বেসরকারি ক্লিনিকে বেড়েছে সিজারিয়ান অপারেশন
কাজী কামাল হোসেন, নওগাঁ:
দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে সিজারিয়ান অপারেশনের প্রবণতা। নওগাঁয় বেসরকারি ক্লিনিক গুলোতে সিজারিয়ান অপারেশনের প্রবনতার হার তুলনামূলক বেশি। প্রাকৃতিক ভাবে বাচ্চা প্রসব (নরমাল) হওয়ার সম্ভবনা থাকলেও ক্লিনিক মালিক, ডাক্তার, নার্স এবং দালালদের যোগসাজসে সিজারিয়ান অপারেশন করা হচ্ছে। সিজারিয়ান অপারেশনের বেশি ভাগ টাকা যায় ডাক্তারের পকেটে। নার্স এবং দালালদের সামান্য কিছু কমিশন দিয়ে সন্তুষ্ট করা হয়। আর সিজারিয়ান অপারেশনে ফলে লাভ হচ্ছে ক্লিনিক মালিকের। একটি সূত্রে জানা গেছে। সচেতন মহল মনে করছেন সিজারিয়ান একটি ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।
জেলা সিভিল সার্জন পরিসংখ্যান অফিস ও সদর হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, জেলায় আধুনিক সদর হাসপাতাল ১টি, ১০টি উপজেলায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ১০টি এবং ৭২টি বেসরকারি ক্লিনিক রয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ৪০টির মতো বেসরকারি ক্লিনিক রয়েছে। নওগাঁ সদর হাসপাতালে ২০১৬ সালে সিজারিয়ান অপারেশন ৫৫৮ জন এবং নরমাল ডেলিভারী ৬১৭ জন, ২০১৫ সালে সিজারিয়ান অপারেশন ৫৫৯ জন এবং নরমাল ডেলিভারী ৬৮১ জন, ২০১৪ সালে সিজারিয়ান অপারেশন ৪৪৯ জন এবং নরমাল ডেলিভারী হয়েছে ৭১৭ জন। নওগাঁ এমসিডব্লিউতে সিজারিয়ান অপারেশন ৫২ জন এবং নরমাল ডেলিভারী ৩০১ জন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গুলোতে ২০১৬ সালে সিজারিয়ান অপারেশন ৩২৩ জন এবং নরমাল ডেলিভারী ২ হাজার ৬৫ জন, ২০১৫ সালে সিজারিয়ান অপারেশন ৯৯৯ জন এবং নরমাল ডেলিভারী ৪ হাজার ৩৮৪ জন, ২০১৪ সালে সিজারিয়ান অপারেশন ৯৪৪ জন এবং নরমাল ডেলিভারী হয়েছে ৩ হাজার ৮৬০ জন। বেসরকারি ক্লিনিক গুলোতো ২০১৬ সালে সিজারিয়ান অপারেশন ৬ হাজার ১১৪ জন এবং নরমাল ডেলিভারী ৯৩৫ জন, ২০১৫ সালে সিজারিয়ান অপারেশন ৩ হাজার ৯৭ জন এবং নরমাল ডেলিভারী ২ হাজার ৯৭৬ জন, ২০১৪ সালে সিজারিয়ান অপারেশন ২ হাজার ৭৯২ জন এবং নরমাল ডেলিভারী ২ হাজার ২৬৬ জন।
২০১৬ সালে সবচেয়ে বেশী যেসব বেসরকারি ক্লিনিক গুলোতে সন্তান জন্মগ্রহণ করেছে। এগুলোর মধ্যে বদলগাছী জেনারেল হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশন ১ হাজার ২৪৫জন ও নরমাল ডেলিভারী ২৪১ জন, ইসলামি ব্যাংক হাসপাতাল সিজারিয়ান অপারেশন ৯৮৭ ও নরমাল ডেলিভারী ১১৮ জন, হলি ফ্যামিলি সিজারিয়ান অপারেশন ৯৫১ ও নরমাল ডেলিভারী ৪৫ জন, প্রাইম ল্যাব এন্ড হাসপাতাল সিজারিয়ান অপারেশন ৬৯০ জন ও নরমাল ডেলিভারী ৭০ জন, উত্তরা ক্লিনিক সিজারিয়ান অপারেশন ৩২৫ জন ও নরমাল ডেলিভারী ৭৭ জন, সেন্ট্রাল ল্যাব এন্ড হাসপাতাল সিজারিয়ান অপারেশন ২৮১ জন ও নরমাল ডেলিভারী ৫৩ জন, সান্তাহার ক্লিনিক সিজারিয়ান অপারেশন ২৪৯ জন ও নরমাল ডেলিভারী ৩১ জন, এ্যাপোলো ক্লিনিক সিজারিয়ান অপারেশন ২৪৭ ও নরমাল ডেলিভারী ৩৯ জন, বলাকা ক্লিনিক সিজারিয়ান অপারেশন ২০০জন ও নরমাল ডেলিভারী ২০ জন, প্রত্যাশা ক্লিনিক সিজারিয়ান অপারেশন ১৯০ জন ও নরমাল ডেলিভারী ৩১ জন। অপারেশনের মাধ্যমে বাচ্চাকে মায়ের গর্ভ থেকে বের করে আনার প্রচলিত পদ্ধতি হচ্ছে সিজারিয়ান অপারেশন। যদিও এটা স্বাভাবিক কোন ব্যবস্থা না। সাম্প্রতিক সময়ে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে ডেলিভারি করানোর হার নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আজ কাল ভয়ংকর ভাবে এই অপারেশনের ব্যবহার বেড়েই চলছে। মায়েরা আর কোন ভাবে প্রসব বেদনার অভিজ্ঞতা নিতে আগ্রহী নন। এছাড়া অনেক পরিবার সিজারিয়ান অপারেশনকে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ মনে করছেন। বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক থেকে সুযোগ সুবিধার কথা উল্লেখ করে এলাকায় সাইনবোর্ড ও ব্যানার টাঙানো হয়। এছাড়া মাইকিং এবং মার্কেটিং করা হয়। গ্রামের লোকজনদের বুজিয়ে সুজিয়ে তাদের ক্লিনিকে নিয়ে আসা হয়। বিশেষ করে গ্রামের লোকজন দালালদের দ্বারা বেশি প্রতারিত হয়ে থাকেন। দালালদের বিভিন্ন ক্লিনিকের সাথে চুক্তি থাকে। ফলে গ্রামের মানুষরা কিছু না বুঝে তাদের কথায় ক্লিনিকে আসেন। বিভিন্ন অজুহাতের কথা বলে গর্ভবর্তী মহিলাকে বা তার আত্মীয় স্বজনকে সাত পাঁচ বুঝিয়ে স্বল্প খরচে সিজারিয়ান করে দেয়া হবে বলে জানায়। এছাড়া ক্লিনিকে আল্ট্রাসন করতে গেলে গর্ভবতীর অবস্থা খারাপ এবং বাচ্চার সমস্যা হবে বলে ভয়ভীতি দেখানো হয়। এক সময় নবাগত সন্তানের কথা ভেবে সিজারিয়ান করা হয়। যার বেশিভাগ অর্থ যায় ডাক্তারের পকেটে। আর ক্লিনিক মালিকের সাথে চুক্তিতে বিভিন্ন নরমাল ব্যান্ডের ঔষধে চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়। সিজারিয়ান অপারেশন করলে ক্লিনিকে কয়েকদিন থাকতে হয়। কমপক্ষে আট থেকে দশ হাজার টাকা খরচ হয়। কয়েকদিন বেডে থাকায় লাভ হয় ক্লিনিক মালিকের। নওগাঁ সদর হাসপাতালে গাইনি বিভাগে সিজার করে একটি মেয়ে বাচ্চার জন্ম দিয়েছেন শহরের চকপ্রান মহল্লার আয়েশা সিদ্দিকা। তিনি বলেন, এটি দ্বিতীয় সন্তান। বাচ্চা প্রসবের জন্য ডাক্তার একটি সময় বলে দিয়েছেন। সে সময়ের মধ্যে বাচ্চা জন্ম গ্রহণ করেনি। এছাড়া পানিও কমে গিয়েছিল। কোন ঝুঁকি না নিয়ে মঙ্গলবার সিজার করেছি।
সদর উপজেলার কাদোয়া গ্রামের প্রসুতি আঞ্জুরায়া বেগম বলেন, তিনদিন রক্ত¯্রাব হওয়ার পর বাচ্চা প্রসব না হওয়ায় সিজার করে ছেলে সন্তানের জন্ম দেন। যেহেতু এটা প্রথম সন্তান এবং কোন ঝুঁকি ঝামেলা নিতে চাননি। গরীব পরিবারের হওয়ায় ক্লিনিকে বেশি খরচ হবে বলে সদর হাসপাতালে এসেছি। নওগাঁ সদর হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট গাইনি ডা: সুলতানা জাহান বলেন, অনেক মায়েরা প্রসব ব্যাথা ভয় পান। আগে থেকে সিজার করার কথা চিন্তা করে থাকেন। ফলে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় যেতে চান না। এছাড়া পানি কমে যায় এবং মাঝে মধ্যে পেটের ভেতর বাচ্চা উল্টে থাকতে পারে। যদি মায়ের যোণী সরু হয় এবং বাচ্চা মাথার স্থান সংকুলান না করতে পারে তবে বাচ্চা প্রসব করা অসম্ভব হতে পারে। ফলে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া প্রসব করা মা ও শিশুর জন্য ঝুঁকি হতে পারে। ঝুঁকিপূর্ন যখন মা বা বাচ্চার কোনও সমস্যার কারনে সিজার করা হয়। জেলা পরিবার পরিকল্পনা উপ-পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) কর্মকর্তা ডা. কুস্তরী আমিনা কুইন বলেন, সিজারিয়ান মূলত দুইটি কারণে হয়। একটি প্রয়োজনে এবং অপরটি ইচ্ছাকৃত ভাবে। এটির সাথে একটি ব্যবসা জড়িত। বাহিরের ক্লিনিকগুলোতে বেশি সিজারিয়ান হয়ে থাকে। আল্ট্রাসনোগ্রাম করে অনেক সময় পানি কমে গেছে বলে গর্ভবতীকে ভয় দেখানো হয়। দ্রুত সিজার করতে হবে। না হলে বাচ্চার সমস্যা হতে পারে। নওগাঁ সিভিল সার্জন ডা: রওশন আরা খানম বলেন, সিজারিয়ান বেশি হচ্ছে। এ বিষয়টি আমার জানা আছে। এ বিষয়টি দেখব বলে জানান।

