আর হারাবে না গাং মাগুর

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি:
আবহমানকাল থেকে দেশের নদ-নদী, খাল-বিল, হাওর-বাওড়, দীঘি ও প্লাবন ভূমিতে প্রাকৃতিকভাবেই প্রচুর পরিমাণেই গাং মাগুর মাছের দেখা মিলতো। কিন্তু সময়ের ঘূর্ণায়মান স্রোতে বিরূপ প্রকৃতি ও মানুষের অপরিণাম দর্শিতার কারণে এ মাছের অস্তিত্ব প্রায় বিপন্ন। প্রায় বিলুপ্তির পথে সুস্বাদু দেশি প্রজাতির এ গাং মাগুর। বাজারে পুষ্টিকর এ মাছের এখন দেখা মেলাই ভার। উত্তরবঙ্গ বা চলন বিল এলাকায় এবং নেত্রকোণার নদ-নদীতে এ মাছের দেখা মিললেও সংখ্যায় খুবই কম। কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উদ্ভাবন ছাড়া অনেকটাই দুষ্প্রাপ্য এ মাছ টিকিয়ে রাখা। গাং মাগুর মাছের পোনা উদ্ভাবনে কৃত্রিম প্রজননে সফলতা আসায় এ সুস্বাদু মাছের আর হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই।

পুষ্টির উৎস দেশি প্রজাতির এ গাং মাগুরের পোনা উদ্ভাবনে কৃত্রিম প্রজননে সফলতা পেয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। প্রায় এক বছর নিরলস গবেষণার মাধ্যমে তারা কৃত্রিম প্রজননে সফলতা পেয়েছেন। সুদূর নাইজেরিয়া থেকে আগত মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদে গবেষণারত পিএইচডি ছাত্র ইব্রাহীম শেহু জেগা-এর গবেষণা থেকে এ ফলাফল অর্জিত হয়েছে।

ফিসারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের প্রফেসর ড. মোঃ ইদ্রিস মিয়া এবং একোয়াকালচার বিভাগের প্রফেসর ড. মুহাম্মদ মাহফুজুল হকের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এ গবেষণার মূল উদ্দেশ্য ছিল সুস্বাদু গাং মাগুর মাছকে বিলুপ্তাবস্থা থেকে ফিরিয়ে এনে চাষ প্রক্রিয়ার সাথে অন্তর্ভুক্ত করা। এ গবেষণায় উপদেষ্টা হিসেবে বিভিন্ন পরামর্শ দিচ্ছেন বিশিষ্ট মাৎস্যবিজ্ঞানী ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মোঃ আনোয়ারুল ইসলাম। গবেষণার কারিগরি সহযোগিতায় যুক্ত আছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিসারিজ ফিল্ড ল্যাবরেটরী কমপ্লেক্সের টেকনিশিয়ান মোঃ আজাদুল ইসলাম।

গবেষকরা জানান, সুস্বাদু এ মাছটি স্বাদু বা মিঠা পানিতে বাস করে। উত্তরবঙ্গে গাং মাগুরকে গাগড় মাছও বলা হয়ে থাকে। এ মাছটি দেশি মাগুরের আকৃতির সঙ্গে স্বাদৃশ্য নয়। তামাটে রঙের এ মাছের পিঠের অংশ দেখতে অনেকটাই আইড় মাছের মতো।পেটের তলদেশ হলুদাভ, সাদাটে। আর মুখের অংশ একটু বড়। মুখের দুপাশে মোট ৪ জোড়া পারপর্শী থাকে যার এক জোড়া দেশের অর্ধেকাংশের চেয়ে বড় হয়ে থাকে। জলাশয়ের তলদেশে কাদায় গর্ত করে থাকে। এ মাছ দলবদ্ধ হয়ে থাকতে পছন্দ করে। বর্ষার পানি কমে গেল গর্ত থেকেই এদের আহরণ করা যায়। স্বাদু পানির গাং মাগুর বা গাগড় মাছ আকারে এক থেকে দুই কেজি হয়ে থাকে। বর্ষাকালে এ মাছ প্রজনন করে থাকে। গাং মগুরের বৈজ্ঞানিক নাম Hemibagrus menoda (Hamilton, ১৮২২)। আঞ্চলিকভাবে মাছটি গাগর নামে পরিচিত।

Gang_Magur_Feature_Pic-2

ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর দি কনজারভেশন অফ ন্যাচার (আইইউসিএন, IUCN) কর্তৃক ২০০০ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীন জলাশয়ে প্রায় ২৬০ প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়। এই প্রজাতি গুলোর মধ্যে ১২টি মারাত্মক বিপন্ন, ২৮টি বিপন্ন এবং ১৪ টি সংকটাপন্ন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। গাং মাগুর সঙ্কটাপন্ন মাছগুলোর মধ্যে অন্যতম।

গবেষকদল জানান, এ গবেষণার জন্য ওই সময় নেত্রকোণা অঞ্চল থেকে গাং মাগুর মাছ সংগ্রহ করা হয়। এরপর গবেষণাগারের পরিবেশ এবং পুকুরে খাপ খাওয়ানোর পর উন্নতমানের বিভিন্ন খাবার দিয়ে শুরু হয় নিবিড় পরিচর্যা। গত বছর অনেক খোঁজাখুজির পর নেত্রকোনার জেলার ঝানঝাইল এলাকা বিধৌত কংশ নদী থেকে ৭০ টি পুরুষ ও স্ত্রী মাছ সংগ্রহ করা হয়। তারপর এ মাছগুলোকে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়স্থ ফিসারিজ ফিল্ড ল্যাবরেটরী কমপ্লেক্সের পুকুরে ডমেস্টিকেশন করা হয়। ডমেস্টিকেশন হলো প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে মাছকে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে স্থানান্তরের পর নতুন পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানোর প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ায় উপযুক্ত বাসস্থান তৈরী করা, উপযুক্ত খাদ্য নির্বাচন, খাদ্য প্রয়োগ, ও অন্যান্য পরিচর্যার মাধ্যমে ৬ মাস পর স্ত্রী ও পুরুষ মাছের দেহে যথাক্রমে ডিম ও শুক্রাণু উৎপন্ন হয়। তারপর কৃত্রিম প্রজনন প্রক্রিয়ায় হরমোনের বিভিন্ন ডোজ প্রয়োগ করে মাছকে প্রনোদিত করে পোনা উৎপাদনে সফলতা আসে।

প্রথম সফল ট্রায়ালে একটি স্ত্রী মাছ থেকে প্রায় ৪০ হাজার পোনা পাওয়া গেছে যাদের বয়স প্রায় দুই সপ্তাহ, এবং এ পর্যায়ে বেঁচে থাকার হার প্রায় ৭০%। রেনু পোনাগুলোর সঠিক পরিচর্যা পদ্ধতি উদ্ভাবনের পাশাপাশি চাষ-পদ্ধতি উদ্ভাবনের গবেষণা কাজ চলমান রয়েছে। আশা করা যায়, আগামী ২০১৭ সালের মধ্য গাং মাগুর মাছের পোনা উৎপাদন ও চাষ-পদ্ধতির পূর্ণাঙ্গ প্যাকেজ চাষীদের দোরগোরায় পৌঁছানো সম্ভব হবে।

গবেষণায় সংশ্লিষ্টরা মনে করেন কৃত্রিম প্রজননে এ সফলতার কারণে গাং মাগুর মাছটি বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাবে এবং আধুনিক মৎস্য চাষের সাথে যুক্ত হবে। ফলে মাছটি ভোক্তাদের নিকট সহজলভ্য হবে, এবং আমিষের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

নাইজেরিয়াতে আফ্রিকান মাগুর চাষের প্রচলন অত্যন্ত বেশী। ইব্রাহীম শেহু বলেন, পোনা উৎপাদন ও চাষ-পদ্ধতির পূর্ণাঙ্গ প্যাকেজ তৈরীর হলে বাংলাদেশী গাং মাগুর আফ্রিকান মৎস্য চাষীদের নিকট সমাদৃত হবে।

  •  
  •  
  •  
  •  

Tags: