আধা নিবিড় পদ্ধতিতে বাগদা চাষে ৩০ গুণ বেশি উৎপাদন (ভিডিও)

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি:
সাতক্ষীরার শ্যামনগরে পরীক্ষামূলকভাবে চলতি বছর আধা-নিবিড় (সেমি ইনটেনসিভ) পদ্ধতিতে বাগদা চিংড়ি চাষ করে ব্যাপক সফলতা লাভ করেছেন চিংড়ি চাষীরা। সাধারণ পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষ করে যে উৎপাদন হয়, তার চেয়ে প্রায় ৩০ গুণ বেশি চিংড়ি উৎপাদন হয়েছে ঐ পদ্ধতিতে। সাধারণ চাষ পদ্ধতিতে বছরে যেখানে মাত্র ৩০০ কেজি চিংড়ি উৎপাদন হতো, সেখানে আধা-নিবিড় চিংড়ি চাষ পদ্ধতিতে হেক্টরপ্রতি প্রায় ১০ হাজার কেজি চিংড়ি উৎপাদন হচ্ছে। ফলে এলাকার বাগদা চিংড়ি চাষীরা অল্প জমিতে অধিক উৎপাদনের আশায় আধা-নিবিড় পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন।

সরেজমিন দেখা গেছে, থাইল্যান্ড থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার নওয়াবেকী এলাকায় ৩০০ বিঘা জমি লিজ নিয়ে আধা-নিবিড় পদ্ধতিতে ৯ মাস আগে বাগদা চিংড়ি চাষ শুরু করেন রেডিয়েন্ট শ্রীম্প কালচারের মালিক সফিকুর রহমান চৌধুরী। তার বাড়ি কুমিল্লায়। তার মালিকানাধীন এই চিংড়ি খামারে প্রতিদিন প্রায় আড়াই হাজার কেজি বাগদা চিংড়ি উৎপাদন হচ্ছে। যার পাইকারী বাজার মূল্য ২৫ লক্ষাধিক টাকা। এই পদ্ধতিতে একরপ্রতি (তিন বিঘা) বছরে প্রায় ১৮ থেকে ২০ লাখ টাকা খরচ হবে। সেখানে উৎপাদন হবে প্রায় ৫০ লাখ টাকা মূল্যের চিংড়ি। চিংড়ি চাষী সফিকুর রহমান চৌধুরীর দেখাদেখি এলাকায় একাধিক চিংড়ি চাষী এখন আধা-নিবিড় পদ্ধতিতে বাগদা চিংড়ি চাষ শুরু করেছেন।

রেডিয়েন্ট শ্রীম্প কালচারের মালিক সফিকুর রহমান চৌধুরী জানান, ১৪ বছর আগে তিনি শ্যামনগরের নওয়াবেকী বাজার এলাকায় একটি উন্নত প্রযুক্তির বাগদা চিংড়ি পোনার হ্যাচারী স্থাপন করেন। পিসিআর ল্যাব টেস্টের মাধ্যমে পোনা উৎপাদন করায় তার পোনার চাহিদাও বেশ। উন্নতমানের এই বাগদা পোনা দিয়ে তিনি গত বছর নভেম্বর মাসে নওয়াবেকী বাজার এলাকায় ৩০০ বিঘা জমি লিজ নিয়ে সেখানে ৬০টি পুকুর খনন করেন। প্রতিটি পুকুরের আয়তন এক একর।

সম্প্রতি তার ঐ চিংড়ি খামারে বাগদা চিংড়ি উত্পাদন শুরু হয়েছে। প্রতিটি পুকুর (এক একর আয়তনের) থেকে ২৩শ’ থেকে ২৫শ’ কেজি চিংড়ি উত্পাদন হচ্ছে। যার বাজার মূল্য প্রায় ২৫ লাখ টাকা। তিনি আরো জানান, প্রতিটি পুকুরে বছরে ২ বার মাছ ধরা যাবে। অর্থাৎ প্রতিটি পুকুর থেকে বছরে প্রায় ৫০ লাখ টাকা মূল্যের বাগদা চিংড়ি উৎপাদন হবে। আর প্রতিটি পুকুরে খরচ হবে ১৮ থেকে ২০ লাখ টাকা। অল্প জমিতে অধিক মাছ উত্পাদনের একটি অন্যতম প্রযুক্তি এটি।

সাতক্ষীরা জেলা মত্স্য কর্মকর্তা মো: আব্দুল অদুদ বলেন, অল্প জমিতে অধিক মুনাফা লাভের জন্য এই প্রযুক্তির কোন বিকল্প নেই। ইতিমধ্যে আধা-নিবিড় পদ্ধতিকে জনপ্রিয় করতে মৎস্য বিভাগও কাজ শুরু করছে। নওয়াবেকী শ্রীম্প কালচারের দেখাদেখি এলাকার অনেক চিংড়ি চাষি এই পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষ করতে আগ্রহী হয়েছেন। আধা-নিবিড় পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষে অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। একটি খামারে দুই শতাধিক মানুষের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়। ফলে এই পদ্ধতি ছড়িয়ে পড়লে দারিদ্র্য নিরসনে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে।

তিনি আরো বলেন, সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাব মতে, এই জেলায় প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে বাগদা চিংড়ি চাষ হয়। এ বছর ২২ হাজার টন চিংড়ি উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সাধারণ চাষ পদ্ধতিতে হেক্টরপ্রতি বছরে গড়ে ৩০০ কেজি চিংড়ি উত্পাদন হয়ে থাকে। কিন্তু আধা-নিবিড় পদ্ধতি ব্যবহার করে হেক্টরপ্রতি বছরে (দুই চক্রে) প্রায় ১০ হাজার কেজি চিংড়ি উত্পাদন করা সম্ভব হবে। এই চাষ পদ্ধতিতে বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। বিদ্যুৎ যেখানে নেই সেখানে ইঞ্জিন চালিত মেশিনের সাহায্যে চাষ করা সম্ভব। চাষী পর্যায়ে ক্ষুদ্র ঋণের ব্যবস্থা এবং বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা গেলে এ পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষীরা ব্যাপক লাভবান হবে।

  •  
  •  
  •  
  •  

Tags: