টার্কি মিরাজ : হাজারো তরুণের আশার আলো (ভিডিও)

নিজস্ব প্রতিবেদক:
নাম মিরাজ হোসেন (৩২)। পরিচিত মহল ও বন্ধুরা ডাকেন টার্কি মিরাজ নামে। খুলনা শহরের পশ্চিম বানিয়া খামার এলাকায় জন্ম। পৈতৃক বাড়ি পিরোজপুর জেলার ভাণ্ডারিয়ার পৈকখালী গ্রামে শরীফ বাড়ি। শৈশব কেটেছে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায়। পাঁচ বোন এক ভাই, নবম শ্রেণিতে শিক্ষারত অবস্থায় মারা যান তার বাবা মোয়াজ্জেম আলী শরীফ। মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রম ও বোনদের সহযোগিতায় অনার্স শেষ করে সেজ বোনের সহযোগিতায় পাড়ি জমান দুবাই। ৭ বছর প্রবাসজীবন কাটিয়ে এখন থাকেন ঢাকার উত্তর বাড্ডায়। কঠিন শ্রম আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি দিয়ে অসম্ভবকে জয় করেছেন। বেকারত্বের বিরুদ্ধে নিজেকে জয় করেছেন, সেই সাথে হাজারো তরুণকে আশার আলো দেখাচ্ছেন।

তার সাথে পরিচয় হয় জনপ্রিয় সোশাল মিডিয়া ফেসবুকের মাধ্যমে। একদিন আমার ফেসবুক ওয়ালে ভেসে ওঠে টার্কি বিষয়ক একটি পোস্ট। একটু ভিন্নমাত্রার হওয়াতে এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলি। আগ্রহ জাগে এর সম্পর্কে জানতে। তার নম্বর নিয়ে যোগাযোগ, অতঃপর সাক্ষাৎ- পুরো একটা দিন। যতই কথা বলেছি, ততই অবাক হয়েছি। বর্তমান রংয়ের দুনিয়ায় তার চিন্তা-চেতনা এবং তার বাস্তব কর্মকাণ্ড নিয়ে। উচ্চশিক্ষিত ও ভালো চাকরি থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজেকে একজন ফার্মার হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করেন। সমমনা কয়েকজনকে নিয়ে গড়ে তুলেছেন একটি সংগঠন ‘আমরা সবাই কৃষক’।

শিক্ষিত যুবসমাজ যখন চাকরি না পেয়ে হতাশায় অস্থির জীবনযাপন করছে তখনই এই তরুণ উদ্যোক্তা যুবসমাজকে আশার আলো দেখাচ্ছেন। দীর্ঘ ৭ বছর প্রবাসজীবন কাটিয়ে দেশে এসে শুরু করেন টার্কি মুরগি ও তিতির মুরগি খামার কার্যক্রম।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত তিতির মুরগির একটি প্রজেক্ট এর মাধ্যমে কিছু তিতির সংগ্রহ করে খামার শুর করেন। এরপর টার্কি মুরগি নিয়ে কাজ শুরু করেন। রাজধানীর উত্তর বাড্ডার সাতারকুল এলাকায় পূর্ব পদরদিয়া গ্রামে একটি পরিত্যক্ত মুরগির শেড ভাড়া নিয়ে গড়ে তোলেন বাণিজ্যিক টার্কি এবং তিতির মুরগির যৌথ খামার। এই খামার থেকে টার্কির বাচ্চা নিয়ে এ পর্যন্ত ৩০ জনের ওপর লোক টার্কি মুরগির খামার করেছেন। বর্তমান সেই খামারিদের উৎপাদিত পণ্য সংগ্রহ করে নিত্য নতুন খামারি তৈরি করতে সহায়তা করে আসছেন।

এখন প্রতিমাসে উন্নত মানের ৫০০ বাচ্চা উৎপাদন এই খামারেই সম্ভব। দি সাডেনলিকং ইনকুউবেটর কম্পানির সম্পূর্ণ অটোমেটিক মেশিনের মাধ্যমে ডিম থেকে বাচ্চা ফোটাচ্ছেন। সেখান থেকে বাচ্চা সংগ্রহ করে খামার করছেন অনেক যুবক। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে লোকজন এসে বাচ্চা নিয়ে যাচ্ছেন টার্কি খামার করার জন্য। প্রতি শুক্রবার দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অসংখ্য দর্শনার্থী আসেন খামারটি পরিদর্শন করতে। তিনি দর্শনার্থীদের আন্তরিকতার সাথে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তার খামারটি নিয়ে ৩ এপ্রিল ২০১৬ বৈশাখী টেলিভিশনে কৃষি জীবন অনুষ্ঠানে একটি সচিত্র প্রতিবেদন প্রচার করেছে।

সূর্য ওঠার আগেই তিনি তার কাজ শুরু করেন। সকাল ৮টা পর্যন্ত খামারের খুটিনাটি কাজ করে তার সহযোগী নুরুল আমিন কে সব কাজ বুঝিয়ে দিয়ে ৯টার মধ্যে চলে যান তার কর্মস্থলে। কাজ শেষে করে সন্ধ্যার আগেই আবার ফিরে আসেন খামারে। এই টার্কি খামারটিই তার ধ্যান। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষকে ক্লান্তিহীনভাবে মুঠোফোনের মাধ্যমে টার্কি খামার সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তর দেন। সহজ সাবলীল ভাষায় সবাইকে উৎসাহ দেন। রাতে বসে যান ল্যাপটপটি নিয়ে টার্কি নিয়ে বিভিন্ন লেখা লিখে সোশাল মিডিয়াতে প্রকাশ করে। বেশির ভাগ রাতই ইজিচেয়ারে বসেই কাটিয়ে দেন। নিয়মিত পড়াশুনা করছেন এই বিষয়ের ওপর। নিজে জানছেন সেই সাথে ব্লগ লিখে এবং সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে অন্য সবাইকে জানাচ্ছেন। তারা খামারে এসে ফ্রি প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন অনেকেই। তিনি গবেষণা করছেন কিভাবে টার্কির অধিক উৎপাদন করা যায়। কৃত্রিম প্রজনন করার যন্ত্রপাতি আনছেন আমেরিকা থেকে। এ ক্ষেত্রে তাকে সহযোগিতা করছেন তার প্রবসী বন্ধুরা।

টার্কি ও তিতির মুরগির পাশাপাশি গবেষণা শুরু করেছেন আমেরিকার জনপ্রিয় আরেকটি মুরগি ‘সিল্কি’ নিয়ে। আমেরিকা থেকে এনেছেন সিল্কি মুরগির ডিম। ইতিমধ্যে সেই ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়েছে। আশা করি খুব শিগগিরই এখানেও তিনি সফল হবেন। আশা করা হচ্ছে, তার হাত ধরেই এই মুরগি বাংলাদেশের পোলট্রিতে নতুন সংযোজিত হবে। তার সকল কাজে সর্বোপরি সহযোগিতা করছেন একজন সৌখিন, আধুনিক ও কৃষিমনস্ক প্রকৌশলী শাহীন হাওলাদার। তিনি এই খামারটি করতে সকল ধরনের আর্থিক ও মানসিক সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। এই খামারটি দেখাশুনার দায়িত্বে রয়েছেন নুরুল আমিন। টার্কির রোগ বালাই ও চিকিৎসাসেবা, প্রজনন সমস্যা নিয়ে গবেষণা করছেন ফার্মাসিস্ট এনামুল হক। এরই মধ্যে তিনি টার্কির বাচ্চা মৃত্যুহার কমাতে ও সুস্থ বাচ্চা উৎপাদনের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন। এ ছাড়াও টার্কির সুষম খাদ্য নিশ্চয়তার জন্য খাবার ম্যানু তৈরি করছেন। তিনি নিয়মিত এই টার্কি খামার পরিদর্শন করেন এবং চিকিৎসাসেবা প্রদান করেন।

তরুণ প্রজম্মের আশার আলো উদ্যোক্তা মিরাজ হোসেন (টার্কি মিরাজ) বলেন, ”প্রতিদিনই বাড়ছে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা। প্রতিবছর যে হারে লোক সংখ্যা বাড়ছে, সে হারে বাড়ছে না কর্মক্ষেত্র। এ কারণে দিন দিন চাকরি যেন ‘সোনার হরিণ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে পড়ালেখা শেষ করলেও জুটছে না কাঙ্ক্ষিত চাকরি। তাই জেলা শহরে ব্যর্থ হয়ে কাজের সন্ধানে অবশেষে শিক্ষিত বেকার যুবকরা ছুটে আসছেন রাজধানীতে। বেকারত্বের বিষবাষ্প ছড়িয়ে আছে দেশের আনাচে-কানাচে। এই তরুণদের চোখের সামনে নেই কোনো স্বপ্ন, নেই জীবনের অনাগত দিনগুলো সাজানোর কোনো সুন্দর পরিকল্পনা। কিন্তু এই ক্রান্তিকাল শুরুর আগে, কারো মনেই এমন প্রত্যাশা ও ছিল না। সবার মনেই ছিল একটা সুন্দর স্বপ্ন! সমাজের মানুষের কাছে দিন দিন নিজেদের নেতিবাচক অবস্থান দেখে তাদের অনেকেই আজ বিপর্যস্ত। যদি এই সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মকে বেকারত্বের হাত থেকে রক্ষা না করা যায়, তাহলে এটি সমাজ তথা রাষ্ট্রের জন্য এক দুরারোগ্য ব্যাধি হিসেবে দেখা দিবে। ”

তিনি আরো বলেন, ”বাংলাদেশের গ্রাম গঞ্জে ও শহরে ছাদ সহ অনেক জায়গা অনাবাদি/পতিত অবস্থায় পড়ে থাকে। যেখানে প্রাকৃতিকভাবে জন্মে নানা ধরনের ঘাস লতা। এ রকম উন্মুক্ত জায়গা টার্কি পালনের জন্য বেশি উপযোগী। অন্যদিকে আমাদের রয়েছে এক বৃহত্তর বেকার জনগোষ্ঠী। তাই একদিকে অব্যবহৃত জমিকে ব্যবহার এবং বেকারদের জন্য কর্মসংস্থান, এই দুইয়ের মাঝে সেতুবন্ধন হতে পারে ছোট একটি টার্কি খামার। যারা বেকার বসে আছেন, যারা নতুন কিছু শুরু করতে চান পোলট্রি ব্যবসা করে যারা লোকসানের সম্মুখীন হয়েছেন এবং আপনার স্থাপনা এখন কোনো কাজে আসছে না, যারা কম ঝামেলাপূর্ণ কাজ পছন্দ করেন এবং ভালো আয়ের উৎস খুঁজছেন, যারা অল্প পুঁজি এবং কম ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসা খুঁজছেন, টার্কির খামার তাদের জন্য আদর্শের হতে পারে। ”

  •  
  •  
  •  
  •  

Tags: