অনলাইন পরীক্ষা এবং বাস্তবতা
হালিমা তুজ সাদিয়াঃ
করোনা ভাইরাস বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় বাধা, এ যেন মানব জীবনযাত্রাকে স্থবির করে ফেলেছে। এই মরণঘাতী ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে অনেক কার্যক্রম বেশ কিছুদিন যাবৎ স্থগিত থাকলেও সময়ের সাথে সাথে অধিকাংশ ক্ষেত্র-ই প্রায় স্বাভাবিকতার পথে ফিরে এসেছে। শুধু স্বাভাবিকতার স্পর্শ পায়নি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনলাইন কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষা ব্যবস্থাকে কিছুটা সচল রাখা হলেও তা আদৌ শিক্ষার্থীদের জন্য কতটুকু ফলপ্রসূ তা নিয়ে প্রশ্ন রাখছে শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকেরা অনলাইন কার্যক্রমকে সামনে রেখে নিরলস পরিশ্রম এবং ধৈর্যের মাধ্যমে শিক্ষাদান পরিচালনা করে যাচ্ছেন কিন্তু তাদের এই শ্রম এবং ত্যাগের বাস্তবিক সফলতা কোথায় তা নিয়েও প্রশ্ন শিক্ষার্থীদের। শিক্ষার্থীরা অনলাইন শিক্ষা সেবা ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারছে না। এই অনলাইন শিক্ষা সেবা প্রকৃতভাবে গ্রহণ করতে না পারার পিছনে শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষকদের দায়ী করছে না ৷ শিক্ষার্থীদের ভাষ্যমতে এই সমস্যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দেশের অবকাঠামোগত অবস্থা। এছাড়া এই প্রক্রিয়ার সাথে শিক্ষার্থীরা অভ্যস্ত না। তারা তাদের নিজেদেরকে পরিপূর্ণভাবে খাপ খাওয়াতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে প্রকৃত শিক্ষা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তারা ।
অনলাইন কার্যক্রম সফল ভাবে শুরু হলেও ক্লাসের বাস্তব চিত্রানুসারে, স্বল্পসংখ্যক শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণের ভিত্তিতে ক্লাসগুলো পরিচালিত হচ্ছে। অধিকাংশ শিক্ষার্থীরাই এই সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে যার মূলে রয়েছে বিদ্যুৎ জনিত সমস্যা, দুর্বল নেটওয়ার্ক সিস্টেম, ডিজিটাল ডিভাইস, ডাটার উচ্চ মূল্য এবং পারিবারিক জটিলতা। শিক্ষার্থীদের অনেকেই যারা প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকে তারা ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও ক্লাসে অংশগ্রহণ করতে পারে না। আবার নেটওয়ার্কের সমস্যার কারনে অনেক শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে বার বার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার বিষয়টি পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই অবস্থার সম্মুখীন হয়েও শিক্ষার্থীরা নিজেদেরকে মানিয়ে নেওয়া যথাসাধ্য চেষ্টা করছে কিন্তু তারা পেরে উঠছে না। অনলাইন ক্লাসের রেকর্ড অনুযায়ী সিলেবাসের অনেকাংশ শেষ হয়ে গেলেও অধিকাংশ শিক্ষার্থীরাই বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ থেকে। এই অবস্থায় শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের পাঠদানের আসল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হচ্ছে।
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের থমকে যাওয়া শিক্ষাজীবন, সেশন জটের শঙ্কা কমাতে অনলাইনে পরীক্ষার কথা ভাবছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। অনলাইনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্লাস কার্যক্রম কোনোরকম পরিচালিত হলেও অনলাইন পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়টি কতটুকু ফলপ্রসূ হবে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার জন্য কোনোভাবেই প্রস্তুত নয়। বাসায় থাকার ফলে শিক্ষার্থীরা ক্লাস ম্যাটেরিয়ালগুলো পঠন সহায়িকা বা পাঠ্যবই আকারে প্রিন্ট করতে পারছে না কারণ পাঠ্যবই আকারে প্রিন্ট করতে হলে পূর্বের তুলনায় বহুগুন বেশি খরচ হচ্ছে। উপায়ান্তর না দেখে শিক্ষার্থীরা মুঠোফোনের সাহায্যেই তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে এবং এই পরিস্থিতির জন্য শিক্ষার্থীদের শারীরিক জটিলতা দেখা দিচ্ছে। এমতাবস্থায় শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দেওয়ার মতো পরিস্থিতিতে নেই। তাদের রিভিউ ক্লাস দরকার, বই পড়া দরকার, হাতে কলমে শিক্ষা দরকার। শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত সময়-সুবিধা দিয়ে পরীক্ষা কার্যক্রম শুরু করা জরুরি।
বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং শিক্ষাব্যবস্থাকে গতিশীল রাখতে যেসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করছে সরকার- নিঃসন্দেহে তা সময়পোযোগী ও সমাধিক প্রশংসিত। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে- সেই লক্ষ্যমাত্রা এখনও শিক্ষার্থীরা পরিপূর্ণভাবে অর্জন করতে পারিনি। তাই সার্বিক বাস্তবতা বিবেচনায় শিক্ষা কার্যক্রমকে ফলপ্রসূ ও বেগবান করতে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। এমতাবস্থায় শিক্ষার্থীদের আর্থসামাজিক অবস্থা বিবেচনায় রাখা এবং লেভেলে প্লেইং ফিল্ড নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

