পটকা মাছ সায়ানাইডের চেয়ে দশ গুণ বিষাক্ত!
আহমেদ হারুন-আল-রশীদ:
মাছে ভাতে বাঙালী আমরা,তাই মাছেই আমাদের পুষ্টি, আবার মাছেই জীবন যাপন। কিন্তু কোন কোন মাছ আমাদের জন্য অভিশাপ ডেকে আনে। পটকা তেমনই এক প্রজাতির মাছ,যা খেতে সরকারী ভাবেই নিরুৎসাহিত করা হয়। যদিও এটা খা্ওয়া বন্ধে বা পরিবহন বা বিক্রি অথবা বাজারজাতকরণে কোন আইন নেই দেশে। এর বিষাক্ততা সম্পর্কে অজ্ঞ অনেক মানুষ তাই একে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে প্রায়শই বিপদের সম্মুখীন হচ্ছেন আমাদের স্বল্প আয়ের মানুষেরা। এই রচনার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে জনগণকে পটকা মাছের বিষয়ে সচেতন করা যেন এ মাছকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে আর কেউ মৃত্যুকে আলিঙ্গন না করে।
পটকা মাছ:
পটকা মাছ বাংলাদেশের নদীতে সচরাচর পাওয়া যায়। এর সামুদ্রিক জ্ঞাতির নাম বেলুন মাছ।এর দেহ প্রায় গোলাকার, মাথা চওড়া, দেহখণ্ডও চওড়া তবে লেজের ঠিক পূর্বে হঠাৎ সরু হয়ে গেছে। উপরিতল থেকে সামান্য নিচে মুখ, উভয় মাড়ীতে দুটি ছেদন দন্ত রয়েছে। এই ৪টি দাদেঁর কারণেই এর বৈজ্ঞানিক নামে “টেট্রাডন” শব্দটি জুড়ে দেয়া হয়েছে। বঙ্গোপসাগরের কাছে বিভিন্ন নদী মোহনায় পটকা মাছ খুব বেশী পাওয়া যায়। তবে বাংলাদেশের নদীতে কম হলেও এ মাছটি সচরাচর লভ্য। বাংলাদেশের কোন কোন অঞ্চলে টেপা মাছ নামে পরিচিত। পৃথিবীতে এর প্রায় ১৯টি গণ ও ১৩০টির মতো প্রজাতি রয়েছে। এদের মধ্যে মাত্র ১৪ প্রজাতির পটকাই শুধু স্বাদুপানিতে বাস করে। বাংলাদেশে পটকা মাছের ১৩টি প্রজাতি রয়েছে যার দুটি স্বাদুপানির এবং বাকিগুলো সামুদ্রিক।
এই মাছটির দেহ প্রায় গোলাকার। এদের চোয়ালে প্রজাতিভেদে ছোট-বড় দৃশ্যমান দাঁত থাকে। বুকের হাড় অনুপস্থিত, ফলে এরা সহজেই এদের পেট ফুলিয়ে বড় করতে পারে। পটকা মাছ সাধারণত চোয়ালের দাঁত বা ফেরিঞ্জিয়াল দাঁতের ঘর্ষণ দ্বারা অথবা পটকার (বায়ুথলি) কম্পনের দ্বারা এক প্রকার শব্দ তৈরি করে। কয়েক প্রজাতির পটকা পানি গ্রহণ করে তাদের পাকস্থলী অনেক বড় করার ক্ষমতা রাখে এবং সাধারণত ভয় পেলে শত্রুকে ভয় দেখাতে তারা এই কৌশল অবলম্বন করে। আবার এদেরকে পানি থেকে তুলে বাতাসে নিয়ে আসলেও এভাবে তারা পেট ফোলায়, তবে সেক্ষেত্রে বাতাস গ্রহণ করে এরূপ করে থাকে।
আমরা আহরহ যে পটকা মাছ দেখতে পাই তা হচ্ছে স্বাদুপানির পটকা, এরা সাধারণত মোটামুটিভাবে গোলাকৃতির, দেহে কোন আঁইশ নেই। এদের দেহে প্রচুর পরিমাণে তেল থাকে, তবে পেটের দিকে তেলের পরিমাণ বেশি; এজন্যই এটি খেতে অতি সুস্বাদু। আর এই অতি সুস্বাদুতার জন্যই কেউ কেউ একে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে।
পটকা মাছের বিষক্রিয়া:
পটকা মাছে যে বিষটি পাওয়া যায় তার নাম টেট্রাডোটঙিন। এটি এক প্রকার নিউরোটঙিন যা সংক্ষেপে টিটিএঙ (TTX) নামে পরিচিত। টেট্রাডোটঙিন নামটি টেট্রাওডোনটিফরমিস বর্গের নাম থেকে উদ্ভূত। এই বিষটি কয়েক ধরনের ভিব্রিও (Vibrio) ও সিউডোমোনাস (Pseudomonas) গণের কিছু সিমবায়োটিক ব্যাকটেরিয়ার প্রজাতি দ্বারা তৈরি হয় যা এসব মাছের দেহে বসবাস করে, অথবা খাদ্যের মাধ্যমে তাদের দেহে প্রবেশ করে। এটি একটি মারাত্মক বিষ যা পটাশিয়াম সায়ানাইড হতে প্রায় দশ গুণ বিষাক্ত।
এ বিষে হয়তো মানুষ হাজার হাজার বছর আগেও মৃত্যুবরণ করেছে, কিন্তু এর বিষক্রিয়ার প্রথম লিখিত রেকর্ড পাওয়া যায় কেপ্টেন জেমস ক্রুকের উল্লিখিত ১৭৭৪ সনে তার জাহাজের এক নাবিকের বিষে আক্রান্তের ঘটনা থেকে। সর্বপ্রথম ১৯০৯ সনে একজন জাপানি বিজ্ঞানী একে পৃথক করেন। খাদ্যের সঙ্গে গ্রহণকৃত মাত্র ২৫ মিলিগ্রাম বিষের ৭৫ কেজি ওজনের একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষকে সহজেই মৃত্যুর দুয়ারে নিয়ে যেতে পারে, কিন্তু ইনজেকশন হিসেবে প্রয়োগ করলে মাত্র আধা মিলিগ্রাম বিষই একই ফল প্রদান করে।
বর্তমানে এই বিষকে ব্যথানাশক হিসেবে ব্যবহারের বৈজ্ঞানিক গবেষণা চলছে। পটকার দেহে এই বিষ সব থেকে বেশি জমা হয় যকৃত, ডিম্বাশয়, ত্বক, নাড়িভুঁড়ি ও পেটে। তাই এসব বিষাক্ত অংশ বাদ দিয়ে বাকি অংশের মাংস খেলে বিষক্রিয়া কম হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, এ সত্ত্বেও প্রকৃতি হতে আহরিত এই মাছ গ্রহণ সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়। অনেক সময় দেখা যায় যে, এই মাছ একই পরিবারের সবাই গ্রহণ করলেও অনেকেই মৃত্যুবরণ করেছে, কিন্তু কেউ কেউ হয়তো খুব কম পরিমাণ মাছ গ্রহণের ফলে সৌভাগ্যবশত বেঁচে গিয়েছে, কিন্তু দেহ বেশ সময়ের জন্য অবশ হয়ে গিয়েছে। আবার শিশুরা এই বিষের প্রতি বেশি নাজুক। এই বিষে আক্রমণ হলে রোগীদের অবশ্যই অতি দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে, কারণ সময়মতো চিকিৎসা পেলে রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হতে পারে।
এই বিষের কার্যক্রম পদ্ধতি সংক্ষেপে বলতে গেলে- এই বিষ দেহকে অবশ করে ফেলে, ফুসফুস ও হৃৎপিণ্ডের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় যায় ফলাফল মৃত্যু। এই বিষ সাধারণত বুকের ডায়াফ্রাম-এর পেরালাইসিস ঘটায় যার ফলে শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে মানুষ মৃত্যুবরণ করে। প্রাণঘাতী অপেক্ষা কম ডোজের টেট্রোডোটঙিনে একজন মানুষ প্রায় ৭ দিন ধরে মরণাপন্ন অবস্থায় থাকতে পারে যদিও সে সময় তার বোধশক্তি ঠিকই থাকে। বিভিন্ন লক্ষণ ও সর্বশেষ গৃহীত খাদ্যের ইতিহাস হতে মানুষ এই বিষে আক্রান্ত হয়েছে কি না তা সহজেই নির্ণয় করা যায়। সাধারণত এই বিষ খাদ্যের সঙ্গে গ্রহণের ৩০ মিনিটের মধ্যেই লক্ষণ প্রকাশ শুরু হয়, কিন্তু বিষের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে ক্ষেত্র বিশেষে তা ৪ ঘণ্টা পর্যন্ত দেরি হতে পারে।
সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন সময়ে পটকা মাছের বিষক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রচারমূলক কার্যক্রম চালিত হয়েছে; তবে সব উদ্যোগ পুরোপুরি সফল হয়নি। আমাদের যেমন এই মাছ গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা উচিত, একইসঙ্গে জেলেদেরও বিভিন্নভাবে সতর্ক করে দেয়া উচিত যাতে তারা জালে ব্যাপকহারে এই মাছ কখনও ধরা পড়লে সেগুলোকে সতর্কতার সঙ্গে অতিদ্রুত আবার পানিতে ছেড়ে দেয় যা অধিকাংশ মাছকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করবে।
_________________________________
আহমেদ হারুন-আল-রশীদ
সহকারী অধ্যাপক, মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদ
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

