বৌদ্ধ মন্দিরে ফ্রিতে ইফতার বিতরণ: সম্প্রীতির অনন্য নজির
নিজস্ব প্রতিবেদক:
ইফতার নিচ্ছেন দুস্থ নারীরাসুফিয়া খাতুন পঁচাশি বছর বয়সেও দু’বেলা খাবারের জন্য সংগ্রাম করছেন। তার এ সংগ্রাম দীর্ঘ দিনের। তবে রোজার মাস আসলে তাকে আর ইফতারের জন্য কষ্ট করতে হয় না। প্রতিবছর রাজধানীর বাসাবো বৌদ্ধ মন্দির থেকে তাকে ইফতার দেওয়া হয়। শুধু সুফিয়া খাতুনই নন, এই মন্দিরে ইফতার দেওয়া হয় এলাকার সব দুস্থদের। রোজার মাসে এই এলাকার গরিব মানুষের ভরসাই যেন বৌদ্ধ মন্দির।
সুফিয়া খাতুন বাবা মায়ের সঙ্গে বিক্রমপুর থেকে ঢাকায় আসেন ১৯৭৬ সালে। তখন থেকেই বাসাবোতে থাকেন। স্বামী মারা গেছেন অনেক আগেই। তিনি বলেন, ‘জানি রোজা শুরু হলেই বৌদ্ধ মন্দির থেকে ইফতার পাবো। তাই ইফতার নিয়ে চিন্তা করি না। রোজার মাসে একটু ভালো ইফতারের আশায় এই মন্দির থেকেই ইফতার নিই। শুধু আমি একা নই। এই এলাকার সব গরিব মানুষের ভরসা এই মন্দির।’
ভিন্ন ধর্মের মানুষের উপাসনালয় থেকে ইফতার নিতে খারাপ লাগে না প্রশ্নে সুফিয়া খাতুন বলেন, ‘দুনিয়াজোড়া মানুষের রক্ত যেমন একই রকম লাল, খাবারও একই রকম। আর ধর্মতো আমারে নিষেধ করেনি অন্য ধর্মের মানুষের কাছ থেকে ইফতার নিতে।’
কমলাপুর বৌদ্ধ মন্দিরে ইফতার বিতরণ করছেন বৌদ্ধ ভিক্ষুরাসুফিয়া খাতুনের কথা শুনে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বৌদ্ধ মন্দির এলাকার বাসিন্দা প্রান্ত বলেন, ‘আমরা সারা বছর অপেক্ষা করি রোজার মাসের জন্য। এ যেন আমাদের অন্যরকম উৎসব। নিজেদের হাতে আমরা পেঁয়াজু, বেগুনি ভাজি, ছোলা রান্না করি। সেগুলো প্যাকেট করি। রোজা শেষ হলে আমাদেরও মন খারাপ হয়।’
বৌদ্ধ মন্দির থেকে মুসলিমদের যারা ইফতার দিচ্ছেন এবং যারা নিচ্ছেন সবাই প্রায় স্থানীয় লোকজন। শুক্রবার (৯ জুন) সরেজমিনে বাসাবো সবুজবাগের ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহামন্দিরে এ চিত্র দেখা গেছে। এখানে যারা ইফতার সরবরাহ করছেন এবং যারা নিচ্ছেন তারা সবাই বলছেন, এটা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য নজির। এখানে ধর্মের কোনও ভেদাভেদ নেই।
ইফতারের আগে মন্দিরে গিয়ে দেখা যায়, মূল ফটকের বাইরে যারা অপেক্ষা করছেন, তারা এলাকার গরিব মানুষ। প্রতিবছর এখানে রোজার সময়ে এই মানুষগুলো এই ফটকের বাইরে এসে দাঁড়িয়ে থাকেন বিকাল থেকে। তবে পাঁচটার পর ফটক খুলে দেওয়া হয়।
মূল ফটকে দাঁড়িয়ে থাকা একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু অপেক্ষমান মানুষদের হাতে তুলে দিচ্ছেন নম্বর লেখা একটি করে টোকেন । সেই টোকেন নিয়ে মন্দিরের একেবারে ভেতরে খোলা জায়গায় সারি বেঁধে দাঁড়াচ্ছেন সবাই। শুরুর দিকে ইফতার নিতে আসা মানুষের সংখ্যা এক -দেড়শ থাকলেও শেষ সময়ে সেই সংখ্যা প্রায় পাঁচশ ছাড়িয়ে যায়।
বৌদ্ধ মন্দিরে ইফতার বিতরণস্থানীয় লোকজন এবং বৌদ্ধ ভিক্ষুরা জানালেন, সমাজের এসব খেটে খাওয়া মানুষদের জন্য প্যাকেটভর্তি ইফতার সরবরাহ করেন মহাবিহারের প্রধানসহ অন্যরা। এ চিত্র শুধু এ বছর নয়। এমনটা চলছে বিগত সাত বছর ধরে।
এবছর ইফতারের প্যাকেট দেওয়া হচ্ছে প্রতিদিন পাঁচশটি করে। তবে গত বছরগুলোতে ভিক্ষুরা নিজেদের হাতে ইফতার বানালেও এবারে গ্যাসের সমস্যার কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে কেনা ইফতারই সরবরাহ করা হচ্ছে।
বৌদ্ধ মহাবিহারের মন্দির প্রধান শুদ্ধানন্দ মহাথেরো বলেন, ‘গ্যাস না থাকার কারণে এখানে থাকা প্রায় ৫০০ ছেলেদের জন্য রান্না করাটাই দুষ্কর হয়ে পড়েছে। তবে ইফতার না দিয়ে ফেরানো যাবে না উপস্থিত গরিব মানুষদের। তাই পাশের একটি হোটেল থেকে ইফতার কিনে আনা হয়। প্রতিটি প্যাকেটে থাকছে ছোলা, পেঁয়াজু, বেগুনি, মুড়ি, আলুর চপ ও জিলাপি। প্রতি প্যাকেটের দাম পড়ছে ৬০ টাকা করে।এভাবে প্রতিদিন আমরা ৫০০ প্যাকেট ইফতার দিচ্ছি।’
শুদ্ধানন্দ মহাথেরোর ভাষ্য, ‘আমরা সবাই মানুষ, তারপর বাঙালি, এখানে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতিটাই আসল কথা। কে বৌদ্ধ, কে মুসলিম, কে হিন্দু বা খ্রিস্টান সেটা যার যার ধর্মের বিষয়। কিন্তু সবাই আমরা একসঙ্গে খেয়ে পরে বেঁচে থাকতে পারি, এখানে কোনও ভেদাভেদ নেই। এটাই মনুষ্য জীবনের আনন্দ। এই যে সম্প্রীতি, এটাই আমাদের বাংলাদেশ। ধর্মে-ধর্মের সম্প্রীতিই বাংলাদেশের মূলশক্তি।’
শুদ্ধানন্দ মহাথেরো বলেন, ‘শুধু মন্দিরের সহযোগিতায় নয়, অনেকেই মন্দিরের এই ইফতারের আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। এ কাজে এলাকাবাসীও আমাকে খুব সাহায্য করেন। সাহায্য করেন এদেশে ব্যবসা করতে আসা কয়েকজন বিদেশিও।’
‘সারাদিন রোজা রেখে কেউ যেন অভুক্ত না থাকে, ইফতারের জন্য যেন তাকে কোনও চিন্তা করতে না হয়, শুধু পানি খেয়ে যেন তাকে ইফতার না করতে হয়। সেজন্যই আমার এ ক্ষুদ্র চেষ্টা।’
শুদ্ধানন্দ মহাথেরো জানান, একজন বিদেশি আছেন, যিনি এই মন্দিরে প্রতিমাসে এক লাখ টাকার চাল দেন। বাসাবো এলাকার হাজী নেকবর হোসেন চাল দিয়ে আসছেন প্রায় ৩০ বছর ধরে। ‘এভাবেই সবার সহযোগিতায় মন্দিরের ভেতরে থাকা আশ্রম আর এই ইফতার আমি চালিয়ে নিচ্ছি।’
বাসাবো এলাকার আবেদা বেগম, শাজাহানপুরের কমলা খাতুন, হোসেন আরা বেগম, আবুল হোসেন, লিয়াকত আলীসহ এই এলাকার খেটে খাওয়া মানুষেরা জানান, শুধু এই ইফতারই নয়, ঈদের আগে ইফতারের সঙ্গে আরও অনেক কিছুই দেওয়া হবে। শাড়ি, লুঙ্গি ও জামাও দেওয়া হবে ঈদের জন্য। পোলাও চাল, সেমাই, চিনিও দেওয়া হবে।
ঈদের আগে ও রোজার সময় তাই এই এলাকার গরিব মানুষের ঈদ আয়োজন নিয়ে কোনও চিন্তার দরকার পড়ে না বলে জানান উপস্থিত লোকজন।

