দেশের খাদ্য নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে ফোলিয়ার ফিডিং প্রযুক্তি

সদ্য স্বাধীন দেশ জনসংখ্যা সাড়ে ৭ কোটি, জমিও প্রচুর কিন্তু তার পরেও এদশের মানুষকে না খেয়ে মরতে হয়েছে। কৃষিই যে এদেশের প্রাণ তা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উপলব্ধি করেন এবং অনেকের বিরোধিতা সত্ত্বেও কৃষিবিদদেরকে ক্লাস ওয়ানের মর্যদা প্রদান করেন। তিনি চিন্তা করেন মেধাবী ছেলে মেয়েদেরকে কৃষিতে সম্পৃক্ত করতে না পারলে এদেশের কৃষির উন্নতি করা সম্ভব হবে না। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন আজ তারই সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এসে বাস্তবে রুপ নিয়েছে। তবে কৃষিতে আজকের যে সাফল্য তা আগামীতে ধরে রাখাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কারণ এখন প্রতি বছর প্রায় ১ ভাগ হারে জমি কমছে এবং ২২ লক্ষ হারে মানুষ বাড়ছে।

আমরা যদি আজকের এই সাফল্যের বিষয়ে কিছু পিছে ফিরে তাকাই তা হলে কি দেখব? ১) দেশ স্বাধীন হবার পরে অধিকাংশ জমিতে স্থানীয় প্রজাতির ধান চাষ হতো এগুলোর ফলনশীলতা খুবই কম ছিল। ২) দেশের অনেক জমি বছরের অধিকাংশ সময়ে পানিতে তলিয়ে থাকত।৩) চাষিরা নিজের বাড়ির বীজ ব্যবহার করে ফসল উৎপাদন করত একারণে ফসলের ফলন খুব কম হতো।৪) সেচের ব্যবস্থা তেমন ছিলনা। ৫) চাষিরা রাসায়নিক সারের ব্যবহার তেমন জানত না। ৬) অধিকাংশ ফসল রোগ ও পোকামাকড়ের মাধ্যমে নষ্ট হয়ে যেত ৭) চাষাবাদ কৌশল তেমন উন্নত ছিলনা। ৮) কৃষকদের কৃষি বিষয়ে পরামর্শ দেবার সম্প্রসারণ কর্মীও তেমন ছিলনা।

আইআর-৮ জাতের ধানের সম্প্রসারণ এ দেশের কৃষিতে প্রথম বিপ্লবের সূচনা করে। খাল খননের মাধ্যমে বিলের পানি নিষ্কাষণ এবং স্লুইচ গেট নির্মানের মাধ্যমে অনেক জমি চাষাবাদের আওতায় নিয়ে আসা হয়। ফসল আবাদে চাষিদেরকে রাসায়নিক সারের ব্যবহার শিখানো হয়। নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের মাধ্যমে ফসলের ফলনশীলতা অনেক বৃদ্ধি করা হয়। সেচ ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করা হয়। উন্নতমানের বীজের ব্যবহার ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করা হয়। বালাইনাশকের ব্যবহারের মাধ্যমে চাষি তার ফসলের সুরক্ষা দেওয়া শিখানো হয়। একফসলের স্থলে ৩-৪টা ফসল ফলানোর কৌশল শিখানো হয়। এ সময়ে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির যতগুলি কৌশল আছে আমরা তার প্রায় সবগুলিই ব্যবহার করার মাধ্যমে আমাদের কৃষিকে এই অবস্থানে আনতে সক্ষম হয়েছি। সকল কিছুর বিবেচনাতে আমাদের কৃষি আজ তুঙ্গে অবস্থান করছে। একারণে আমরা ধান উৎপাদনে বিশ্বে ৪র্থ, শাকসব্জি উৎপাদনে তৃতীয়, আলু উৎপাদনে অষ্টম, আম উৎপাদনে নবম অবস্থানে রয়েছে।

আগামীর খাদ্য নিরাপত্তার জন্য পাঁচটি বিষয় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিবে। ১) আবাদি জমি কমে যাওয়া ২) মানুষ বৃদ্ধি পাওয়া এবং ৩) পানির স্তর নীচে নেমে যাওয়া ৪) জল বায়ুর পরিবর্তন এবং ৫) ক্রমাগত অধিকহারে রাসায়নিক সার ব্যবহারের মাধ্যমে উচ্চ ফলনশীল ফসল উৎপাদনের কারণে মাটির উৎপাদনশীলতা হ্রাস। ব্রি এর মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত মূখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং প্রধান জনাব ড. এস কে জামান মহোদয়ের একটি তথ্য থেকে জানা যায় ১৯৬৭ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে আমাদের দেশের মাটির মোট নাইট্রোজেনের পরিমান কমেছে ৩১%, মোট কার্বন কমেছে ১১% এবং গ্রহণযোগ্য ফসফেট কমেছে ৯%। সুতরাং পরবর্তী ১৮ বছরে এ তথ্য আরও অনেক বেশী হবে বলে মনে করি। কারণ এসময়ে উচ্চফলনশীল ফসল চাষের নিবিড়তা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। এরপরে অধিক খাদ্য উৎপাদন করতে হলে ট্রাডিশনার কৃষির পরিবর্তে প্রযুক্তির সম্প্রসারণ অতি জরুরী বলে মনে করি। আগামীর কৃষির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলাতে উন্নত বিশ্বে বহুল প্রচলিত পাতার মাধ্যমে পুষ্টি প্রদানের বিষয়টি আমাদের জন্য সহায়ক হতে পারে।

প্রথমেই দেখা যাক ফোলিয়ার ফিডিং কি?
আমারা মুখ দিয়েই আমাদের খাদ্য গ্রহণ করে থাকি কিন্তু কখনও যদি বেশী মাত্রায় অসুস্থ হয়ে যাই তবে আমাদেরকে ভেইনের মাধ্যমে পুষ্টি প্রদান করে (স্যালাইনের মাধ্যমে) সুস্থ করা হয়। গাছ সাধারণ ভাবে তার শিকড়ের মাধ্যমে তার প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করে কিন্তু যদি কোন কারণে শিকড়ের মাধ্যমে পুষ্টি উত্তোলনে অসুবিধার সন্মুখীন হয় (সাময়িক খরা, জলাবদ্ধতা, পি এইচ জনিত সমস্যা, নিম্ন তাপমাত্রা ইত্যাদি) তবে গাছকে পাতার মাধ্যমে পুুষ্টি দিয়ে বেশ ভালো ভাবে বাঁচিয়ে রাখা যায়। গাছকে পাতার মাধ্যমে খাদ্য বা পুষ্টি প্রদানের এই বিষয়টিকেই ফোলিয়ার ফিডিং/ ফেলিয়ার ফাটিলাইজেশন বা ফোলিয়ার ফাটিগেশন বলে। শুধু পাতা নয় মাটির উপরের যে কোন অংশ দিয়েই গাছ পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করতে পারে।
ফসল উৎপাদনের এই প্রযুক্তির প্রথম প্রয়োগ হয় ১৮৪৪ সালে আমেরিকাতে। তবে এটা যে বৈজ্ঞানিকভাবে সত্য পদ্ধতি তা প্রমাণ হয় ১৯৫০ সালে। আমেরিকার মিসিগান স্টেট ইউনিবারসিটির উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের ২ জন বিজ্ঞানী বিষয়টি সর্বপ্রথন সুনিদিষ্টভাবে প্রমাণ করেন যে ফসলে পুষ্টি প্রদানের ক্ষেত্রে এই ফোলিয়ার ফিডিং একটি কার্যকর পদ্ধতি। পরবর্তীতে তারা এ বিষয়ে ব্যাপক গবেষণা করেন এবং নিম্নোক্ত তথ্য উপস্থাপন করেন।
Foliar Fertilization is the most efficient way to increase yield and plant health. Tests have shown that foliar feeding can increases yields from 12% to 25% when compared to conventional fertilization.
Tests, conducted in different locations, under different environmental conditions, have reflected the following;
**When fertilizers are foliar applied, more that 90% of the fertilizer is utilized by the plant. When a similar amount is applied to the soil, only 10 percent of it is utilized.
**In the sandy loam, foliar applied fertilizers are up to 20 times more effective when compared to soil applied fertilizers.
**Foliar feeding is an effective method for correcting soil deficiencies and overcoming the soils inability to transfer nutrients to the plant under low moisture conditions

চাকুরীর সূচনালগ্ন থেকে শখের বসে গাছকে পাতার মাধ্যমে একটি গবেষণা করতে গিয়ে আমি দেখেছি যে, আমরা যদি ফসল উৎপাদনের সময় অতিরিক্ত পরিপূরক হিসাবে কিছু পুষ্টি উপাদান পাতার মাধ্যমে প্রদান করি তবে তা ফসলের ফলন অনেক বৃদ্ধি করছে। পাতার মাধ্য অতিরিক্ত পরিপূরক হিসাবে পুষ্টি প্রদান করে ধান ও গমের ক্ষেত্রে ১০-১৫% এবং সব্জীর ক্ষেত্রে ২০-৫০% এর মধ্যে ফসলের ফলন বৃদ্ধি করা সম্ভব। এখন প্রশ্ন আসতে পারে পাতার মাধ্যমে পুষ্টি প্রদান করলে কেন ফসলের ফলন বৃদ্ধি পাবে? এবিষয়ে আমার পর্যবেক্ষণ নিম্নরুপ
উচ্চ ফলনশীল বিভিন্ন ফসলের চাষাবাদের সময় আমরা আজকাল আর জমিতে সেভাবে জৈব পদার্থ প্রদান করি না। এজন্য মাটিতে অনুখাদ্যের ব্যাপকভাবে ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়। আমরা যে সকল অনুখাদ্য ব্যবহার করছি তার অধিকাংশই ভেজালে ভরা যা এস আর ডিআইএ রিপোট থেকে জানা যায়। এসকল অনুখাদ্য খুব কম পরিমানে প্রয়োজন হলেও এগুলোর গুরুত্ব ফসল উৎপাদনে খুবই বেশী। যেমন, কোন জমিতে দস্তার ঘাটতি থাকলে সে জমিতে ধান গাছ প্রতিষ্ঠিত করা যায়না, বোরণের ঘাটতি থাকলে গম এবং ভ’ট্টার দানা পরাগায়নে সমস্যা হয়। বিভিন্ন ফল জাতীয় সবজির ফলন অনেক কমে যায়।
অম্লধর্মী মাটিতে ফসফরাস মৌলটি আয়রন এবং এলুমিনিয়ামের সাথে বিক্রিয়া করে ফসফেটের কমপ্লেক্স তৈরী করে বলে গাছ সঠিকভাবে ফসফেট পায় না ফলে গাছে ফুল ফল কমে যায়।
কীটনাশকের অধিক ব্যবহার এবং জৈব সার ব্যবহার না করে কেবল রাসায়নিক রাসায়নিক সারের ব্যবহারের মাধ্যমে ফসল চাষ করতে গিয়ে আমাদের জমিতে অনুজীব এবং কেঁচোর আশংকাজনক ভাবে কমে গেছে। অনুজীবের অভাবে ব্যবহৃত ইউরিয়া পূর্ণমাত্রায় গাছের জন্য গ্রহণোপযোগী হতে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে।

জলাবদ্ধ বা সাময়িক ক্ষরার সময় ধানের জমিতে সময়মত নাইট্রোজেন না দিতে পারলে ফলন অনেক কমে যায়। আবার লবণাক্ত মাটিতে ইউরিয়েজ এনজাইমের কার্যযকারীতা কম থাকার কারণে প্রয়োগকৃত ইউরিয়া হাইড্রোলাইসি হয়ে এমোনিয়াম আয়ন তৈরী করতে অসুবিধার সন্মুখিন হয়। এছাড়া ফসফেট এবং পটাশ কম গ্রহণ করতে পারে। আবার কপার আয়রন জিঙ্ক এবং ম্যাঙ্গানিজ অনুপুষ্টি উপাদান গুলিও গাছ সহজে গ্রহণ করতে পারে না বলে ভালো ফলন পাওয়া যায় না।

ফোলিয়ার ফিডিং কৌশলের সুনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের মাধ্যমে এধরণের সমস্যা অনেকাংশে সমাধান করা যায় এবং অধিক ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হয়। পাতার মাধ্যমে তরল আকারে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান প্রয়োগ করলে তা গাছের জন্য হেল্থ ড্রিঙ্কসের (হরলিক্স, বুষ্ট, নিডো এবং কমপ্লান) মত কাজ করে থাকে, ফলে গাছ মাটির কিছু সীমাবদ্ধতাকে পাশ কাটিয়ে পুষ্টি উপাদান নিয়ে সুস্থ সবলভাবে বেড়ে উঠে এবং বেশী ফলন দেয়। উন্নত বিশ্বের অধিকাংশ দেশে বর্তমান সময়ে আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনায় ফোলিয়ার ফিডিং ব্যতীত তারা ফসল উৎপাদনের কথা চিন্তাও করতে পারে না। ্আমরা যে সকল বিদেশী ফল খাই তার ১০০% ফোলিয়ার ফিডিং কৌশল ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন করা হয়। এই প্রযুক্তি ব্যবহারে উন্নত বিশ্বের ইলেকট্রোস্ট্যাটিক বুম স্প্রেয়ার, বিমান , হেলিকপ্টার এমন কি ড্রোন পর্যন্ত ব্যবহার করা হচ্ছে।

বর্তমান সময়ে আমরা প্রধানত নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের মাধ্যমে কেবল খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে একটু বেশী চিন্তা করছি। আজ মাঠের দিকে দেখলে দেখা যায় ব্রি অনুমোদিত ৮০টি জাতের মধ্যে ১৫-২০ টি জাত মাঠ পর্যায়ে রয়েছে। আমন মৌসুমে উচ্চফলনশীল জনপ্রিয় বিআর-১১ এবং বোরো মৌসুমের উচ্চ ফলনশীল ব্রিধান-২৮ এবং ব্রিধান-২৯ এর চেয়ে বেশী ফলনশীল কোন জাত চাষি পর্যায়ে সম্প্রসার বা জনপ্রিয় করা এখনও সেভাবে সম্ভব হয়নি। ভারতের র-করংযধহ অয়েব সাইট থেকে জানা যায় যে অন্ধ প্রদেশ এবং তামিলনাড়–তে ধান গাছের উপরে অতিরিক্ত পরিপূরক খাদ্য হিসাবে মিশ্র তরল সার ব্যবহার করার কারণে ধানের ফলন ১০% বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছে । তা হলে আমরা যদি আমাদের দেশের কৃষিতে বা ধান চাষে অতিরিক্ত পরিপূরক খাদ্য হিসাবে মিশ্র তরল সার প্রয়োগের বিষয়ে সুপারিশ করার চিন্তা করি তাহলে এখনই সকল জাতের ধানের ফলন বৃদ্ধি করা সম্ভব, ফলে ফলন পার্থক্য (ণরবষফ মধঢ়) কমে আসবে । ফসল উৎপাদনে পাতার মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদনের বিষয়টি নিয়ে দেশের সকল গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণা করা উচিত বলে মনে করি। কারণ এখন আর হরাইজন্টাল এক্সপানশনের মাধ্যমে ফসলের ফলন বৃদ্ধির কোন সুযোগ নেই আমাদেরকে ভাটিক্যালি এক্সপানশনের দিকেই আগাতে হবে। এক্ষেত্রে ফোলিয়ার ফিডিং কৌশলটি হতে পারে অন্যতম সহায়ক প্রযুক্তি। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট নীতি নির্ধারক এবং গবেষকগণ ভাববেন এটা প্রত্যাশা রইল।

কৃষিবিদ মোঃ আরিফ হোসেন খান
যুগ্ম-পরিচালক (সার), সার ব্যবস্থাপনা বিভাগ,
বিএডিসি, রাজশাহী অঞ্চল, রাজশাহী।
মোবাইল নং- ০১৭১২-০৪০২৪৪
Arif.kbd_63@yahoo.com

  •  
  •  
  •  
  •