অযত্ন অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে ঠাকুরগাঁওয়ের ছয়টি রেশম খামার
ঠাকুরগাঁও সংবাদদাতা:
পর্যাপ্ত বরাদ্দ ও পরিচর্যার অভাবে নষ্ট হতে বসেছে ঠাকুরগাঁও রেশম বোর্ডের আওতাধীন ছয়টি বেশম বাগান। এছাড়া সচেতনতার অভাবে স্থানীয় লোকজন গরু-মহিষ চড়াচ্ছে বাগানগুলোতে। এতে নষ্ট হচ্ছে বাগানোর গাছপালা।
ঠাকুরগাঁও রেশম কারখানার আওতায় ঠান্ডিরাম, রত্নাই, সাদামহল, সাকোয়া, আটোয়ারী ও সনকা এলাকায় ছয়টি রেশম তুঁতবাগান রয়েছে। লোকসানের অজুহাতে ২০০২ সালের ৩০ নভেম্বর ঠাকুরগাঁও রেশম কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়। রেশম কারখানাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ছয়টি বাগান এলাকায় কর্মরত প্রায় ১০ হাজার রেশম চাষি গুটি বিক্রি করতে না পেরে অনেকেই ওই পেশা ছেড়ে দেন। রেশম বোর্ডের আওতায় তুঁত বাগানগুলোতে সরকারি তত্ত্বাবধানে পলু পালন অব্যাহত রয়েছে। উৎপাদিত রেশম গুটি সরাসরি রেশম বোর্ডে সরবরাহ করা হয়।
সরেজমিনে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার রত্নাই রেশম খামার পরিদর্শন করে দেখা যায়, ওই খামারের আওতায় তিনটি বাগানের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। ৫৫ বিঘা জমির উপর গড়ে ওঠা বাগানের বেশিরভাগ তুঁতগাছ পানির অভাবে মরে যেতে বসেছে। তুলনামূলক উঁচু এসব জমির পানি ধারণক্ষমতা অত্যন্ত কম। তাই শ্যালো মেশিন দিয়ে পানি সেচ দেয়া ব্যয়বহুল বলে জানালেন বাগানের শ্রমিকরা। গভীর নলকূপ না থাকায় বাগানগুলোতে নিয়মিত পানি সেচ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।
এছাড়া প্রতি বছর ২০ বিঘা জমির বাগান পরিচর্যার জন্য সরকারিভাবে বরাদ্দ মিললেও অবশিষ্ট বাগানের জন্য কোনো বরাদ্দ পাওয়া যায় না। বরাদ্দের অভাবে ৩৫ বিঘা জমির বাগান পরিচর্যা করা যায় না। এ কারণে বাগানের অনেক তুঁতগাছ মারা যাচ্ছে। পরিচর্যার অভাবে ঘাসে পরিপূর্ণ হয়ে গেছে বাগানের জমিগুলো।
এছাড়াও রত্নাই বিওপি সংলগ্ন বাগানের তুঁতগাছের অবস্থা আরও শোচনীয়। এখানে তুঁতগাছের ফাঁকে ফাঁকে লাগানো হয়েছে বরই গাছ। এছাড়াও স্থানীয়রা বাগানের ভেতরে অবাধে গরু ছাগল চড়ানোর কারণে বেশিরভাগ তুঁতগাছ ভেঙে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
বাগানের ইনচার্জ মোশাররফ হোনের জানান, সীমান্তবর্তী লোকজন অশিক্ষিত ও চোরাকারবারির সঙ্গে জড়িত থাকায় তাদের বাধা দেয়া যায় না। এছাড়া কয়েক বছর একটি এনজিও ওই বাগান লিজ নিয়ে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনক্রমে তুঁতগাছের ফাঁকে ফাঁকে বরই গাছ লাগায়। পরবর্তী সময়ে লিজের মেয়াদ শেষে বাগানটি রেশম বোর্ডের কাছে ফেরত এলেও অপ্রয়োজনীয় বরই গাছ অপসারণ করা যাচ্ছে না। সীমান্ত প্রাচীর বা তারকাঁটার বেড়া না থাকায় বেশিরভাগ বাগান অরক্ষিত।
এদিকে ১৫ এপ্রিল ঘূর্ণিঝড়ে বাগান ম্যানেজারের অফিসকক্ষ ও পলু পালন ঘরের টিন উড়ে যায়। তাৎক্ষণিকভাবে অপর একটি ঘরে পলু স্থানান্তর করা হলেও ম্যানেজারের বসার মতো কোনো জায়গা নেই। ফলে পলু পালন নিয়ে বিপাকে পড়েছে খামার কর্তপক্ষ।
এদিকে প্রায় দেড় মাস অতিবাহিত হলেও বরাদ্দের অভাবে উড়ে যাওয়া টিনের চালা মেরামত করা যাচ্ছে না বরে জানান বাগান ইনচার্জ।
এ ব্যাপারে ঠাকুরগাঁও রেশম বোর্ডের উপ-পরিচালক সুলতান আলী জানান, সরকারি বরাদ্দের অভাবে রেশম বাগানসমূহ ঠিকমতো পরিচর্যা না করায় বাগানের গাছপালা নষ্ট হচ্ছে। তাই বাগানসমূহ উৎপাদনমুখী করতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ প্রয়োজন।
প্রসঙ্গত, ১৯৭৭-৭৮ সালে আরডিআরএস বাংলাদেশ ঠাকুরগাঁও রেশম কারখানাটি স্থাপন করে। ১৯৮১ সালে এই কারখানাটি রেশম বোর্ডের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ১৯৯৫ সালে রেশম কারখানাটি আধুনিকায়নের কাজ শুরু হয়। নতুন ভবন নির্মাণ, নতুন যন্ত্রপাতি ক্রয়, পুরাতন যন্ত্রপাতি মেরামত, সংস্থাপন ও যানবাহন ক্রয় করে আধুনিকিকরণে এক কোটি ৭৯ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়। কাজ শেষ হয় ১৯৯৮ সালে। কিন্তু এই কারখানাটি একদিনের জন্যও উৎপাদনের মুখ দেখেনি। অবশেষে লোকসানের অজুহাতে কারখানাটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এতে ১৩৪ জন শ্রমিক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীকে গোল্ডেন হ্যান্ডশেখ নামের বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হয়।

