মানুষের পলিগ্লুটামিন রোগ নিয়ে গবেষণা এবং কিছু কথা
প্রফেসর ড. মো. সিদ্দিকুর রহমান:
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং শিক্ষা ও গবেষণা, আমাদের চিন্তা জগতের দু’টি ভিন্ন মেরু হলেও তার অপূর্ব সমন্বয় খুঁজে পাওয়া যায় সাকুরার দেশ জাপানে। সেই রকমই আমি উপলব্ধি করেছিলাম জাপানের Osaka University Medical School-এ দুই বছর পোষ্ট ডক্টোরাল গবেষণাকালে। Japan Society For Promotion Of Science-এর বৃত্তি নিয়ে উক্ত প্রতিষ্ঠানে আমি ২ বছর মানুষের হান্টিংটন এবং অন্যান্য পলিগ্লুটামিন রোগের উপর কাজ করেছি। সেই সাথে ঊপভোগ করেছি জাপানের প্রকৃতি, কৃষ্টি ও দৈনন্দিন জীবনের অমীয়ধারা। প্রথমে কিছু কথা আমার গবেষণা নিয়ে বলছি।
হান্টিংটন একটি জীনের নাম যা স্বাভাবিক ভাবে প্রত্যেক মানুষের ৪র্থ ক্রোমজোমে থাকে। সেই জীনের মিউটেশন বা ডিফেক্ট এর কারনে যে রোগ হয় তাই হান্টিংটন রোগ নামে পরিচিত। হান্টিংটন জীন রিপিটেডট্রাইগ্লিসারাইড CAG (সাইটোসিন-অ্যাডেনিন-গুয়ানিন) দিয়ে তৈরী যা CAG-CAG-CAG এমনভাবে সাজানো থাকে এবং এর জেনেটিক কোড হচ্ছে গ্লুটামিন। রিপিটেড গ্লুটামিন দিয়ে এই মিউটেশন হয় বলে একে পলিগ্লুটামিন (Poly-Q) বলে।
হান্টিংটন রোগের প্রধান লক্ষণ হলো অনিয়ন্ত্রিত চলাফেরা, কাজে অমনযোগ, মাংসপেশীতে জোড় কমে যাওয়া, স্মৃতিশক্তিলোপ ইত্যাদি। শুধু হান্টিংটন নয়, আরও অনেকরোগ আছে যা এই পলিগ্লুটামিন এর কারণে হয় এবং ঐ সকল রোগগুলোকে পলিগ্লুটামিন বা Poly-Q disease বলে। নিচে সেই পলিগ্লুটামিন রোগগুলোর তালিকা, তার জন্য দায়ী জীন, রিপিটেড CAG এর সীমা এবং শরীরের কোন অংশকে আক্রান্ত করে তা একটি তালিকা তে তুলে ধরছি:
রিপিটেড CAG ২৭-৩৫ এর মাঝে থাকলে রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।
• ৩৬-৩৯ হলে রোগ হওয়ার আশংকা থাকে এবং
• হান্টিংটন ডিজিজের ক্ষেত্রে রিপিটেড CAG ৪০ এর বেশী হলে রোগের লক্ষণ প্রকাশ করে,
• ডিফেক্টিভ বা মিউট্যান্ট প্রোটিন মূলত স্নায়ুকোষ গুলোকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে দেয়। ফলে রোগের প্রোগ্রেসের সাথে সাথে আক্রান্ত ব্যক্তি স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারেনা, স্বাভাবিক চিন্তা করতে পারে না, স্মৃতি শক্তি লোপ পায়, দুশ্চিন্তা বা anxiety, ডিপেশান, ওজন কমা, মাংশপেশীতে শক্তি কমে যাওয়া এসব লক্ষণ দেখা দেয়।
জাপানে এই রোগের প্রাদুর্ভাব খুব বেশী না। প্রতি ২ লক্ষ মানুষের মাঝে ১জনের এই রোগ হয়। কিন্তু শ্বেতাঙ্গ মানুষদের মাঝে এর প্রাদুর্ভাব তুলনামূলক বেশী। প্রতি ১লাখ মানুষের মাঝে ৫-৭ জনের এই রোগ দেখা যায়। এশিয়া ও আফ্রিকাতেও কৃষ্ণবর্ণ মানুষের চেয়ে শ্বেতাঙ্গ মানুষে হান্টিংটন রোগটি বেশী। ২০০০ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে একজন ইন্ডিয়ান বাঙালির মাঝে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়।
পারকিনসন ও হান্টিংটন ডিজিজের লক্ষণ মোটামুটি একই রকম। যাদের পারকিনসন আছে তাদের হান্টিংটন ডিজিজ আছে কিনা এটা জানার জন্য আমি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে সেখানকার নিউরোলজি বিভাগের শিক্ষকদের সহযোগীতায় ৯জন রোগীর DNA নিয়ে জাপানের ল্যাবরেটরীতে পরীক্ষা করেছিলাম। তুলনা করার জন্য ৭টি কন্ট্রোল DNA নমুনা নিয়ে গিয়েছিলাম। সেই সব রোগীদের পারিবারিক তথ্য, বয়স, লিঙ্গ, লক্ষণ সমস্ত তথ্যের উপর ভিত্তি করে এই নমুনাগুলো সংরক্ষিত করা হয়েছিল। সৌভাগ্যবশত: কোন নমুনাই হান্টিংটন পজেটিভ হয়নি।
নিজের দেশের কেউ দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হোক এটা কোন গবেষকের কাছে সুখের নয়। দুরারোগ্য বলার চেয়ে অনারোগ্য বললেই যথাযথ হয় বলে মনে হয়। কারণ, এই রোগের এখনো কোন চিকিৎসা আবিষ্কৃত হয়নি। আমি হান্টিংটন রোগের কোন ঔষধ বের করা যায় কিনা সেটার উপরেও কিছুদিন কাজ করেছিলাম। কিন্তু কাজটি সম্পন্ন করার আগেই দেশে চলে এসেছিলাম। তবে ভবিষ্যতে সুযোগ পেলে এই রোগ নিয়ে আরও কাজ করার ইচ্ছা আছে। এই ছিল আমার গবেষণা নিয়ে কিছুকথা।
এখন আসি জাপান বন্দনায়। প্রকৃতি, কৃষ্টি, সৃষ্টি সবদিকেই জাপান অনবদ্য। সেখানকার মানুষের সারল্য, তাদের জীবনযাত্রার মান সত্যিই প্রশংসনীয়। জাপানের যে জিনিষটা না বললেই না তাহল এর ঋতুর পরিবর্তন, বিশেষ করে শীতকাল থেকে বসন্তে পা রাখে। শীতে জর্জরিত বৃদ্ধ মানুষের মত পাতাবিহীন কাষ্ঠসার গাছগুলোতে হঠাৎ করেই ফুলের কলি উঁকি দেয়। কিছুদিনের মাঝেই গাছগুলো ফুলেল হয়ে ওঠে। প্রকৃতি ধারণ করে পূর্ণযৌবনের রঙ। এতক্ষণ ধরে যে গাছের কথা বলছি এটিই সেই বিখ্যাত সাকুরা বা চেরি গাছ।
প্রকৃতিতে সাকুরা ফুলের আগমণ জাপানকে সাজিয়ে তোলে এক অভিনব সাজে। বাতাসে উড়ে বেড়ায় ফুলের পাপড়িগুলো। প্রকৃতির এই সাজসাজ রবকে জাপানিরাও অভ্যর্থনা জানায় সানন্দে। পালন করে হানা (ফুল) মি (দর্শন) বাহানামি বা ফুলদর্শন উৎসব। প্রায় ১৩০০ বছর ধরে চলে আসছে এই উৎসব।
হানামি উৎসবের সময় জাপানিরা তাদের পরিবার-পরিজন বা বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে বেরিয়ে পড়ে প্রকৃতির এই অপরূপ রূপকে উপভোগ করতে। তারা মাদুর বিছিয়ে বা এমনিতেই ফুলেল সাকুরা গাছের তলায় বসে গল্প করে, খাওয়া-দাওয়া করে এবং উপভোগ করে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য। আমিও জাপানিদের মতই আমার পরিবার নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম মহানামি অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার জন্য। পরেছি তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক কিমোনো, খেয়েছি জাপানের কিছু প্রসিদ্ধ খাবার।
সাকুরা গাছের সাথে ছবি তুলে সারাজীবনের মত এই সৌন্দর্য্য, সুখস্মৃতি ফ্রেমে বন্দি করে এনেছি। কথা প্রসঙ্গে বলি, জাপান ছাড়া যারা অন্য দেশ থেকে যারা পিএইচডি করেছে, Japan Society for Promotion of Science তাদের দিয়েছিল বাড়তি কিছু সুবিধা। দক্ষিণ কোরিয়া থেকে পিএইচডি করায় সেই সুযোগটা আমিও পেয়েছিলাম। টোকিও-তে জাপান সম্রাটের বাসভবনের পাশে একটি পাঁচতলা হোটেলে আমাদের রাখা হয় তিনদিন। ঊদ্দেশ্য আমাদেরকে জাপানি ভাষা শিখানো ও জাপানি সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা দেয়া। এই তিনদিনেই শিখাছিলাম জাপানি ভাষা এবং সুযোগ পেয়েছিলাম তাদের ঐতিহাসিক স্থানগুলো দর্শন করার। আমি আমার পরিবার পরিজন নিয়ে ওসাকা ইউনিভার্সিটির ইন্টারন্যাশনাল হাউজে ছিলাম এবং তারাও পেয়েছিল বিনা খরচে জাপানি ভাষা ও সংস্কৃতি আদান-প্রদানের সুবিধা। তাছাড়াও আমার দুই ছেলে-মেয়ে পেয়েছিল লেখাপড়া, বিনোদন, আর্থিক ও চিকিৎসা সহযোগীতা।
আজও আমার স্মৃতিতে নাড়া দেয় ওসাকা ইউনিভার্সাল স্টুডিও, ওসাকা অ্যাকুরিয়াম, টোকিও মিউজিয়াম, সুমোদের সাথে কুস্তির সুযোগ ও কিয়োতোর স্বর্ণমান্দির দর্শনসহ আরও নানান জায়গার কথা।
শুধু আমি না, জাপান থেকে আসা বেশীরভাগ গবেষকদের মনেই জাপান চিরভাস্বর। তাইতো, জাপান থেকে পোস্ট ডক্টরাল করে আসা মানুষ গুলো একত্রে মিলে গড়ে তুলেছে Bangladesh Japan Society for Promotion of Science Alumni Association, এই অ্যাসোসিয়েশন প্রতিবছর জাপান দূতাবাসের সহযোগিতায় একটি বার্ষিক সভার আয়োজন করে যেখানে বাংলাদেশি গবেষক যারা Japan Society for Promotion of Science এর অনুদানে পিএইচডি বা পোস্ট ডক্টরাল করে এসেছে তারা একত্রিত হয়। জাপানি গবেষকরা ও এই সভায় যোগ দেয়। বিভিন্ন সময় উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য একাধিকবার যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ব্রাজিল, কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্ডিয়া ও পাকিস্তান যাওয়ার সুযোগ হলেও জাপানে পোষ্ট ডক্টরাল করার সময়টা আমাকে এখনো করে অনুপ্রাণিত।
_____________________________________
প্রফেসর ড. মো. সিদ্দিকুর রহমান
মেডিসিন বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ-২২০২
ই-মেইল: prithul02@yahoo.co.uk
ওয়েবসাইট : www.freewebs.com/msrahman
মোবাইল: 01918-181550




