রুয়েটে খুদে বিজ্ঞানীদের মিলনমেলা

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি:
ফারহান আহমেদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল অ্যান্ড কলেজ’র নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। একহাতে ল্যাপটপ, আরেক হাতে একটি ছোট্ট রোবট। এসেছেন রোবট্রনিক্স-২০১৯ প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে। মাইকে প্রতিযোগীদের নাম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে কানে বাজছিল উৎসুক দর্শকদের হাত তালির শব্দ। কিন্তু ব্যতিক্রম ঘটল কেবল ফারহানের বেলায়। যখন তার নামটি ঘোষণা করা হলো তখন সবাই বিষ্মিত। যেন হাত তালি থামছেই না দর্শকদের। প্রতিযোগিতার মঞ্চে উঠে ফারহান তার তৈরি রোবটটি নির্দিষ্ট স্থানে রাখল। এরপর ল্যাপটপে কমান্ড দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পূর্বে থেকেই নির্দিষ্ট একটি আঁকাবাকা লাইন অনুসরণ করে চলতে শুরু করল রোবটটি। আর ৩৯ সেকেন্ডের মধ্যেই নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে গেল রোবটটি। আবারও দীর্ঘক্ষণ ধরে চারপাশ থেকে ভেসে আসতে লাগলো মুগ্ধ দর্শকদের হাত তালির শব্দ।

রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েটে) রোবট্রনিক্স-২০১৯’র একটি ইভেন্টের দৃশ্য ছিল এটি। যেই প্রতিযোগিতায় দেশের ১৯টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রায় আড়াইশ শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছিল। যাদের মধ্যে একমাত্র ফারহানই ছিল স্কুলপড়ুয়া। বাকি সবাই ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার্থী। ফারহান প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়নি ঠিকই; কিন্তু, শবেমাত্র স্কুল পড়ুয়া একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের কারণে দর্শক, বিচারকসহ সকলের মধ্যমণি হয়েছিল ফারহান। মোট পাঁচটি ইভেন্টে প্রতিযোগিতাটি অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিযোগিতার অন্য ইভেন্টগুলোতেও ছিল এমনই লড়াইয়ের আমেজ।

রুয়েটের মেকাট্রোনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ গত ২৬ সেপ্টেম্বর দিনব্যাপী এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। সকাল ৯টায় প্রতিযোগিতাটির উদ্বোধন করেন রুয়েট ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শামসুল আলম। এ সময় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মো. সেলিম হোসেন, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. মোশাররফ হোসেন, পরিচালক ছাত্র কল্যাণ অধ্যাপক ড. মো. রবিউল আওয়াল, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. ওসমান গনি তালুকদার, সিল্কোস অটোমেশন টেকনোলজি লিঃ এর পরিচালক নাসিক এম. আক্কাস। প্রতিযোগিতাটির আহ্বায়ক কমিটির প্রধান ও কারিগরি অংশীদার রোবটিক সোসাইটি অব রুয়েটের সভাপতি ড. সজল কুমার দাস অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন।

প্রতিযোগিতার আরেকটি ইভেন্ট ছিল রোবো রেসলিং। রুয়েটের প্রশাসনিক ভবনের নিচে তৈরি করা হয়েছিল রোবটদের লড়াইয়ের মঞ্চ। মঞ্চের সর্বত্র চলছিল রোবটদের মহড়া। মানুষের মত রোবটগুলোও নেমেছিল শক্তি পরীক্ষার খেলায়। প্রতিটি রোবটই পরস্পরের সঙ্গে লড়াই করেছে। কখনো রোবটগুলো পরস্পরকে ধাক্কা দিচ্ছিল, কখনো আবার পরস্পরের দেহে আঘাত করছিল। মঞ্চের বাইরে থেকে রোবট দুটি নিয়ন্ত্রণ করছিল দুই শিক্ষার্থী। বেশ কিছুক্ষণ পর একটির শক্তির কাছে হার মানে আরেক রোবট। এভাবেই জয়ী হয় সবচেয়ে শক্তিশালী রোবটটি। মঞ্চের চারপাশে দাঁড়িয়ে জটলা বেঁধে দর্শকরা উপভোগ করছিল এই লড়াইয়ের দৃশ্য।

স্কুল পড়ুয়া ফারহান বললেন, ছোট বেলা থেকেই প্রযুক্তিগত বিষয়ের প্রতি খুব ঝোঁক তার। বাবার হাত ধরেই এই শিক্ষায় হাতেখড়ি। ভবিষ্যতে সে নিজেই একটি সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রি প্রতিষ্ঠা করতে চায়। যেটা গুগলের মত প্রতিষ্ঠানকেও ছাড়িয়ে যাবে কিংবা এর সমতুল্য হবে।

উদ্বোধনের পর অনুষ্ঠিত হয় পোস্টার প্রেজেন্টেশন। সেখানে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীরা বিজ্ঞান সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় প্রদর্শন করেন। এরপর অনুষ্ঠিত হয় প্রোজেক্ট শোকেজ, রোবো রেসলিং, মাড রোভার ও স্পিড ব্যাটেল অনুষ্ঠিত হয়। দেশের ১৯টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীরা এ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করছে। দুই থেকে তিনজন করে শিক্ষার্থী নিয়ে একটি করে টিম হয়।

প্রোজেক্ট শোকেজিন ইভেন্টে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি চ্যাম্পিয়ন ও রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় রানার আপ, স্পিডব্যাটল ইভেন্টে ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় চ্যাম্পিয়ন ও বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি রানার আপ, রোবো-রেসলিং ইভেন্টে আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি চ্যাম্পিয়ন ও ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি রানার আপ, মাড-রোভার চ্যালেঞ্জ ইভেন্টে ডা. মাহবুবুর রাহমান কলেজ, ঢাকা চ্যাম্পিয়ন ও লিডিং ইউনিভার্সিটি, সিলেট রানার আপ এবং পোস্টার প্রেজেন্টেশন ইভেন্টে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় চ্যাম্পিয়ন ও রানার আপ হয় একই বিশ্ববিদ্যালয়।

আয়োজক কমিটির সদস্য ও রোবটিক্স ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান আকাশ বলেন, এবারের রোবট্রনিক্স প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের ১৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ের টিম এসেছে। সংখ্যায় বলতে গেলে প্রায় দুই থেকে আড়াইশো শিক্ষার্থী এ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছে। রোবট্রনিক্স-২০১৯ নামে এবারই প্রথম প্রতিযোগিতাটি অনুষ্ঠিত হলো। রোবট্রনিক্স প্রতিযোগিতার মাধ্যমে আমরা আশা করি এ প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন নতুন রোবট তৈরি করার আগ্রহ সৃষ্টি হবে। আগামীতে প্রতিবছরই এ ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজন করার ইচ্ছা তাদের।

বিকেল সাড়ে ৫টায় প্রতিযোগিতার সমাপনী পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিভিন্ন ইভেন্টে মোট দশজন বিজয়ীকে পুরস্কৃত করা হয়। এ ছাড়াও প্রতিটি ইভেন্টের বিজয়ী টিমদের সর্বমোট ২ লাখ ১৮ হাজার টাকার প্রাইজমানি প্রদান করা হয়। প্রতিযোগিতাটিতে মিডিয়া পার্টনার হিসেবে ছিল জাতীয় দৈনিক ‘দেশ রূপান্তর’ এবং টাইটেল স্পন্সর হিসেবে ছিল মার্কেন্টাইল ব্যাংক লিমিটেড।

মেকাট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সভাপতি ড. সজল কুমার দাস বলেন,‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাতে চাই এজন্য যে, তিনি দেশের প্রযুক্তিখাতের উন্নয়নকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। প্রধানমন্ত্রী ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্নের বীজ বপন করেছেন; রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেকাট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ সেই অভীষ্ট লক্ষ পূরণে কাজ করে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সে অনুযাযী পাঠদান করানো হচ্ছে। তার পাশাপাশি প্রযুক্তিগত সৃজনশীলতা বৃদ্ধির জন্য অতিরিক্ত ক্যারিকুলাম এক্টিভিটিস হিসেবে রোবট্রনিক্স-২০১৯ আয়োজন করে আসছে। এ ধরনের প্রতিযোগিতা শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে, যা পরবর্তীতে শিক্ষার্থীরা তাদের কর্মক্ষেত্রে কাজে লাগাতে পারবে। এসব ক্ষেত্রে দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত সমর্থন পাওয়া গেলে দেশের প্রযুক্তি খাত অনেক দুর এগিয়ে যাবেন বলে মনে করেন তিনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রফিকুল ইসলাম সেখ বলেন, বর্তমান সময়ে যেসব প্রযুক্তি আসছে তা সর্ম্পণ নতুন। এসব প্রযুক্তি মানুষের কাজকে আরো সহজ করবে। এ ধরনের প্রতিযোগিতার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেদের দক্ষতা সম্পর্কে জানতে পারবে। পাশাপাশি আগামী দিনের তরুণ প্রজন্ম তাদের বিজ্ঞান শেখার প্রতি আগ্রহী করে তুলবে বলে আমি আশা করি।’

(Visited 7 times, 1 visits today)