বঙ্গবন্ধুর “সোনার বাংলা” বিনির্মাণে বাকৃবির অবদান অনস্বীকার্য

BAU

রোহান ইসলাম, নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজীবন বাংলার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির জন্য লড়াই করে গেছেন। তাঁর মূল শক্তি ছিল এ দেশের মানুষের ভালোবাসা। একইসঙ্গে তিনি বাংলার মাটি, জল, সবুজ প্রকৃতি, পরিবেশকেও গভীরভাবে হৃদয়ে ধারণ করতেন।

তিনি উপলব্ধি করেছিলেন বাংলার মানুষকে বাঁচাতে হলে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের বিকল্প নেই। ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, চেয়েছিলেন কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি সুদৃঢ় হবে।

ত্রিশ লাখ শহীদের জীবনের বিনিময়ে প্রাপ্ত এ বাংলাদেশকে সোনালি ফসলে ভরপুর এক “সোনার বাংলা” রুপে দেখতে চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। সে কারণেই স্বাধীনতার পর তিনি ডাক দিয়েছিলেন সবুজ বিপ্লবের। বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্নের “সোনার বাংলা” বিনির্মাণে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান অনস্বীকার্য।

প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে দেশের কৃষি উন্নয়নের গুরুদায়িত্ব বহনে সক্ষম তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ কৃষিবিদ, কৃষিবিজ্ঞানী তৈরি এবং কৃষি গবেষণার যথাযথ প্রচার ও প্রসারে বিশেষ অবদান রেখে চলেছে প্রতিষ্ঠানটি। আজ (১৮ আগস্ট) বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ৬১ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী।

১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে অদ্যাবধি এই বিশ্ববিদ্যালয় ২৫ সহস্রাধিক অ্যালামনি এবং হাজার হাজার রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েটের জন্ম দিয়েছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষ কৃষিবিদগণ ছড়িয়ে পড়েছেন বহুমুখী কমর্কাণ্ডে। প্রত্যেকটি কাজে তারা দক্ষতার পরিচয় দিয়ে চলেছেন।

ফসল উৎপাদন থেকে শুরু করে মৎস্য উৎপাদন, পশুসম্পদ উন্নয়ন, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, এমনকি কৃষি অথর্নীতিতে পলিসি ও পরিকল্পনায় অবদান রেখে চলেছেন তারা। অবদান রাখছেন প্রশাসনে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, কূটনীতি, শিক্ষকতা পেশাসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি সেক্টরে।

সগৌরবে কাজ করছেন আন্তর্জাতিক ও দেশের বিভিন্ন সংস্থায়। কৃষি ব্যাংকগুলোতে অগ্রাধিকারসহ দেশের সরকারি ও বেসরকারি সব ব্যাংকে চাকরি করছেন তারা। এছাড়া স্থানীয়, আঞ্চলিক ও জাতীয় রাজনীতিতেও রেখে চলেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। সার্বিকভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখার সুবাদে কৃষিবিদরা এ দেশে আজ এক মর্যাদাবান পেশাজীবী হিসেবে স্বীকৃত।

১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমাদের গ্রামের দিকে নজর দিতে হবে। কেননা, গ্রামই কৃষি প্রধান বাংলাদেশের উৎপাদনের মূল কেন্দ্র। গ্রামের উন্নয়ন ও কৃষকের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারলেই সোনার বাংলা বাস্তবায়িত হবে।’

বাংলাদেশে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (১৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৩)

বাংলাদেশে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (১৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৩)

খাদ্যের বহুমুখিতার প্রতি গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘খাদ্য বলতে শুধু ধান, চাল, গম ও আটা, ময়দা আর ভুট্টাকে বোঝায় না; বরং মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, শাকসবজি, ফলমূল এসবকেও বোঝায়।’

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন উৎসবে সবুজ বিপ্লব সফল করতে কৃষি গ্র্যাজুয়েটদের আহ্বান করে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আপনারা যারা কৃষি শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছেন। আপনাদের গ্রামে গিয়ে কৃষকের সঙ্গে মিশে যেতে হবে, মনোযোগ দিতে হবে তাদের চাহিদা আর কর্মের ওপর, তবেই তারা সাহসী হবে, আগ্রহী হবে, উন্নতি করবে। ফলাবে সোনার ফসল খেত ভরে। গ্রাম উন্নত হলে দেশ উন্নত হবে। কৃষককে বাঁচাতে হবে, উৎপাদন বাড়াতে হবে। তা না-হলে বাংলাদেশেকে বাঁচতে পারব না।’

বঙ্গবন্ধু যে প্রায়োগিক কৃষির নির্দেশনা সেদিন দিয়ে গেছেন সেই নীতি মেনেই বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সবসময় শিক্ষা ও গবেষণার কার্যক্রম চালিয়ে গেছে। কৃষকেরা বুঝতে সক্ষম হবে এবং সহজেই গ্রহণ করবে এমন গবেষণাকে প্রাধান্য দিয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়। শুধু উদ্ভাবন নয়, উদ্ভাবিত জ্ঞান ও প্রযুক্তি কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ারও কাজ করেছে বাকৃবি।

কৃষিতে ধারাবাহিক উন্নতির ফলে চাল উৎপাদনে কয়েক বছরের সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ইন্দোনেশিয়াকে পেছনে ফেলে বিশ্বের তৃতীয় শীর্ষ তিনের মধ্যে উঠে আসছে বাংলাদেশ। গবাদিপশু পালনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে দ্বাদশ অবস্থানে রয়েছে। সবজি ও মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে তৃতীয়। পাট উৎপাদনে বিশ্বে ভারতের অবস্থান শীর্ষে এবং বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় হলেও রপ্তানিতে বিশ্বে প্রথম।

ধান ও আলু উৎপাদনে যথাক্রমে চতুর্থ ও সপ্তম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। ছাগল উৎপাদনেও বিশ্বে আয়তনের দিক থেকে অনেক পেছনে থাকা বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ, আমে সপ্তম এবং ফলে দশম।

এছাড়া বিশ্বে যে পরিমাণ ইলিশ উৎপাদন হয়, তার ৮৬ শতাংশই হয় আমাদের দেশে। চা উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান একধাপ এগিয়ে গত বছর নবম স্থানে উন্নীত হয়েছে। বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও দুর্যোগ সহিষ্ণু শস্যের জাত উদ্ভাবনেও শীর্ষে বাংলাদেশের নাম।

এসব সাফল্যের পেছনে রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সহ সকল কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিবিদদের মেধা এবং বাংলার সকল কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রম। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। বঙ্গবন্ধু যে ক্ষুধামুক্ত সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখতেন তা আজ অনেকাংশেই পূর্ণ হয়েছে। এই স্বপ্ন পূরণে অগ্রদূত হিসেবে কাজ করেছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি)। তাইতো বলা হয়, ‘বাকৃবির অবদান, ক্ষুধা মন্দার অবসান’।

  •  
  •  
  •  
  •  
ad0.3

Tags: ,