৎপাদন শ্রমিক সোহাগ হোসেন জানান, আমরা মাছের খাদ্য তৈরি করি। এখানে ভুট্টা, খল, নালি, তিলেরখাজা, ভিটামিনসহ বিভিন্ন ধরণের খাদ্যসামগ্রী মেশিনের মাধ্যমে মিকচার করে খাদ্য তৈরি করছি। প্রতিদিন ২৬টি পুকুরের জন্য ২ টণ খাদ্য লাগে।
গোবিগঞ্জের বাগদাহাটের ওয়ালী মৎস্য হ্যাচারি সত্বাধিকারী জাকির হোসেন বলেন, আরও বড় সরে মাছ চাষের পরিকল্পনা রয়েছে। যাতে এ এলাকার বেকার যুবকদের কাজে লাগাতে পারি। উঁচু জমিতেও যে মাছ চাষ করা যায় সে ধারনা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। পরিশ্রম করলে সব কিছু করা সম্ভব বলে জানান জাকির হোসেন। নানা প্রজাতির মাছ চাষি ২৬টি পুকুরে মালিক জাকির বললেন, এখন আমি আত্মনিভর্রশীল হয়েছি।
গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার সরকার জানান, জাকির হোসেন গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা তথা গোটা জেলার জন্য একজন মডেল হিসেবে কাজ করছেন। মৎস্য চাষে তার সাফল্য অভাবনীয়। জাকিরের অনুপ্রেরণায় এই এলাকায় আরও অনেকে মাছ চাষ শুরু করেছে। আমরা তাদের পরামর্শ ও সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছি।
তিনি আরও জানান, এ উপজেলায় ৬ হাজার ২৭৬ জন মৎস্য চাষী পুকুর থেকে ৩ হাজার ৯৬৯ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন করছে।

