আজ বহুভাষাবিদ ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ১৩৬ তম জন্মবার্ষিকী

হালিমা তুজ সাদিয়াঃ

বহুভাষাবিদ, ভাষাতাত্ত্বিক, শিক্ষাবিদ, সাহিত্য-সাধক, গবেষক, সম্পাদক, দার্শনিক, ধর্মবেত্তা জ্ঞান-তাপস ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ১৩৬ তম জন্মবার্ষিকী আজ। তিনি ১৮৮৫ সালের এই দিনে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অবিভক্ত চব্বিশ পরগণা জেলার পেয়ারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের একজন স্মরণীয় বাঙালি ব্যক্তিত্ব। বিভিন্ন ভাষায় তার দখল ছিল অসাধারণ ও অসামান্য। তিনি মোট ২১টি ভাষা জানতেন, তারমধ্যে রয়েছে- ইংরেজি, ফার্সি, সংস্কৃত, জার্মান, আরবি, উর্দু, হিব্রু, গ্রিক, ল্যাটিন, পান্জাবি, গুজরাটি, মারাঠি, তামিল, সিংহল ইত্যাদি।

উর্দু ভাষার অভিধান প্রকল্পেও তিনি সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন। পরে পূর্ব পাকিস্তানি ভাষার আদর্শ অভিধান প্রকল্পের সম্পাদক হিসেবে বাংলা একাডেমিতে যোগ দেন। তিনি বাংলা একাডেমির ইসলামি বিশ্বকোষ প্রকল্পের অস্থায়ী সম্পাদক পদে নিযুক্ত ছিলেন। অতঃপর ১৯৬৩ সালে বাংলা একাডেমি কর্তৃক গঠিত বাংলা একাডেমির পঞ্জিকার তারিখ বিন্যাস কমিটির সভাপতি নিযুক্ত হন এবং তার নেতৃত্বেই বাংলা পঞ্জিকা একটি আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত রূপ পায়। তাছাড়া তিনিই সর্বপ্রথম প্রমাণ করেন, বাংলা ভাষা সংস্কৃত থেকে নয় গৌড়ীয় প্রাকৃত থেকে এসেছে। যেখানে অধিকাংশ পন্ডিত দাবী করেন বাংলা ভাষার উদ্ভব দশম শতাব্দীতে সেখানে ড.মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ দাবি করেন এর সূচনা সপ্তম শতাব্দীতে, যা পরবর্তীতে স্বীকৃতি লাভ করে।

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সাহিত্য কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ১৯৪৮ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনের সভাপতি ছিলেন। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ অনেক বই লিখেছেন। তার গবেষনামূলক গ্রন্থ ও প্রবন্ধের সংখ্যা প্রায় ৪০টি। এছাড়া ৪১ টি বইও লিখেছেন। ভাষাতত্ত্বের উপর রয়েছে ৩৭টি রচনা। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: ভাষা ও সাহিত্য, বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত, দীওয়ানে হাফিজ (অনুবাদ), রুবাইয়াত-ই-ওমর খৈয়াম (অনুবাদ), বিদ্যাপতি শতক, বাংলা সাহিত্যের কথা (২ খণ্ড), বাংলা ভাষার ব্যাকরণ, বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান, ভাষা আন্দোলনে ভূমিকা ইত্যাদি।

তিনি তার ব্যক্তিজীবনে অনেক পুরষ্কার এবং সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। তিনি ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম এমেরিটাস অধ্যাপক পদ লাভ করেন। একই বছর ফ্রান্স সরকার তাকে সম্মানজনক পদক ” নাইট অফ দি অর্ডারস অফ আর্টস অ্যান্ড লেটার্স ” দেয়। ঢাকা সংস্কৃত পরিষদ তাকে ‘বিদ্যাবাচস্পতি’ উপাধিতে ভূষিত করে। পাকিস্তান আমলে তাকে “প্রাইড অফ পারফরম্যান্স পদক” ও মরণোত্তর “হিলাল ই ইমতিয়াজ খেতাব” প্রদান করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে মরণোত্তর ‘ডি. লিট’ উপাধি দেয়। ১৯৮০ সালে মরণোত্তর বাংলাদেশের স্বাধীনতা পদক দেওয়া হয়।

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ছিলেন একজন খাঁটি বাঙালি ও ধর্মপ্রাণ মুসলমান। জাতিসত্তা সম্পর্কে মুহম্মদ শহীদুল্লাহর স্মরনীয় উক্তি ছিল, “আমরা হিন্দু ও মুসলিম যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি”। পূর্ববাংলার রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনেও তার ভৃমিকা রয়েছে। এই জ্ঞান-তাপস ১৯৬৯ সালের ১৩ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন। তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের পাশে সমাহিত করা হয়। ভাষাক্ষেত্রে তার অমর অবদানকে সম্মান ও শ্রদ্ধা জানাতে ওই বছরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন “ঢাকা” হলের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় “শহীদুল্লাহ হল”। এ ছাড়াও তার নামে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কলা ভবনেরও নামকরণ করা হয়।

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ “চলন্ত শব্দ কল্পদ্রুম” নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি ছিলেন অসামান্য মেধার অধিকারী। জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা!

  •  
  •  
  •  
  •  
ad0.3

Tags: