আকস্মিক বন্যায় কৃষিতে ক্ষয়ক্ষতি এবং কৃষকদের করণীয়

মৌরি তানিয়া:

বাংলাদেশের সিলেট, সুনামগঞ্জ ও কুড়িগ্রামসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোয় হঠাৎ বন্যা শুরু হয়েছে এবছর

এই বছর এ নিয়ে তৃতীয় দফার বন্যার কবলে পড়েছে এসব জেলা।হঠাৎ বন্যার কবলে পড়ায়, এসব জেলায় কৃষিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কৃষক।

হাওর অঞ্চলে বোরো ধানের ক্ষতি প্রায় ১২৫ কোটি টাকাঃ
এমন একটা সময় এবার বন্যা হয়েছে যে, হাওড়ের বোরো ধান ওইসময় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কর্তনের উপযোগী ছিল না।আর যেসব কৃষকেরা এপ্রিলের শেষভাগে আক্রান্ত হয়েছেন, ডুবে যাওয়া ধান কেটে শেষ করতে না পারায় তাদের ধানও পচে নষ্ট হয়েছে।

এ পর্যন্ত হাওড়াঞ্চলে প্রায় ৭ হাজার ৮৩ হেক্টর জমির বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে এবং এতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২৫ কোটি টাকা।কেবল সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জে শতকোটি

টাকার বোরো ধান নষ্ট হয়েছে।তবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলা হলো সুনামগঞ্জ। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এ জেলায় ৫ হাজার ৫১০ হেক্টর জমির বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

দেশের হাওড়াঞ্চলে অবস্থিত জেলাগুলো হলো-সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া। ৩৭৩টি হাওড়সমৃদ্ধ জেলায় চাষযোগ্য জমির পরিমাণ কমবেশি ৯ লাখ হেক্টর। দেশের প্রধান খাদ্যশস্য চাল উৎপাদনে বোরোর অবস্থান শীর্ষে। মোট উৎপাদিত চালের প্রায় ৫৫ শতাংশ আসে বোরো ফসল থেকে। বাকিটা আসে আমন ও আউশ থেকে। হাওড়াঞ্চলে বোরোর আবাদ ও কাটা-মাড়ির সফলতা দেশে বোরো ফসল উৎপাদনের ওপর তথা মোট চাল উৎপাদনের ওপর প্রভাব ফেলে। বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায়, চালের মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।

আকস্মিক বন্যায় কুড়িগ্রামে কৃষিতে ক্ষয়ক্ষতি প্রায়১২৮ কোটি টাকাঃ

কুড়িগ্রামে সাম্প্রতিক বন্যায় ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ায় জেলার কৃষকেরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বন্যার কারণে কুড়িগ্রামে কৃষি খাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১২৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।
বন্যায় জেলার মোট ৮০ হাজার ৩৫ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং ১৫ হাজার ৮৫১ হেক্টর ফসলি জমি আংশিক বা সম্পূর্ণরূপে তলিয়ে গেছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে আউশ ধান ও পাট চাষে। এরপরই রয়েছে সবজি।
কুড়িগ্রামে বন্যার পানিতে পাটের ১৬ হাজার ৫৭৭ হেক্টর জমির মধ্যে ৯ হাজার ৫২১ হেক্টর; আউশ ধানের ৮ হাজার ৪৮০ হেক্টর জমির মধ্যে ৩ হাজার ৫৮০ হেক্টর এবং সবজির ৪ হাজার ৩৪ হেক্টর জমির মধ্যে এক হাজার ১৬১ হেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এছাড়া জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের মধ্যে রয়েছে আমন বীজতলা, পাট, আউশ ধান, তিল, সবজি, চিনাবাদাম, কলা, ভুট্টা, মরিচ, আদা, হলুদ, পেঁয়াজ, আখ ও মসুর ডাল।

বন্যার ক্ষয়ক্ষতি রোধে করণীয়ঃ

৫০ বছর আগে, বর্ষার প্রথম দিকে প্রথম আকস্মিক বন্যা হতো এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে এবং মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে। বন্যা প্রতিরোধী বাঁধের উচ্চতা মে মাসের শেষ পর্যন্ত ফসল রক্ষা করার জন্য ছিল। ১৫ বছর আগেও বন্যা প্রতিরোধী বাঁধের উচ্চতা একই ছিল, তবে সে সময়ে আমরা দেখতে পেয়েছি যে, মে মাসের শুরুতেও নদীগুলো অনেক বেশি স্ফীত হয়েছে। তারপর সরকার কৃষকদের পরামর্শ দেয় যে, তারা যেন এপ্রিলের মাঝামাঝি বোরো ফসল কাটে। গত ১০-১৫ বছরে, বৈশ্বিক উষ্ণতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় এবং বর্তমানে এপ্রিলের পরিবর্তে মার্চের শেষের দিকে ফসল তোলার জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হয়। হাওরকে কীভাবে পরিচালনা করা যায় সে সম্পর্কে একটি নতুন চিন্তাভাবনা প্রক্রিয়া শুরু করা প্রয়োজন যার মাধ্যমে আমরা ধান ও মৎস্য চাষ থেকে আমাদের সর্বোচ্চ সুবিধা পেতে পারি। আমাদের একটি জলভিত্তিক বাস্তুতন্ত্র এবং প্রকৃতিভিত্তিক উন্নয়ন কার্যকলাপের দিকে যেতে হবে।

বন্যা পরবর্তী সময়ে কৃষকদের করণীয়ঃ

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় প্রতিবছর আকস্মিক বন্যার ঘটনা ঘটছে। তাই বন্যার এই ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নিতে, বন্যা পরবর্তী সময়ে কৃষকদের উপযুক্ত পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে।

আগাম বন্যার পূর্বাভাস পাওয়া গেলে রবি মৌসুমে স্বল্প জীবনকালসম্পন্ন ফসল চাষ করতে হবে। অন্যদিকে মৌসুমি বন্যার ক্ষেত্রে খরিফ-১ ও খরিফ-২ মৌসুমের ফসল চাষ করা যাবে না, তবে বন্যার পানি নেমে গেলে সময় প্রাপ্তি সাপেক্ষে চাষ করতে হবে। এক্ষেত্রে বন্যার সময় উঁচু জমি বা ভিটাবাড়িতে ফসলের চারা তৈরি করে রাখতে হবে যা পানি সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লাগাতে হবে। কৃষিতে বন্যায় ক্ষতির প্রভাব পড়ে দীর্ঘমেয়াদি। এ কারণে কৃষক ভাইদের ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এবং বন্যার পানি নেমে যাবার সঙ্গে সঙ্গে সব ধরনের ফসলের যত্ন ও রবি ফসল চাষাবাদ কার্যক্রম যথারীতি চালিয়ে যেতে হবে। রোপা আমন ধানের আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত জমিতে, ভালো জায়গার সুস্থ গুছি থেকে কিছু অংশ তুলে নিয়ে ফাঁকা জায়গা পূরণ করে দিতে হবে। বন্যার পানি সরে যাওয়ার পর পরই চারার পাতার ৮-১০ সেন্টিমিটার (৩-৪ ইঞ্চি) আগা কেটে দিতে হবে এবং ছত্রাকনাশক স্প্রে করে দিতে হবে। চারা না পাওয়া গেলে স্থানীয় জাতের আউশ ধান (হাসিকলমি, সাইটা, গড়িয়া) এর গজানো বীজ আশ্বিনের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত ছিটিয়ে বোনা যেতে পারে। বন্যার পানি সরে যাওয়ার পর মরিচ ও ডাল জাতীয় ফসলের বীজ বোনা যেতে পারে। বন্যার পানি নেমে গেলে বিনা চাষে গিমাকলমি, লালশাক, ডাঁটা, পালং, পুঁইশাক, ধনে, সরিষা, খেসারি, মাষকালাই আবাদ করা যেতে পারে। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত শাকসবজি ও অন্যান্য ফসলি জমির রস কমানোর জন্য মাটি আলগা করে ছাই মিশিয়ে এবং সামান্য ইউরিয়া ও পটাশ সার প্রয়োগ করা যেতে পারে। এ বছর লাগানো ফলের চারার গোড়ার পানি নিষ্কাশনের জন্য নালা করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। প্রয়োজনে গোড়ায় মাটি দিয়ে সোজা করে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে দিতে হবে। বন্যার পানি নেমে যাবার সঙ্গে সঙ্গে ভাসমান কচুরিপানার ওপর লাউ, মিষ্টি কুমড়া, চাল কুমড়া ও অন্যান্য সবজির তৈরি চারা নির্ধারিত জায়গায় বসিয়ে দিতে হবে।

পরিশেষে, জাতীয় কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি তথা অব্যাহত রাখার স্বার্থে বন্যা-পরবর্তী কৃষি পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। এজন্য সরকারি বেসরকারি সংস্থা থেকে সমন্বিত পদক্ষেপ হাতে নিতে হবে। সিলেট -সুনামগন্জের মতো নিচু এলাকাতে বারবার আগাম ও আকস্মিক বন্যার ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে। এজন্য সঠিক বন্যা-পূর্বাভাসের ব্যবস্হা করা, ফসল চাষাবাদে কার্যকর সময় ব্যবস্হাপনা, নদী ও খাল-বিল খননের মাধ্যমে পানি প্রবাহ সচল রাখা এখন সময়ের দাবি

  •  
  •  
  •  
  •  
ad0.3