পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইফতার এক অনন্য মিলনমেলা

কৃষিবিদ শাহীন আলম:
মুসলমানদের ধর্মীয় মাস রমজান। উৎসবের মাসও রমজান। শান্তির মাস রমজান। শুধু মুসলমানদের জন্যই নয়, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে সব ধর্ম বর্ণের মানুষের আনন্দের মাসও রমজান। পরম সৌহার্দে একে ওপরের সাথে সুখ-দু:খ ভাগাভাগিরও মাসও রমজান। ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে গরীব দুখী সকলের সমৃদ্ধির মাসও রমজান। এ মাসের পরিসমাপ্তি ঈদের মহোৎসবে হলেও মুসলিম উম্মাহর প্রতিদিনের ইফতার সত্যিই এক একটি ঈদের দিনের মত। বিশেষ করে দেশের সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ইফতার মাহফিলের আয়োজনে বিভিন্ন চত্ত্বর যেন পরিণত হয় এক অন্যন্য মিলনমেলায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত পরিসংখ্যানের মাস্টার্স শিক্ষার্থী শহিদুল ইসলাম অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, সকল জেলার বেশিরভাগ ইফতার আয়োজন হয় টিএসসিতে। এছাড়াও অপরাজেয় বাংলার বটতলা, লাইব্রেরী চত্ত্বর, ডাকসু ক্যাফেটেরিয়া, কার্জন হলসহ বিভিন্ন জায়গায় বসে ইফতারের মেলা। ইফতার পার্টিতে সিনিয়র জুনিয়র সকলেই একত্রিত হয়। বৃদ্ধি পায় সৌহার্দ। ভাগাভাগি হয় সুখ-দু:খের হাজারো কথা। সুযোগ থাকে নেতৃত্ব বিকশিত করার। ঢাবির এমবিএর শিক্ষার্থী জিল্লুর রহমান। সভাপতি হিসেবে কাজ করছেন ঢাকাস্থ বিরল উপজেলা ছাত্র কল্যাণ সমিতির। এবারের ইফতার আয়োজনে ছিল তার মাসব্যাপী কর্মযজ্ঞ। পার্লামেন্টারি ক্লাবে আয়োজিত এ বিশাল মিলনমেলায় একিত্রত করার সুযোগ হয়েছিল সাংসদ, সচিব, ডাক্তার, প্রকৌশলী, কৃষিবিদসহ প্রায় পাঁচশতাধিক শিক্ষার্থীর। নেতৃত্বের দায়ভার বহন করে ইফতার পার্টি যেন মিলনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাড়িয়েছিল।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের প্রথম টার্মের হিন্দু শিক্ষার্থী প্রত্যয় কুমার সরকারের মুখে যেন সম্প্রীতির কথা। বুয়েট ক্যাম্পাসে ধর্মীয় সম্প্রীতি খুবই ভাল। যেকোনো উৎসবে সবাই সবাইকে আমন্ত্রন জানায়। উৎসব জমে উঠে অসাম্প্রদায়িক চেতনায়। কাম্পাস ক্যাফেটেরিয়ায় এবার রাজশাহী সমিতির ইফতারে আমের রেসিপি এক অন্য মাত্রা যোগ করে। শুধু তাই নয়, আমরা সকলে সকলের জন্য দোয়া করি।
ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাসটেইনেবল এগ্রিকালচারের স্নাতকোত্তর ছাত্র আশরাফুলের বক্তব্য ভিন্নরকম। সারাদিন রোজা রাখার পর বন্ধু-বান্ধবদের সাথে ইফতারের সময়টুকু হয়ে উঠে ক্লান্তিহীন ও উৎসবমুখর। ক্যাম্পাসের টিএসসি, মিনি কনফারেন্স, অডিটোরিয়াম, অনুষদীয় গ্যালারী, জব্বারের মোড়, কে.আর মার্কেট, শেষ মোড়, প্রথম গেট, বিজয় ৭১, মরণ সাগর চত্ত্বর যেন হয়ে ইফতার মেলায়।
দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের ছাত্র মমিনুল ইসলাম পড়ছেন কৃষি নিয়ে। তুলে ধরলো ইফতারের মাহাত্মগাথা। ইফতার তো শুধু খাবারই নয়, এ যেন ভালবাসা। এমন মহৎ অনুষ্ঠানে আড্ডা-গল্পে ভাগাভাগির সুযোগ হয় সুখ-দু:খের। উদাহরণ দিয়ে বলতেই হয় টিএসসির ক্যাফেটেরিয়ার প্রগতিশীল শিক্ষক ফোরাম কর্তৃক আয়োজিত ইফতার মাহফিলের। এ অনুষ্ঠানে আমি উপস্থিত হতে পেরে খুব আনন্দ পেয়েছি। মিলিত হয়েছি উপাচার্য, রিজেন্ট বোর্ডের সদস্য, অধ্যাপক, শিক্ষক, ডাক্তার, কৃষিবিদ, প্রকৌশলীসহ অনেকের সাথেই। এ এক অন্য রকম ভাললাগা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক ডা. এস.এম. হারুন-উর রশীদ ইফতার নিয়ে বলেন, মুলসমানদের ধর্মীয় সংস্কৃতি ইফতার। এটি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাঝে সেতুবন্ধন তৈরী করে। এ আয়োজনগুলো অব্যাহত থাকায় ছাত্র-ছাত্রীরা ধর্মীয় সম্প্রীতিতে আবদ্ধ হয়। ইবাদতে লিপ্ত হয়। মাদক ও সšন্ত্রাসী কর্মকান্ড থেকে দুরে থাকে। সুদৃঢ় করে শান্তি ও সম্প্রীতির ধর্ম ইসমালের কর্মকান্ড।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিং পড়ছে এখন গণিতে। মাঝে মাঝেই ইফতার করে মসজিদের তাবলীগ ভাইদের সাথে। সৌহার্দের যেন এক অন্য রকম মেলবন্ধন। এছাড়াও ক্যাম্পাসের শহীদ মিনার, মার্কেট ও দোকানে বন্ধুদের সাথে বসে জমজমাট ইফতার আয়োজন। ক্লান্তি ছেপে চলে খুঁনসুটি আর আড্ডা।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পোল্ট্রি বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক আফতাবুজ্জামান বলেন, আমাদের ক্যাম্পাসে সামাজিক সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে ভরা। বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা ইফতার পার্টি আয়োজনে পটু। ইফতার সন্ধ্যায় ক্যাম্পাসের গ্যালারী, টিএসসি, অডিটোরিয়াম, শিক্ষক ক্লাব, শহীদ মিনার প্রাঙ্গন, সবুজ মাঠ, ক্যান্টিন যেন ভরে উঠে এক অন্যরকম আমেজে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র সুমন। উত্তরবঙ্গে বাড়ি হওয়ায় বেশিরভাগ রমজানে ইফতারি হয় হলের বন্ধু, বড় ও ছোট ভাইদের সাথে। হলের ক্যান্টিন যেন সকলের মিলনমেলা। বড় থালায় খেজুর, বেগুনি, চপ, বড়া, নিমকি, জিলাপি, ছোলা, মুড়ি, বুন্দিয়া, কলা মাখিয়ে খাবার যে মজা, তা বলে বোঝানো যাবেনা। মাখানো এ ইফতার যেন ভালবাসা মাখানোর মতই।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক এ্যাডে পড়ছে টুকটুকি। লাইব্রেরী সামনে, কলাভবন, শহীদ মিনারের পাদদেশ, প্যারিস রোড পার্শ্ববর্তী আমবাগান, টিএসসির সামনে প্রায়শই সহপাঠীদের সাথে ইফতার করে। সত্যি বলতে কি, ফ্রেন্ডসদের ছাড়া চলেই না। না চলার অনেকটাই এখন জড়িয়ে ইফতার পার্টি নিয়ে। ক্যাম্পাস ছুটি হলেও চাকুরীর পড়াশোনার সুবাদে ক্যাম্পাসেই চলতে থাকে উৎসবমুখর ইফতার আয়োজন।
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিসারিজ এন্ড মেরিন সায়েন্স বিভাগের তরুণ শিক্ষক মাহাবুবুর রহমান। ক্যাম্পাসকে উপভোগ করেন জমপেশভাবে। বিশেষ করে রামাদানুল মোবারকের ইফতার মাহফিল। ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলের উৎফুল্ল উপস্থিতি যেন অসাম্প্রদায়িক চেতনারই বহি:প্রকাশ।
ইসলামের ইতিহাসের চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী দিপু। ভালবাসেন ইফতারের আয়োজন করতে। বিভিন্ন ধরনের ফল, এলাকাভিত্তিক বিশেষ খাবার ও স্পেশাল আইটেম দিয়ে ইফতারের থালা প্রস্তুত করার নেশা যেন তাকে পেয়ে বসেছে। এক কথায় বাহারি ইফতারের অন্যতম আয়োজক সে।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মেসবাহ। ক্যাম্পাসের ইফতার তাকে ভিন্নভাবে মনোযোগ আকর্ষন করে। এমনকি ছাত্র জীবনের ক্যাম্পাসে ইফতারি নিয়ে বহু আবেগঘন বক্তব্য তুলে ধরে বলেন, সবুজ ঘাসের উপরে বন্ধুদের সাথে ইফতারের মুহুর্তগুলো আজও মনের মধ্যে দাগ কেটে যায়। মনে হয় ফিরে যাই ছাত্র জীবনে। সেই আড্ডায়। খুজে ফিরি হারানো দিনগুলিকে বর্তমান সময়ের বিভিন্ন আয়োজনের মধ্য দিয়ে। বিশেষ করে ইফতার আয়োজন।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী নাভানা। বেশিরভাগ ইফতার করে মেসে। বড় আপু, বান্ধবী ও ছোটদের নিয়ে যেন এক নিখাদ ভালবাসার সংসার। একটি খেজুর, এক গ্লাস শরবত, একটি কলা দুজনে ভাগ করে খাওয়ার যে মহ্ববত তা অবর্ণনীয়। এমন সুযোগ বছরে শুধু রমজান মাসেই আসে। সত্যিই এ মাস রহমতের, ভালবাসার, সৌহার্দ ও সম্প্রীতির।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলাম শিক্ষা বিভাগের মাস্টার্স শিক্ষার্থী সুজন শ্রাবন এবার আয়োজন করে নিজ জেলা সমিতির ইফতার মাহফিল। জেলার জ্ঞানীগুনি মানুষদের সম্মিলন যেন অন্যরকম এক মেলবন্ধন ঘটায়। আসলে এটি একটি শুধু পার্টি নয়, একে অপরের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপনের হাতিয়ারও। এছাড়াও বন্ধু বান্ধবদের সাথে ক্যাম্পাসের সেন্ট্রাল অডিটোরিয়াম, ক্যান্টিন, বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল মাঠ, কলাভবন মাঠের সবুজ চত্ত্বর, বিজ্ঞান অনুষদের প্লে গ্রাউন্ড, গোল চত্ত্বরসহ বিভিন্ন জায়গায় ইফতার পার্টি হয়ে উঠে জমজমাট। রহমতের মাসে আল্লাহর রহমতও যেন একটু বেশিই অনুভূত হয়।
সাজ্জাদ ইসলাম শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। ইফতার নিয়ে অনুভূতি পেলাম নার্ভাস কন্ঠে। বলে, এবার সে ইফতারে অংশগ্রহন করে ব্যাচ, বিভাগ ও নিজ জেলার আয়োজনে। অন্যদিকে নিজ বিভাগের জুনিয়রদেরও ইফতার করায় তারা। এমনকি স্থানীয় পথশিশুদের নিয়েও আয়োজন করে ইফতার।
কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইনফরমেশন টেকনোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক গনেশ চন্দ্র সাহা বলেন, বাংলাদেশে ধর্মীয় সম্প্রীতি আগের চেয়ে অনেক ভাল। মুসলমানদের ইফতার পার্টি এ সম্প্রীতি ত্বরানিত করতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। আমি হিন্দু হলেও বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের ইফতার মাহফিলে আনন্দ সহকারে যোগদান করি। খুব মজা হয় এ রকম পার্টিতে।
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি রসায়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ইমতিয়াজ মিয়া সম্প্রতি উচ্চশিক্ষায় বৃত্তি নিয়ে নেদারল্যান্ডে পাড়ি জমাবেন। আগামী দু বছর ইফতার হবে দেশের বাহিরে। ক্যাম্পাসের এবারের ইফতার নিয়ে তাই ভিন্ন রকম অনুভূতি। দেশের ইফতার খুব মিস করব। বেশি মিস করব সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের সাথে ইফতারের আনন্দঘন মুহুর্তগুলো।
এছাড়াও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, চট্রগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্রগ্রাম ভেটেরিনারি এন্ড এনিমেল সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও পবিত্র রমজান মাসে জমে উঠে ইফতার মাহফিলের মনোমুগ্ধকর আয়োজন।

  •  
  •  
  •  
  •  

Tags: