হাওরে কৃষকের হাহাকার

ড. মোঃ সহিদুজ্জমান

বাংলাদেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় ৭ টি জেলা কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার এবং ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া জেলার অংশ বিশেষ নিয়ে হাওরাঞ্চল বিস্তৃত। এ হাওর অঞ্চলগুলো বছরের প্রায় সাত মাস পানির নিচে অবস্থান করে। চৈত্র-বৈশাখ মাস সাধারণত শুষ্ক থাকে। এসময়ে কোনো কোনো বছর বৃষ্টি শুরু হলেও সবকিছু তলিয়ে যায় না। কিন্তু এবার চৈত্র মাসেই পুরো এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে কৃষকদের কোনো প্রস্তুতি না থাকায় তারা বিপাকে পড়েছেন। নষ্ট হয়ে যাচ্ছে জমির ফসল, তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে গো-খাদ্যের, নিরুপায় হয়ে কৃষক অল্প দামে বিক্রি করেছে তাদের গবাদিপশু।

গবাদি পশুর সংখ্যা হাওরাঞ্চলেই বেশি দেখা যায়। এখানে প্রধানত গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, হাঁস ও মুরগী পালন করা হয়ে থাকে। এদের সংখ্যা প্রায় ৩৩ মিলিয়ন। হাওর অঞ্চলের হাঁস দেশের মোট সংখ্যার ২৪% এর বেশী। হাওর অঞ্চলে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ০.৬২ মিলিয়ন টন দুধ, ০.১৪ মিলিয়ন টন মাংস এবং ৯৮৯ মিলিয়ন ডিম উৎপাদন হয়। সরকার হাওর অঞ্চলে দুধ, মাংস ও ডিমের উৎপাদন যথাক্রমে ১.৪৬ মিলিয়ন, ০.৩৩ মিলিয়ন ও ২৩২৬ মিলিয়ন লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করে ২০ বছর মেয়াদী হাওর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ইতিমধ্যে বিভিন্ন কর্মসুচী হাতে নিয়েছে। এসব কর্মসুচীর মধ্যে রয়েছে গবাদিপশুর জাত উন্নয়ন, গো-খাদ্যের উৎস বৃদ্ধি, পশু-পাখির স্বাস্থ্য সেবার মানোন্নয়ন, কৃষকদের জন্য সেবা কেন্দ্র, গবাদি পশু-পাখির মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণে কারখানা স্থাপন ও উন্নত বাজার ব্যবস্থা।

সাধারণত হাওর অঞ্চলে আর্দ্র বা বর্ষা মৌসুমে (জুন-অক্টোবর) মাছ ধরা এবং শুষ্ক মৌসুমে (ডিসেম্বর-এপ্রিল) ফসল উৎপাদন করা হয় । হাওর উপকুলবর্তী এলাকাগুলো গবাদি পশু পালনে ব্যবহার করা হয়। শুষ্ক মৌসুমে অধিকাংশ পানি শুকিয়ে যায় এবং গবাদি পশুর বিচরণক্ষেত্র হয়ে উঠে। কিন্তু অনাবাদী জমি চাষের উপযোগী করায় এবং হাওর উপকূল ভেঙে যাওয়ায় গবাদিপশুর চারণভুমি এবং গো খাদ্য উৎপাদন দিনদিন কমে যাচ্ছে। ফলে কৃষক গবাদি পশু পালনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে এবং বিক্রি করে দিচ্ছে পালের গরু। এসব বিষয়কে আমলে নিয়ে কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা না গেলে গবাদি পশু উৎপাদনের বিশাল সম্বাবনার এই ক্ষেত্রটি নষ্ট হয়ে যাবে।

হাওর অঞ্চলে বর্ষা মৌসুমে ফসলের যে পরিমান ক্ষতি হয় সে পরিমান ক্ষতি গবাদি পশুর ক্ষেত্রে সাধারণত লক্ষ করা যায় না। বর্ষা মৌসুমে হাওর অঞ্চলে সচারচর গবাদি পশু-পাখির খাবারের সংকট দেখা দেয়। অনেক কৃষক তাই বর্ষা মৌসুমের আগে খাবার সঞ্চয় করে রাখে। বন্যার সময় রোগের জীবানু চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ায় মানুষ ও গবাদি পশুর পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়। তাই মানুষ ও গবাদি পশুর নিরাপদ ও পরিষ্কার পানি ব্যবহারে পানিবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রন করা সম্ভব। এসব অঞ্চলে বন্যা পরবর্তী কিছু রোগবালাই দেখা যায় যেমন গরুর খুরা রোগ, গলাফোলা রোগ; হাঁস মুরগির রানীক্ষেত এবং ছাগলের পিপিআর রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। এসব রোগের জন্য সরকারী ভাবে টিকা প্রদানের ব্যবস্থা আছে। বর্ষা মৌসুমের আগে এবং পরে ৬ মাস অন্তর টিকা প্রদানের মাধ্যমে এসব রোগ নিয়ন্ত্রন করা সম্ভব। এছাড়া পরজীবি বা কৃমি জনিত রোগ দেখা যায়। হাওর অঞ্চল শামুক বংশবিস্তারে উপযুক্ত জায়গা। শামুক পশুপাখির বিভিন্ন পরজীবির বা কৃমির মধ্যবর্তী পোষক হিসেবে কাজ করে। এসব শামুক হাঁসের খাবার হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে অথবা এগুলোকে নিধন করতে হবে। এছাড়া কৃমিনাশক ঔষুধ নিয়মিতভাবে ৪ মাস অন্তর খাওয়াতে হবে। গো খাদ্য চাষে কৃষককে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। বর্ষা মৌসুমের আগে গো খাদ্য মজুদ রাখতে হবে। বন্যা পরবর্তী সময়ে এক শ্রেণির ডাল ও কচি গমের চারা উৎপাদনের মাধ্যমে গবাদি পশুর খাবারের চাহিদা মেটানো যেতে পারে।

হাওরে বন্যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে প্রয়োজনীয় বাঁধ ও খাল খননের দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। হাওরের কৃষকের জন্য বিশেষ ঋণের ব্যবস্থা করা, প্রযুক্তিগত ব্যবহারের মাধ্যমে মাছ, ফসল ও গবাদি পশু উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হবে। উন্নত প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা থাকতে হবে। উপজেলা প্রাণিসম্পদ হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত টিকা ও ঔষুধ সরবরাহ করা দরকার এবং প্রয়োজনীয় জনবল বাড়ানো দরকার। সর্বোপরি হাওর অঞ্চলের মানুষের জীবন জীবিকার উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।

লেখকঃ
প্রফেসর ও বিভাগীয় প্রধান
প্যারাসাইটোলজি বিভাগ
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।

  •  
  •  
  •  
  •