করোনার নতুন স্ট্রেইন প্রতিরোধে প্রচলিত টিকা কতটুকু কার্যকর?

ডা. মো. আব্দুর রহমান
নববর্ষের প্রাক্কালে একটা খবর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভীতি ছড়িয়ে দিয়েছিল। যুক্তরাজ্যে করোনার একটি নতুন স্ট্রেইন (B.1.1.7) ভয়াবহ মাত্রায় ছড়িয়ে পড়েছে। রূপান্তরিত এই ভাইরাসের জিনোমে অন্তত ১৭টি পরিবর্তন ঘটেছে বলে বিজ্ঞানীরা বলছেন। এই নতুন স্ট্রেইনের করোনা আগের করোনাভাইরাসের চেয়ে প্রায় ৭০ শতাংশ বেশি দ্রুত ছড়ায়। ভয়ের দুটি কারণ ছিল। প্রথমত, এত দ্রুত ছড়ালে তো করোনা নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হবে। আর দ্বিতীয়ত, যে টিকার অপেক্ষায় আমরা আছি, সেটা কি নতুন স্ট্রেইনগুলোর অ্যান্টিবডি তৈরিতে সফল হবে?

দক্ষিণ আফ্রিকায় করোনার নতুন প্রজাতির আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে ততটা সক্ষম নয় অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা। সাম্প্রতিক সমীক্ষায় এমন প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে বলে দাবি করে সাময়িক ভাবে ওই টিকাকরণ স্থগিত রেখেছে সে দেশের সরকার। খবর- আনন্দবাজার পত্রিকা

দক্ষিণ আফ্রিকায় করোনার নতুন স্ট্রেইন বা প্রজাতি (B.1.351)-র সন্ধান পাওয়ার পর তাতে কোভিড টিকা কতটা কার্যকরী, সে নিয়ে সম্প্রতি একটি সমীক্ষা করা হয়েছিল। গড়ে ৩১ বছর বয়সি প্রায় ২ হাজার স্বেচ্ছাসেবকের উপর এই টিকা প্রয়োগ করা হয়। ওই সমীক্ষা রিপোর্টে দেখা গিয়েছে, আগের তুলনায় অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার কার্যক্ষমতা ‘তুলনামূলক ভাবে হ্রাস’ পেয়েছে। যদিও প্রবল ভাবে কোভিডে আক্রান্ত বা চিকি়ৎসাধীন অথবা মৃতদের উপর এই টিকার প্রয়োগের রিপোর্ট এতে শামিল করা হয়নি।

এখন পর্যন্ত, নতুন করে যুক্তরাজ্য করোনা স্ট্রেইন (B.1.1.7) ১১৪টি দেশে এবং দক্ষিণ আফ্রিকা স্ট্রেইন (B.1.351) ৬৮টি দেশে ছড়িয়েছে। যুক্তরাজ্যে ১২ হাজারের মত B.1.1.7 স্ট্রেইন এবং ৩ শত B.1.351স্ট্রেইন নিশ্চিত করেছে। সূত্র- মেডিক্যাল নিউজ টুডে

গবেষকরা বলছেন, দক্ষিণ আফ্রিকা (B.1.351), ব্রাজিল/জাপান (P.1) এ করোনার যে নতুন স্ট্রেইন বা প্রজাতির সন্ধান পাওয়া গেছে এবং অন্যান্য দেশে নতুন করে করোনার যে নতুন স্ট্রেন বা প্রজাতি সংক্রমিত হচ্ছে তা প্রতিরোধে ফাইজার ও মর্ডানার কোভিড টিকা কম কার্যকর। সূত্র-সাইন্স ডেইলি

ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালের গবেষক আলেজান্দ্রো বালাজস বলেন, করোনার নতুন স্ট্রেইনগুলোকে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, টিকার বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার স্ট্রেইন ২০-৪০গুণ রেজিস্ট্যান্স এবং ব্রাজিল/জাপান এর স্ট্রেইন ৫-৭গুণ রেজিস্ট্যান্স।

করোনাভাইরাসের হাজার হাজার মিউটেশন প্রতিনিয়ত হচ্ছে এবং এর ফলে সৃষ্টি হচ্ছে ভাইরাসের নতুন নতুন স্ট্রেইন। বিজ্ঞানীরা বলছেন, নতুন স্ট্রেনগুলো বেশি প্রাণঘাতী ও দ্রুত ছড়াচ্ছে। কোনো কোনো স্ট্রেইন তুলনামূলক বেশি ভয়াবহ। খবর- রয়টার্স

কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো এ পর্যন্ত সব ধরনের স্ট্রেইনেই একটি মিল আছে, সেটা হলো করোনাভাইরাসের রিসেপ্টার-বাইন্ডিং ডোমেইনের স্পাইক প্রোটিনের (E484K) উপস্থিতি। স্পাইক অপরিবর্তিত থেকে যায়, পরিবর্তন হয় তার ভেতরের কাঠামোয়। কোভিড-১৯–এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর স্পাইক প্রোটিন। এর সাহায্যেই ভাইরাস মূলত শ্বাসতন্ত্রের কোষের রিসেপ্টারকে পেঁচিয়ে ধরে তার ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং কোষের চালকের আসনে বসে। এরপর ওই কোষগুলোর নিজস্ব ব্যবস্থা ব্যবহার করে করোনাভাইরাস দ্রুত তার নিজের প্রোটিনের অনুলিপি তৈরি করতে থাকে। এইভাবে করোনাভাইরাস দ্রুত বংশবিস্তার করে রোগীকে কাবু করে ফেলে। শ্বাসতন্ত্রের ক্ষতি করতে থাকে। রোগীর জীবন বিপন্ন হয়।

অন্যদিকে, এর বিরুদ্ধে দেহের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা মূলত করোনাভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনের উপস্থিতি শনাক্ত করে সক্রিয় হয়। করোনাভাইরাসের টিকা গ্রহণকারী অথবা করোনা সংক্রমণের পর সুস্থ হয়ে ওঠা কোনো ব্যক্তির দেহে সৃষ্ট অ্যান্টিবডি মূলত ভাইরাসের স্পাইক প্রোটিন চিনে রাখে এবং পরে সেই স্পাইক প্রোটিন দেখলেই তাকে ধ্বংস করে। সুতরাং করোনাভাইরাসের যত স্ট্রেইনই হোক, স্পাইক প্রোটিন থাকলেই শরীরের অ্যান্টিবডি তাকে সঙ্গে সঙ্গে চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়। করোনার আশঙ্কা থাকে না।

কিন্তু কোনো মিউটেশনের ফলে হয়তো করোনার স্পাইক প্রোটিনেরও বিলুপ্তি ঘটতে পারে। তখন অ্যান্টিবডি সেই ভাইরাসকে চিনতে পারবে না এবং টিকায়ও কাজ হবে না। কিন্তু স্পাইক প্রোটিন না থাকায় একই সঙ্গে সেই নতুন স্ট্রেইনের করোনাভাইরাস শ্বাসতন্ত্রের কোনো কোষকে আক্রমণও করতে পারবে না। কারণ, এই ভাইরাসের প্রধান অস্ত্র তার স্পাইক প্রোটিন। সেটাই যদি না থাকে, তাহলে করোনা তার ভয়াবহতা হারাবে। হয়তো দ্রুত ছড়াবে, আক্রান্ত ব্যক্তি অসুস্থ বোধ করবেন, কিন্তু শ্বাসকষ্ট বা অক্সিজেনের অভাবে জীবন বিপন্ন হবে না এবং একসময় করোনাভাইরাসের সেই স্ট্রেইন বিলুপ্ত হবে।

তাই একদিকে নতুন স্ট্রেইন যেমন কিছু বাড়তি বিপদ ডেকে আনতে পারে, তেমনি আবার নতুন কোনো স্ট্রেইনে স্পাইক প্রোটিন না থাকলে সেই করোনাভাইরাস এক অর্থে নির্জীব হয়ে পড়বে।

Journal Reference:

Wilfredo F. Garcia-Beltran, Evan C. Lam, Kerri St. Denis, Adam D. Nitido, Zeidy H. Garcia, Blake M. Hauser, Jared Feldman, Maia N. Pavlovic, David J. Gregory, Mark C. Poznansky, Alex Sigal, Aaron G. Schmidt, A. John Iafrate, Vivek Naranbhai, Alejandro B. Balazs. Multiple SARS-CoV-2 variants escape neutralization by vaccine-induced humoral immunity. Cell, 2021; DOI: 10.1016/j.cell.2021.03.013

  •  
  •  
  •  
  •