ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যঃ বিশ্বদরবারে বাংলাদেশ, বর্তমান প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

মোঃ মাসুদ রানাঃ

ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) হচ্ছে কোন সামগ্রীর ব্যবহার করা বিশেষ নাম বা চিহ্ন। এই নাম বা চিহ্ন নির্দিষ্ট সামগ্রীর ভৌগোলিক অবস্থিতি বা উৎস (একটি দেশ, অঞ্চল বা শহর) অনুসারেও নির্ধারণ করা হয়। ভৌগোলিক স্বীকৃতি প্রাপ্ত সামগ্রী নির্দিষ্ট গুণগত মানদন্ড বা নির্দিষ্ট প্রস্তুতপ্রণালী অথবা বিশেষত্ব নিশ্চিত করে। ভৌগলিক স্বীকৃতি প্রাপ্ত বিভিন্ন সামগ্রী অঞ্চলটিতে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করার অধিকার ও আইনি সুরক্ষা প্রদান করে। কোন একটি দেশের নির্দিষ্ট ভূখন্ডের মাটি, পানি, আবহাওয়া ও সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা এবং সেখানকার জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি যদি কোন একটি পণ্য উৎপাদনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তাহলে সেটিকে সেই দেশের জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক মেধাসত্ব বিষয়ক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল প্রোপার্টি রাইটস অর্গানাইজেশনের (ডব্লিউআইপিও) নিয়ম অনুসরণ করে বাংলাদেশের শিল্পমন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান পেটেন্ট ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি) এই স্বীকৃতি ও সনদ প্রদান করে থাকে। কোনপণ্য জিআই স্বীকৃতি পেলে পণ্যগুলো বিশ্বব্যাপী ব্রান্ডিং করা সহজ হয়। এই পণ্যগুলোর আলাদা কদর থাকে। ২০১৩ সালে বাংলাদেশে ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য আইন হয় এবং ২০১৫ সালে আইনের বিধিমালা তৈরি হয়।

সুজলা-সুফলা, শস্য শ্যামলা চিরসবুজ বাংলাদেশের রয়েছে সুপ্রাচীন ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক হয়ে সমগ্র দেশজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শন। এই নিদর্শনগুলোর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপত্যকর্ম ও অঞ্চলবিখ্যাত বিভিন্ন পণ্যদ্রব্য। এরমধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ঢাকাই মসলিন, নারায়ণগঞ্জ ও সোনারগাঁওয়ের জামদানি, রাজশাহীর সিল্ক, বগুড়ার দই, নাটোরের কাঁচাগোল্লা, দিনাজপুরের কাটারি ভোগ চাল, রাজশাহীর ফজলি আম, কুমিল্লার রসমালাই, সিলেটের শীতলপাটি, জামালপুরের নকশিকাঁথাসহ প্রায় ৭১ টি পণ্য। এ যাবৎ পর্যন্ত সর্বমোট ৯ টি পণ্য বাংলাদেশের নিজস্ব পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। বাংলাদেশের প্রথম ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে ১৭ নভেম্বর ২০১৬ সালে জামদানি স্বীকৃতি পায়। পরবর্তীতে ৩ আগষ্ট ২০১৭ পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্ক অধিদপ্তর বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশকে বাংলাদেশী পণ্য হিসাবে বিশ্ব স্বীকৃতি অর্জনের কথা ঘোষণা করে। পর্যায়ক্রমে ২৭ জানুয়ারি ২০১৯ তারিখে খিরসাপাত আম এবং ২০১৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর ঢাকাই মসলিন এবং সর্বশেষ ২০২০ সালের ২৬ এপ্রিল রাজশাহী সিল্ক, রংপুরের শতরঞ্জি, চিনিগুঁড়া চাল, দিনাজপুরের কাটারি ভোগ এবং নেত্রকোনার বিজয়পুরের সাদামাটিকে ৯ম জিআইপণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। সেই সাথে ফজলি আম ও বাগদা চিংড়ি জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার দ্বারপ্রান্তে।

জিআই একটি পণ্যের ভৌগোলিক নির্দেশক হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ ট্রেডমার্ক যেমন নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সক্রিয় পরিচিতি দেয়, জিআই একটি দেশের নির্দিষ্ট পণ্যকে পরিচিতি প্রদান করে। জিআইপণ্যেও সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো বিশ্ববাজারে পণ্যটির ব্রান্ডিং যা সমমানের অন্য যে কোন পণ্য থেকে জিআই পণ্যকে এগিয়ে রাখে। এজন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই পণ্যগুলোর গুণগত মান নিশ্চিত করার মাধ্যমে দেশ ও বিশ্বব্যাপী ক্রেতাদের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করা। এজন্য প্রয়োজন কঠোর নজরদারি ও আইনের সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে নকল ও ভেজালপণ্য উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও বিপণন বন্ধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ।

একটি বিষয় লক্ষণীয়, কোন নির্দিষ্ট স্থানের কোন পণ্য খুব নামকরা হয়ে থাকে এবং সবাই সেই নামের উপর বিশ্বাস করেই সেইপণ্য ক্রয় করে থাকে। যেমন- বগুড়ার দই, ঢাকাই জামদানী, বিক্রমপুরের মিষ্টি। এখানে প্রতিটি পণ্যের সাথে তার স্থানের নাম যুক্ত আছে এবং এই নামটির একাধিক গুরুত্ব আছে। উদাহরণস্বরূপ বগুড়ার দই একটি বিশেষ প্রক্রিয়ায় যুগের পর যুগ তৈরি হয়ে থাকে যা অন্যদের থেকে আলাদা যার ফলে এর সুখ্যাতি আছে। আবার ধরুন ঢাকাই জামদানি একসময় শুধু ঢাকাই কারিগররা উৎপাদন করতে পারতো আর ঢাকার আবহাওয়াও এই জামদানি তৈরির অনুকূল ছিল যার ফলে যুগযুগ ধরে এই পণ্য পৃথিবী জুড়ে সুনাম ও সুখ্যাতি লাভ করেছে। তাই এই পণ্যগুলোর সাথে ভৌগোলিক সম্পর্ক ও মেধার অবদান দুই-ই প্রয়োজন হয়, যার ফলে এই মেধাসংরক্ষণের জন্য ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য তৈরির মেধাসত্ত্বের স্বীকৃতি প্রয়োজন হয়। নয়তো দেখা যাবে কেউ একই পণ্য প্রযুক্তির কল্যাণে সহজেই তৈরি করে ফেলছে কিন্তু তার গুণগত মান এক নয়। অন্যদিকে যারা মেধা ও শ্রম দিয়ে এই পণ্যগুলোকে বিখ্যাত করেছে তারাও ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। জিআইপণ্য হিসেবে নিবন্ধিত হলে একটি দেশ যেসকল সুবিধা পাবেনঃ

১. সংশ্লিষ্ট পণ্যের মালিক হবে সেই দেশ। ভৌগোলিক পরিচিতিও পাবে সেই দেশ।
২. তারা সেই পণ্যেও ব্যবসায়িক মুনাফার সম্পূর্ণ অংশের মালিক হবেন।
৩. আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এসব পণ্যের মালিকানা বা সত্ব আর কোন দেশ দাবি করতে পারবে না।
৪. বিশ্বজুড়ে পণ্যের আলাদা রেপুটেশন তৈরি হয়। বিশ্ব বাজারে উৎপাদনকারীরা পণ্যের জন্য ভালো দাম পাবেন।

ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সুরক্ষা) আইন ২০১৩ এর ২৯ ধারা অনুযায়ী, কোন ব্যক্তি ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করলে বা মিথ্যাভাবে ব্যবহার করলে ৬ মাস থেমে ৩ বছর পর্যন্ত কারাদন্ড অথবা ৫০০০০ থেকে দুই লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হতে পারেন। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য আমাদের যথেষ্ট সচেতনতা এবং উপযুক্ত আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের অভাবে নকশি কাঁথা, ফজলি আম এমনকি রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ প্রায় ৬৬ টি পণ্যের জিআই নিয়ে নিয়েছে ভারত। এজন্য প্রয়োজন সরকার কর্তৃক যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন। এ লক্ষ্যে নিম্নোক্ত সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন জরুরিঃ

১. দেশের বিশিষ্ট গবেষক, ইতিহাসবিদ ও স্বনামধন্য শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করে প্রয়োজনীয় গবেষণা কার্য পরিচালনার মাধ্যমে জিআই পণ্যগুলো চিহ্নিত করা ও তা নিবন্ধনের জন্য যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

২. জিআইপণ্য বিষয়ক তথ্য হালনাগাদ করার মাধ্যমে দেশ ও সমগ্র বিশ্বব্যাপীর নিকট তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় প্রচার ও প্রসার ঘটানো। জনসচেতনতা বাড়ানোর জন্য দেশের বিভিন্ন অঙ্গনের স্বনামধন্য ও বিখ্যাত ব্যক্তিদের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে নিযুক্ত করা যেতে পারে।

৩. জেলা, উপজেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে সমন্বয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন অঞ্চলের বিখ্যাত পণ্য নিয়ে প্রদর্শনী, প্রতিযোগিতা, মেলা, সভা ও সেমিনার আয়োজন করা যেতে পারে। যার ফলে কাক্সিক্ষত পণ্যগুলোর ব্রান্ডিং ও প্রসার ঘটানো সম্ভব।

৪. দেশের প্রত্যন্ত জনগোষ্ঠী যারা দীর্ঘদিন ধরে হস্তশিল্প, কুটির শিল্পসহ বিভিন্ন সৃজনশীল শিল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন পণ্য অত্যন্ত সুনাম ও সুখ্যাতির সাথে প্রস্তুতকরণ ও বিপণনের সাথে জড়িত তাদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নে সরকার কর্তৃক বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। যেমন- সহজশর্তে ঋণ প্রদান, উৎপাদিত পণ্য বিপণন ও বাজারজাতকরণ সুবিধা নিশ্চিতকরণ এবং বৈশ্বিক ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ।

৫. সর্বোপরি সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় যেমন- শিল্প, বাণিজ্য ও আইনমন্ত্রণালয়ের মাঝে সমন্বয়ের মাধ্যমে ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য আইন যুগোপযোগীকরণ ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিতকরণ।

বাংলাদেশের সুপ্রাচীন ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারক এই বিশেষ পণ্যগুলো বর্তমান সরকারের সময়োপযোগী পদক্ষেপের মাধ্যমে অনতিবিলম্বে ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাবে এই প্রত্যাশা আমাদের সকলের। যার ফলশ্রুতিতে বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি যেমন উজ্জ্বল হবে একই সাথে বৈশ্বিক ক্রেতাদেও আকৃষ্ট করার মাধ্যমে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের আপামর জনসাধারণের আর্থ সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটবে।

 

লেখক- মোঃ মাসুদ রানা
সহকারী অধ্যাপক
কৃষিসম্প্রসারণ শিক্ষা বিভাগ
বাংলাদেশ কৃষিবিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।

  •  
  •  
  •  
  •  
ad0.3

Tags: