ভারতে নতুন করে করোনার ভয়াবহতাঃ কি বলছেন বিজ্ঞানীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক
করোনাভাইরাসের মহামারির দ্বিতীয় ঢেউয়ের ধাক্কায় নাকাল অবস্থা ভারতে। দিনে দিনে বাড়ছে রোগী, বাড়ছে মৃত্যু। শ্মশানে দিন-রাত জ্বলছে চিতা। হাসপাতালে শয্যার সংকট, অক্সিজেন সংকটসহ নানা সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করছে। এর মধ্যেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে ভারতে পরিবর্তিত হয়ে তৈরি হওয়া করোনাভাইরাসের নতুন ধরন (স্ট্রেইন)।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু দিল্লিতেই সোমবার সরকারি হিসাবে ৩৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে। গুরুতর কোভিড রোগীদের প্রাণরক্ষায় অপরিহার্য অক্সিজেনের ঘাটতি রয়েছে। সংকট দেখা দিয়েছে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) শয্যা ও জীবন রক্ষাকারী ওষুধের। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে ১ কোটি ৭০ লাখের মতো করোনা রোগী শনাক্ত এবং ১ লাখ ৯২ হাজার জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ১ কোটি ৩৮ লাখ ৬৭ হাজার ৯৯৭ জন।

করোনাভাইরাসের হাজার হাজার মিউটেশন প্রতিনিয়ত হচ্ছে এবং এর ফলে সৃষ্টি হচ্ছে ভাইরাসের নতুন নতুন স্ট্রেইন। ভারতে সনাক্ত হওয়া করোনাভাইরাসের নতুন ধরন ‘ট্রিপল মিউটেশন ভ্যারিয়েন্ট’ বা বেঙ্গল স্ট্রেইন। গবেষকরা বলছেন, এই স্ট্রেইন অনেক বেশি প্রাণঘাতী ও দ্রুত ছড়াচ্ছে এবং এই স্ট্রেইন আগের তুলনায় তুলনামূলক বেশি ভয়াবহ। সূত্রইন্ডিয়া টুডে

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) টেকনিক্যাল লিড অফিসার মারিয়া ভ্যান কারকোভ বলেন, করোনার ডাবল মিউটেশন ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। এটা মিউটেশন এর পাশাপাশি দ্রুত ছড়াচ্ছে এবং টিকার কার্যকারিতা কমিয়ে দিচ্ছে।

বিজ্ঞানীরা ভারতে করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট (B.1.617) শনাক্ত করেছে যার দুটি মিউটেশন E484Q ও L452R পেয়েছে। গবেষকদের আরেক দল পশ্চিমবঙ্গে করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট (B.1.618) শনাক্ত করেছে যা মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ফাঁকি দিতে পারে ফলে টিকা নাও কাজ করতে পারে। দিল্লীর জেনোমিক গবেষক বিনোদ স্কারিয়া টুইটারে লিখেছেন, করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট (B.1.618) এর মিউটেশন E484K মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ফাঁকি দিতে পারে। এর সম্ভাব্য চিকিৎসা হতে পারে প্লাজমা থেরাপি অথবা করোনা থেকে সুস্থ্য ব্যক্তির প্লাজমা কোন আক্রান্ত ব্যক্তিকে দেওয়া। সূত্রইন্ডিয়া টুডে

আরো পড়ুন- করোনার নতুন স্ট্রেইন প্রতিরোধে প্রচলিত টিকা কতটুকু কার্যকর?

ভারতের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রনালয় বলছে, কোভিড-১৯ সংক্রমণ বৃদ্ধির কারণ হিসেবে করোনার ‘ডাবল মিউটেশন ভ্যারিয়েন্ট’ এর সুত্রতা এখন নিশ্চিত নয়! এটার কারণ হতে পারে, বিয়ে, সিনেমা হল, ব্যায়ামাগার ও নির্বাচন উপলক্ষে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে মানুষের গণজমায়েত। সূত্র- আল-জাজিরা

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পরেও অনেকের দেহেই গড়ে ওঠেনি স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা। ভারতে সাম্প্রতিক একটি সমীক্ষা জানাচ্ছে, সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ের অন্যতম কারণ হল কোভিড-১৯ প্রতিরোধী অ্যান্টিবডির অনুপস্থিতি।

কাউন্সিল ফর সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ’ (সিএসআইআর)-এর মার্চ মাসের ওই সমীক্ষা জানাচ্ছে, মোট ১০,৪২৭ জনের উপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গিয়েছে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে (সেরো পজিটিভিটি) মাত্র ১০.১৪ শতাংশের দেহে। দেশের ১৭টি রাজ্য এবং ২টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে সিএসআইআর-এর কর্মীদের উপর সমীক্ষা চালিয়ে এই তথ্য মিলেছে।

সমীক্ষার এই ফল উদ্বিগ্ন করেছে চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের একাংশকে। কারণ, তাঁদের মতে ভাইরাসের বিরুদ্ধে স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে না উঠলে শুধুমাত্র টিকা আর ওষুধের সাহায্যে কোভিড-দমন খুবই কঠিন।করোনাভাইরাস প্রতিরোধী অ্যান্টিবডির ‘সক্রিয়তার মেয়াদ’ নিয়েও দুশ্চিন্তার কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, তৈরি হওয়ার ৫-৬ মাসের মধ্যেই অ্যান্টিবডিগুলি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে। ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ফের সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

“ভারতের উচ্চ জনসংখ্যা এবং ঘনবসতি মিউটেশনের জন্য এই ভাইরাসকে আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছে, “ বলছেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল মাইক্রোবায়োলজির অধ্যাপক রবি গুপ্তা। তবে, ভারতে এখন যে উঁচু মাত্রায় সংক্রমণ দেখা যাচেছ – তার পেছনে বিশাল গণ-জমায়েত এবং সেই সাথে মাস্ক-না-পরা এবং সামাজিক দূরত্ব অগ্রাহ্য করার মত আচরণও কাজ করতে পারে। সূত্রবিবিসি বাংলা

  •  
  •  
  •  
  •