আগাম বোরো চাষে ব্যস্ত বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষকরা
মিজানুর রহমান, তানোর সংবাদদাতা:
বিগত এক মাস ধরে আমন ধান নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছে দেশের বরেন্দ্র অঞ্চল নামে পরিচিত রাজশাহীর তানোর উপজেলার প্রান্তিক কৃষকরা। আমন ধান কাটা- মাড়াইসহ সোনার ফলস ঘরে তুলতে কমব্যস্ততার মাঝে সময় পার করেছে কৃষকরা। আমন মৌসুমের ফলন ভালো হলেও দাম নিয়ে ছিলো কৃষকদের মধ্যে হতাশা।
বাজারে ধানে ন্যায্য মুল্য না পাওয়াই প্রান্তিক কৃষককে লোকসান মাথায় নিয়েই বাজার ধান বিক্রি করতে হয়েছে। কৃষকদের মধ্যে যারা স্বচ্ছল তারা এখনো গোলায় তাদের ধান রেখে দিয়েছেন দাম পাওয়ার আশায়। দামের হতাশা বুকের মধ্যে নিয়েই কৃষকরা নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে আগামী মৌসুম নিয়ে।
কনকনে শীত উপেক্ষা করে আগাম বোরো ধান লাগাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন এ অঞ্চলের প্রান্তিক চাষিরা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকা, কৃষি উপকরণ সার, তেল বাজারে পর্যাপ্ত থাকায় বোরো রোপনের জন্য আগাম মাঠে নেমে পড়েছে কৃষকরা। জেলা কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় এবার বোরো লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭০ হাজার ১৩৫ হেক্টর জমিতে।
গত বছরের ন্যায় এবারও তানোর উপজেলা জুড়ে সাড়ে ১৪ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায় । আর এতিমধ্যেই দ্রুততম সময়ে এ উপজেলায় ১ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানগাছ রোপণ করাও হয়েছে ৷
উপজেলার চাপড়া গ্রামের বর্গা চাষী কৃষক আনারুল ইসলাম জানান, তিনি অন্যের ১৫ বিঘা জমি বর্গা নিয়ে আমন চাষাবাদ করেছিলেন। সময় মত বৃষ্টি না হওয়ায় বিঘা প্রতি ফলন হয়েছে মাত্র ২০ থেকে ২৮ মণ। আর জমির মালিককে ধান দিয়ে প্রতি বিঘায় ১২ থেকে ১৮ মণ করে ধান ঘরে উঠেছে। তাও পানির দামে ( কাঁচি প্রতি মণ ৩৯০ থেকে ৪৫৫) বিক্রি করতে হয়েছে। আমন মৌসুমে তার ৩৫ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। এ ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে এবার ৭ বিঘা জমিতে বোরো ধান রোপন করেছেন বলে জানান হতাশাগ্রস্থ কৃষক আনারুল রহমান।
উপজেলার পৌর এলাকার ধানতৈড় গ্রামের আদশ কৃষক আয়েশ উদ্দীন বাবু জানান, তিনি ১১ বিঘা জমিতে আমন চাষাবাদ করেছিলেন। বাজারে ধানের দাম না থাকায় তিনি এখনো ধান বিক্রি করেননি। দাম বাড়ার আশায় তিনি ধান গোলায় রেখে দিয়েছেন। বাজারে বর্তমান সময়ে ধানের দাম যেমন তেমন দামে ধান বিক্রি করলে উৎপাদন খরচই উঠে আসবে না। তিনি আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে টাকা ধার করে বোরো রোপন রোপণ শুরু করেছেন ৷
পুরো উপজেলা সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে কৃষকেরা নতুন আগামীর সোনালী স্বপ্ন নিয়ে বোরো রোপন শুরু করেছেন। অনেক কৃষক গভীর নলকূপ থেকে সেচ নিয়ে জমি তৈরি করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। একাধিক কৃষকরা জানান আর এক সপ্তাহের মধ্যে পুরোদমে এই অঞ্চলে বোরো চাষ শুরু হয়ে যাবে।
উপজেলা সদরের পৌর এলাকার পদকপ্রাপ্ত আদশ কৃষক নূর মোহাম্মদ জানান, আগাম বোরো ধান চাষের প্রধান কারণ বর্তমানে আবহাওয়া ভালো রয়েছে। রাতে ও সকালে ঠান্ডা হলেও দিনে ভালো রোদ হওয়ায় ধানের চারা জমিতে লাগানো সঙ্গে সঙ্গে ধানের চারা থেকে শিকড় দ্রুত বৃদ্ধি হবে। এতে ধানের চারা মরে যাওয়ার ঝুঁকি কম থাকে। এছাড়া কৃষি কর্মকর্তাগণ মাঠ পর্যায় কৃষকদের বিভিন্ন পরামর্শ দেয়ায় প্রতি বছরের মতো এ বছরও ভালো ধান উৎপাদন হবে এমনটাই আশা ব্যক্ত করেন তিনি।
এনিয়ে উপজেলা কৃষি অফিসার শফিকুল ইসলাম জানান, তারমতে প্রতি বছরই ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে ধানের দাম কিছুটা কম থাকে। সে কারণে যদি এ মাস দুইটি বাদ দিয়ে কৃষকরা ধান বিক্রি করেন তাহলে ভালো দাম পেতে পারেন। এখন বোরো মৌসুম চলছে। এই ধানের ফলন ভালো হয়। তাই অনেকাংশে এই বোরো আবাদ থেকে আমনের লোকসান পুশিয়ে নিতে পারবেন কৃষকরা। বাজারে ইউরিয়া, ফসফেট, টিএসপি, পটাশসহ সকল প্রকার সার, তেলের পর্যপ্ত সরবরাহ থাকায় বোরো ধানের ভরা মৌসুমেও সংকট থাকবে না বলেও উপজেলার কৃষকদের আশস্ত করেন তিনি ৷

