গাইবান্ধায় বাদামের বাম্পার ফলনে কৃষকের মুখে হাঁসি
জিল্লুর রহমান পলাশ, গাইবান্ধা প্রতিনিধি:
গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার ব্রম্মপুত্র নদের চরাঞ্চলের পলি দো-আঁশ মাটিতে এ বছর বাদামের বাম্পার ফলন হয়েছে। আগাম জাতের চিনা বাদাম তুলতে এলাকার কৃষান-কৃষানিরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। চলতি মৌসুমে বাদামের দাম ও ফলন ভালো হওয়ায় কৃষকের মুখে হাঁসি ফুটেছে।
ফুলছড়ি উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা গেছে, ফুলছড়ি উপজেলার তিস্তা-যমুনা-ব্রক্ষপুত্র নদী বেষ্টিত চর এলাকায় ৩৫০ হেক্টর জমিতে বাদাম চাষের লক্ষমাত্রা নির্ধারন করা হয়। এরমধ্যে ৩২০ হেক্টর জমিতে চিনা বাদামসহ বিভিন্ন জাতের বাদাম চাষ করা হয়। তবে চাষ করা এসব বাদামের ফলন ভালো হওয়ায় লক্ষ মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে, বর্তমান বাজারে বাদামের দাম ভালো থাকায় বাদাম চাষী কৃষকের মুখে হাসি ফুটেছে। চরের বালুতে প্রতি হেক্টর জমিতে ধান ৩০-৩২ মণ হলেও বাদাম হচ্ছে ১৫-১৮ মণ। প্রতিমণ কাঁচা বাদাম ১৩০০ থেকে ১৫০০ টাকা পাইকারীভাবে বাজার মূল্য বিক্রি হচ্ছে।
এ বছর ফুলছড়ির উড়িয়া ইউনিয়নের কালাসোনা, চর কাবিলপুর, রতনপুর, ফজলুপুর ইউনিয়নের খাটিয়ামারি, চন্দনস্বর, কাউয়া বাঁধা, চিকিরপটল, তালতলা, এরেন্ডাবারী ইউনিয়নের বুলবুলির চর, জিগাবাড়ি, হরিচন্ডি, আলগার চর, ঘাটুয়া, ফুলছড়ি ইউনিয়নের খোলাবাড়ি, বাজে ফুলছড়ি, বেলুয়াবাড়ি, টেংগারাকান্দি, গজারিয়ার ইউনিয়নের জিয়াডাঙ্গা, কঞ্চিপাড়ার হাড়–ডাঙ্গা, রসুলপুর, সাতারকান্দির চরে বাদামের চাষ করা হয়।
এসব চরে চিনা বাদাম, বাসন্তী, সিংগা সাইস্টোর, বারী চিনাবাদাম-৫, বারী চিনাবাদাম-৬ ও স্থানীয় জাতের বিভিন্ন বাদাম রয়েছে। চরাঞ্চলের বাদামের গুনগত মান ভালো হওয়ায় বাজারে প্রচুর চাহিদা রয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকার বাদাম ব্যবসায়ীরা এখন ফুলছড়ির চর থেকে বাদাম ক্রয় করছেন।
সরেজমিনে ফুলছড়ির কয়েকটি চরে গিয়ে দেখা যায়, নদীর ভাঙা গড়ার সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকা এলাকার কৃষকরা বালুচরে দীর্ঘদিন ধরে বাদামের চাষ করে আসছে। তিস্তা-যমুনা-ব্রক্ষপুত্র নদীর বুকজুড়ে অসংখ্য ছোট-বড় চর। আর এসব বালুচরে মাইলের পর মাইল চাষ করা হয়েছে বিভিন্ন জাতের বাদাম। সাদা বালুর জমিনে সবুজ আর সবুজে ছেয়ে গেছে লতানো বাদামের গাছে।
বর্তমানে এলাকার কৃষক-কৃষানী ও কিশোর-কিশোরীরা জমি থেকে আগাম জাতের বাদাম ঘরে তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কৃষকরা তাদের জমি থেকে বাদাম তুলে ঘরে নিয়ে আসছেন। প্রতিটি লতানো বাদাম গাছের মুঠি ধরে টান দিলেই উঠে আসছে থোকা থোকা সোনালি রঙের বাদাম।
গজারিয়া ইউনিয়নের টেংরাকান্দি চরের বাদাম চাষী আয়িছ উদ্দিন ও দেলুয়াবাড়ী চরের কৃষক আবদুর রাজ্জাক জানান, এ বছর কোন রোগ বালাই না থাকায় বাদামের গাছ নষ্ট হয়নি। তাই আগাম জাতের চিনা বাদাম অনেক ভালো হয়েছে। প্রতি কেজি কাঁচা বাদাম পাইকারী দরে ৩৫ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি করছেন। এছাড়া বাদাম চাষে সময় ও খরচ দুটোই কম লাগে। শুধু আগাম জাতের চিনা বাদাম নয় অন্য জাতের বাদামের ফলনও ভালো হয়েছে।
ফুলছড়ি চরের বাদাম চাষী মাসুদ মিয়া জানান, কম খরচ, অল্প সময় ও অল্প পরিশ্রমে বাদাম হয়ে থাকে। হেক্টর প্রতি ২০ মন বাদাম পাওয়া যায়। প্রতি হেক্টর জমিতে বাদাম চাষে খরচ ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। এবার বাদামের ভালো ফলন ও ন্যার্য মূল্যে পাওয়া যাচ্ছে।
খাটিযামারী চরের আবদুর রশিদ জানান, তিনি এ বছর দুই একর জমিতে বাদামের চাষ করেছেন। তারমধ্যে ৬ বিঘা জমির আগাম জাতের চিনা বাদাম ঘরে তুলে পেয়েছেন ১৩০ মন। বর্তমানে এসব বাদাম বাজারে বিক্রি করে ভালো দাম পেয়েছেন।
চরাঞ্চলের বালুতে বাদাম চাষের বিষয়ে ফুলছড়ি সদরের সমাজকর্মী আতিকুর রহমান আতিক জানান, ফুলছড়ি উপজেলার বিভিন্ন চরাঞ্চলের নদী ভাঙ্গা মানুষের ফসলী জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে ধুধু বালুচর আর নদী নালায় পরিনত হয়। এসব চরাঞ্চলের মানুষের কৃষি ফসল হিসেবে বাদাম, চিনা কাউন, তিল ও তিসির চাষ করেন। বাদাম চাষ করে চরাঞ্চলের প্রায় ২০ হাজার কৃষক পরিবারে ফিরে এসেছে স্বচ্ছলতা। দুর হয়েছে নিত্য দিনের অভাব-অনাটন। তাদের মলিন মুখে ফুটেছে হাঁসি।
ফুলছড়ি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তাহাজুল ইসলাম বলেন, ‘ফুলছড়ির বিভিন্ন চরাঞ্চলে বাদামের চাষ করা হয়েছে। গত বছরের তুলনায় এ বছর বাদামের ফলন ভালো হয়েছে। ইতোমধ্যে আগাম জাতের চিনা বাদাম তোলা শুরু করেছেন কৃষকরা। সব মিলে ফুলছড়ি উপজেলায় এবার বাদামের বাম্পার হয়েছে’।

