করোনা মহামারী ও ভেটেরিনারিয়ানদের ভূমিকা
সাবরিন জাহান:
করোনা ভাইরাস যা বর্তমানে কোভিড-১৯ নামে পরিচিত। এটি বিবিধ আরএনএ ভাইরাসগুলির মধ্যে অন্যতম যা চারটি স্বতন্ত্র গ্রুপে (আলফা, বিটা, গামা এবং ডেলটা) বিভক্ত। কোভিড-১৯ বিটা আরএনএ ভাইরাসের অন্তর্গত। এই মহামারী ভাইরাসের সংক্রামণ চীনের উহানের পৌর বাজারে শুরু হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। যেখানে বেশ কয়েকটি প্রজাতির বন্যপ্রাণি বাণিজ্যকরণ হয়েছিল এবং স্বাস্থ্য ও খাদ্য সুরক্ষার জন্য পর্যাপ্ত শর্ত না থাকায় ভাইরাসটি মধ্যবর্তী হোস্ট থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয়।
২০০২ সালে বিশ্বে মহামারী আকার ধারণ করেছিলো SARS-COV-2 নামে একটি ভাইরাস। এটিও একটি বিটা আরএনএ ভাইরাস। ধারণা করা হয় যে, কোভিড-১৯ ভাইরাসটি SARS-COV-2 এর উত্তরসূরি। SARS-COV-2 এর বাদুড়ের করোনা ভাইরাসগুলির সাথে ঘনিষ্ঠ জিনগত মিল রয়েছে বলে- এটি বাদুড় জনিত ভাইরাস থেকে উদ্ভূত বলে ধারণা করা হয় এবং জিনোসিসের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয়। এটি মূলত এঞ্জিও টেনসিন রূপান্তর কারী এনজাইম-২ এর সাথে আবদ্ধ হয়ে মানব কোষ গুলিতে প্রবেশ করে।
করোনা ভাইরাসের লক্ষণ:
এটি মূলত শ্বসনযন্ত্রের রোগ। এই ভাইরাসের সাধারণ লক্ষণগুলি হলোঃ জ্বর, সর্দি কাশি, পরিশ্রান্তি, শ্বাসকষ্ট। এছাড়াও অন্যান্য কিছু লক্ষণ হলো- গলাব্যাথা/ স্বরভঙ্গ, ডাইরিয়া, মাথা ব্যাথা, গন্ধ ও স্বাদ হীনতা, চামড়ার মধ্যে র্যাশ, হাত ও পায়ের আঙ্গুল বিবর্ণ হওয়া।
করোনা ভাইরাসের সংক্রামণ:
ভাইরাসটি প্রাথমিকভাবে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের মাধ্যমে এবং হাঁচি-কাশি থেকে উৎপাদিত শ্বাস প্রশ্বাসের ফোঁটা গুলোর মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। মানুষের ক্ষেত্রে এই ভাইরাস শ্বাসনালীর সংক্রমণ ঘটায়। বাংলাদেশে এই ভাইরাসটি সর্বপ্রথম সংক্রামণ ঘটায় ২০১৯ সালের ৮ই মার্চ। তারপর থেকেই ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। জুনোটিক সংক্রমণের মাধ্যমে কিছু পরিবর্তন দ্বারা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে আজকের করোনা ভাইরাস মহামারী আকার ধারণ করেছে।
যেহেতু এটি প্রাণি থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয়েছে তাই এই মহামারী নিয়ন্ত্রণে হিউম্যান ডাক্তারের মতই ভূমিকা রয়েছে ভেটেরিনারিয়ানদের। ভেটেরিনারিয়ানরা যে শুধু প্রাণি চিকিৎসা ও রোগ নিয়ন্ত্রণ করে তা নয় বরং মানব স্বাস্থ্য সুরক্ষায়ও এদের ভূমিকা তাৎপর্যপূর্ণ। বর্তমানে প্রাণি চিকিৎসকরা প্রাণির পাশাপাশি মানব স্বাস্থ্য সুরক্ষার এক অমূল্য সম্পদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলুন জেনে নেওয়া যাক করোনা মহামারীতে ভেটেরিনারিয়ানরা ভূমিকা-
প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ:
করোনা মহামারীর এই জটিল পরিস্থিতিতে হিউম্যান মেডিকেলগুলো একাই প্রয়োজনীয় সামগ্রী যেমন মাস্ক, পিপিই, ভেন্টিলেটর, রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি মেশিন ইত্যাদি সরবরাহে ব্যর্থ হচ্ছে। যেখানে ভেটেনারি হাসপাতাল তথা ভেটেরিনারিয়ানরা যথাসাধ্যভাবে এই প্রয়োজনীয় সামগ্রীগুলো সরবরাহ করছে। এতে করে করোনা রোগীদের স্বাস্থ্য সেবা ব্যাহত হচ্ছে না।
ভেটেরিনারি ল্যাবরেটরি ব্যবহার:
বর্তমানে করোনা ভাইরাস নিয়ে ব্যাপক গবেষণা চলছে। এতে করে করোনা ভাইরাস সম্বন্ধে বিশদভাবে জানা সম্ভব হচ্ছে। তাই সারা বিশ্বে ভেটেরিনারিয়ানরাও বসে নেই। তারাও করোনা ভাইরাস নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছে এবং পাশাপাশি হিউম্যান ডাক্তারদেরকে গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিসহ ল্যাবরেটরিও শেয়ার করছে।
স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে:
করোনা পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রচুর স্বেচ্ছাসেবক প্রয়োজন। আবার অনেকে করোনার নেতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করে স্বেচ্ছাসেবক হতে চান না। যেখানে বিশ্বের অনেক দেশের অনেক ভেটেরিনারিয়ানরা নিজেকে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে নিয়োজিত করেছে। তারা প্রতিনিয়ত করোনা পরিস্থিতির মোকাবেলা করছে এবং একজন সম্মুখ যোদ্ধা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।
জুনোটিক রোগ নিয়ন্ত্রণে:
যেসব রোগ প্রাণি থেকে মানুষের মধ্যে ছড়ায় তাকে জুনোটিক সংক্রামক রোগ বলে। ভেটেরিনারিয়ানরা প্রতিনিয়ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এই জুনোটিক রোগ নিয়ন্ত্রণে। তারা গবেষণা ও সংক্রমিত পশুকে উপযুক্ত চিকিৎসা দিয়ে এই রোগকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে যেন সেটি পরবর্তীতে মহামারী আকার ধারণ না করে। এভাবে ভেটেরিনারিয়ানরা প্রাণি থেকে মানব শরীরে রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করছে।
মেডিসিনে উদ্ভাবনে:
করোনা পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে বিভিন্ন ধরণের মেডিসিনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। কারণ একটি রোগী করোনা থেকে অব্যাহতি পেলেও তার ইমিউন সিস্টেম প্রচুরভাবে দূর্বল হয়ে পড়ে এবং তাকে বিভিন্ন ধরণের মেডিসিন নিতে হয়। এই বিশাল পরিমাণের বৈচিত্রপূর্ণ মেডিসিন আবিষ্কার করছে হিউম্যান মেডিসিন গবেষকের পাশাপাশি ভেটেরিনারিয়ান মেডিসিন গবেষকরা। বিশেষ করে অনুজীববিজ্ঞানে যথেষ্ট অবদান রাখছে ভেটেরিনারিয়ানরা। এছাড়াও অনেক বড় বড় ওষুধ কোম্পানীর মালিক ভেটেরিনারিয়ানরা প্রতিনিয়ত সেবা দিয়ে যাচ্ছে।
প্রাণির করোনা নিয়ন্ত্রণে:
যদিও সব ধরণের প্রাণিদের মধ্যে করোনা হয় না তবে কিছু কিছু প্রাণির মধ্যে দেখা দিয়েছে। শ্বাসতন্ত্রের কোষে করোনা ভাইরাস প্রবেশের জন্য এনজিওটেন্সিনোজন কনভার্টিং এঞ্জাইম নামক এক ধরণের বিশেষ রিসেপ্টর দরকার হয়। বাঘ, সিংহ ও অন্যান্য বিড়াল গোত্রের প্রাণির মধ্যে এই বিশেষ ধরণের এনজাইমের গঠন মানুষের এনজাইমের গঠনের মত এবং প্রায় একই ধরণের কাজ করে। তাই এসব প্রাণিতে করোনার ঝুঁকি বেশি। ভেটেরিনারি ডাক্তাররা প্রতিনিয়ত এসব প্রাণির সেবা দিচ্ছে এবং খেয়াল রাখছে যাতে অন্য প্রাণিদের মধ্যে করোনা ভাইরাস না ছড়িয়ে যায়।
এছাড়াও চিড়িয়াখানাতে বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করেছে ভেটেরিনারি ডাক্তাররা। কোনো প্রাণি যদি এই করোনাকালে রোগাক্রান্ত হয় তাহলে তারা অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে সেবা দিয়ে যাচ্ছে এবং করোনা যাতে না হয় তার জন্য উপযুক্ত পদক্ষেপ নিচ্ছেন। কোনো প্রাণি যদি আক্রান্ত হয়েই যায় তাহলে তাকে যথাযথভাবে কোয়ারেন্টাইন বা আইসোলেশন এর মাধ্যমে পরিচর্যা করে চলেছেন।
খাদ্য নিরাপত্তা ও সুষম খাদ্য নিশ্চিতকরণ:
করোনা মহামারীতে বিশ্বব্যাপী খাদ্য সুরক্ষার ভার যেন ভেটেরিনারিয়ানদের উপরে। সারা বিশ্বে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবারের সরবরাহ নিশ্চিত করছে ভেটেরিনারিয়ানরা। কৃষি উন্নয়ন, খামারগুলোর কার্যক্ষমতা ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করছে এবং নিরাপদ প্রাণিজ আমিষসহ সকল প্রকার খাবারের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করছে।
ভ্যাক্সিন আবিষ্কারে:
করোনার এই মহামারী ঠেকাতে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় চলছে ভ্যাক্সিন আবিষ্কারের গবেষণা। এই গবেষণা যে শুধু মাত্র হিউম্যান গবেষক করছে তা নয় বরং অনেক ভেটেরিনারিয়ান গবেষকও রয়েছেন এবং তারা প্রতিনিয়ত তাদের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে চলেছে। তারা যথাযথভাবে ভ্যাক্সিন আবিষ্কারের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেই যাচ্ছেন। ভেটেরিনারিয়ান হিসেবে একটি ‘ওয়ান হেলথ’ সার্ভিসের’ মাধ্যমে সারাবিশ্বে করোনার এই মহামারীর সময়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন রোগের প্রকোপ, প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের সাথে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আগের তুলনায় অনেক বেশি ভেটেরিনারিয়ানরা মানব চিকিৎসায় সহকর্মীদের সাথে বেশিরভাগ দেশে সহায়তা করছে। বিভিন্ন সরঞ্জাম সরবরাহ সহ ভেটেরিনারি প্রতিষ্ঠান এবং ল্যাবরেটরিগুলো অনেক দেশে সিভিডি পরীক্ষার প্রক্রিয়াকরণে সহায়তা করছে।
করোনা মোকাবেলায় বাংলাদেশের ভেটেরিনারিয়ানগণ:
করোনা মহামারীতে যেখানে সারা বিশ্ব এখন যুদ্ধ করছে সেখানে বাংলাদেশ হাল ছেড়ে বসে নেই। তারাও যুদ্ধ করছে এবং এর থেকে পরিত্রাণের উপায় খুঁজছে। বাংলাদেশের গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র ভেটেরিনারিয়ান বিজ্ঞানী ড. বিজন কুমার শীলের নেতৃত্বে একদল গবেষক একটি কিট উদ্ভাবন করেছেন। যার নাম দেয়া হয়েছে Q GR COVID-19। এটি একটি এন্টিবডি এন্টিজেন সমন্বিত টেস্ট কিট। ড. বিজন কুমার শীল ও তার গবেষকদল উল্লেখ করেছেন যে, তাদের এন্টিবডি এন্টিজেন সমন্বিত ডায়াগনস্টিক কিট দিয়ে পরীক্ষিত সবগুলো নমুনায় পজিটিভ রেজাল্ট দিয়েছে। উনার উদ্ভাবিত SARS-2003 ডায়াগনস্টিক কিট ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশে সার্স ভাইরাস মোকাবেলায় সফল হয়েছিল। তাই তার ভূমিকাকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।
সারাবিশ্বে যখন করোনা ভাইরাস মহামারী আকারে দেখা দিয়েছে তখন বিশ্বের সকল চিকিৎসকের উপর একটিই যেন দ্বায়িত্ব, আর সেটা হলো মহামারী নিয়ন্ত্রণে কাজ করা। হোক সেটা ভেটেরিনারিয়ান কিংবা মেডিক্যাল ডাক্তার। মহামারীর শুরু থেকেই কাজ করে যাচ্ছে ভেটেরিনারিয়ানরা। করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রায় সব সেক্টরেই কাজ করে যাচ্ছে এবং বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে সফলতাও দেখিয়েছে। তাই করোনা মহামারীতে বিশ্বে ভেটেরিনারিয়ানদের অনবদ্য অবদান যথেষ্ঠ প্রশংসার দাবীদার।
_________________________
সাবরিন জাহান
শিক্ষার্থী, ভেটেরিনারি সায়েন্স অনুষদ
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ-২২০২

