মাছ চাষে সফল নারী উদ্যোক্তা ময়মনসিংহের খায়রুন নাহার (ভিডিও)

ময়মনসিংহ সংবাদদাতা:
মাছ চাষ করতে গিয়ে স্বামী আবুল কালাম আজাদ প্রায় পথে বসে যান। সে সময় এগিয়ে এলেন স্ত্রী খায়রুন নাহার। শুরু করলেন এক নতুন সংগ্রাম। মাছ চাষে কেবল সফলই হলেন না, পেলেন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিও।

নিজের কোনো সন্তান না থাকলেও পরম মমতায় মাছের চাষ করেন ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জের খায়রুন নাহার। মাছের সঙ্গে মিতালি গড়ে তুলে পেয়েছেন মাছবন্ধু পরিচয়। কিন্তু গল্পটা খুব সরল ছিল না।

বয়স চল্লিশের কোঠায়। নিজের কোনো সন্তান নেই, তবুও উৎফুল্ল থাকার প্রাণান্ত চেষ্টা। সব সময় মেতে থাকেন মাছ নিয়ে। মাছকেই নিজের সন্তানের মতো পরম মমতায় বড় করে তোলেন ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জের আঠারবাড়ী ইউনিয়নের মহেশ্চাতুল গ্রামের খায়রুন নাহার। স্বামী আবুল কালাম আজাদ যখন মাছ চাষ করতে গিয়ে আর্থিক ক্ষতির কারণে পথে বসার উপক্রম, ঠিক তখনই নতুনভাবে লড়াই শুরু করেন খায়রুন নাহার। যেখানে সব আশা ম্লান হতে শুরু করেছিল, সেখান থেকেই নতুন স্বপ্ন বুনতে শুরু করেন সংগ্রামী নারী খায়রুন।

সোনালী ব্যাংকের ঈশ্বরগঞ্জ শাখা থেকে ৪ লাখ টাকা এসএমই ঋণ নিয়ে মৎস্য বিভাগের সহযোগিতায় নিজ গ্রামে ১০ একর জমি লিজ নিয়ে মাছ চাষ শুরু করেন ২০১৩ সালে। নিজের পরিশ্রমের মাধ্যমে ব্যাংক ঋণের টাকায় অন্যের জমি লিজ নিয়ে মাছ চাষ করে আজ তিনি সফল উদ্যোক্তা। শিং মাছ ও গুলসা মাছ চাষে সফলতার জন্য জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ ২০১৫-এর রৌপ্য পদক পান তিনি। গেল বছরের ২৮ জুলাই মৎস্য সপ্তাহ উদ্বোধনের দিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে পদক গ্রহণ করেন খায়রুন নাহার। শুধু জাতীয় পুরস্কারই নয়, খায়রুন নাহার ২০১৪ ও ২০১৫ সালে শেরেবাংলা একে ফজলুল হক গুণীজন সম্মাননাসহ বিভিন্ন সংগঠন থেকে মাছ চাষে সফল নারী হিসেবে অনেক সম্মাননা অর্জন করেছেন বছর কয়েকের মধ্যেই।

সফল নারী উদ্যোক্তা খায়রুন নাহার জানান, তার স্বামী আবুল কালাম আজাদ নিজের জমিজমা বিক্রি করে মাছ চাষ শুরু করেন। সাফল্যের মুখ দেখবেন আশাও ছিল তার। কিন্তু ২০১২ সালে অজ্ঞাত রোগে সব মাছ মরে যাওয়ায় তাদের পথে বসার উপক্রম হলো। মাছের কাছে স্বামীর এমন পরাজয় মেনে নিতে পারেননি তিনি। স্বামী যেখানে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সেখান থেকে নতুনভাবে বাঁচার স্বপ্ন বুনতে শুরু করেন। সোনালী ব্যাংক ও স্থানীয় মৎস্য বিভাগের সঙ্গে কথা বলে ৪ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে এলাকায় ১০ একর জমি লিজ নেন। তার পর শুরু করেন লড়াই। সৃষ্টি ফেয়ার মৎস্য হ্যাচারিতে দিন-রাত এক করে পরিশ্রম করে মাছের ভালো উৎপাদন করতে সক্ষম হন একসময়। ব্যাংকের ঋণ পরিষদ করে ফের ৮ লাখ টাকা নিয়ে শুরু করেন মাছ চাষ।

বর্তমানে ১০ একরের সঙ্গে আরও ৭ একর জমি যুক্ত করেছেন তিনি। তিনি ২০১৪ সালে মাছ চাষ করে আয় করেছেন ২৫ লাখ টাকা। বর্তমানে তিনি বিভিন্ন প্রজাতির মাছের চাষ করছেন ১৭ একর জমিতে। মহেশ্চাতুল ও লক্ষ্মীগঞ্জ এলাকার দুটি সাইটে চলছে তার মাছের রাজ্য। নিজের কোনো সন্তান না থাকলেও মাছকেই পরম যত্নে পরিচর্যা করেন খায়রুন নাহার। আর সেই মাছ চাষে চারপাশে বিপ্লব ঘটানোর স্বপ্ন দেখেন সব সময়।

জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত খায়রুন নাহার আরও জানান, এ বছর তার ১৭ একর জমিতে পাঙ্গাশ, শিং, মাগুর, গুলসাসহ কয়েক প্রজাতির মাছ রয়েছে। যার বাজারমূল্য হবে এক কোটি টাকার ওপরে। শিগগিরই সেই মাছ বিক্রি করবেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, মাছ চাষে নিজে সফল হয়ে বসে থাকতে চান না। তার সফলতা যেন দেশের প্রতিটি নারী অর্জন করতে পারেন সে জন্য দেশের যেখানে সুযোগ পান সেখানেই মাছের চাষ শুরু করবেন তিনি। তিনি চান তাকে দেখে আরও সফল উদ্যোক্তা তৈরি হোক। তিনি নারীদের মাছ চাষের প্রতি আগ্রহী হওয়ারও আহ্বান জানান। নারীরা ঘরে অলস সময় কাটানোর চেয়ে নিজেরা স্বাবলম্বী হয়ে নিজের পরিবার ও দেশের মুখ উজ্জ্বল করতে পারেন দেশ ও দেশের বাইরে।

সফল নারীর স্বামী আবুল কালাম আজাদ বলেন, তিনি যেখানে হার মেনেছেন, তার স্ত্রী সেখান থেকেই শুরু করেছেন। নিজে ব্যর্থ হলেও স্ত্রী সফল হয়েছেন মাছ চাষ করে। পরম মমতায় মাছ চাষ করে আজ তার স্ত্রী সফল। আর স্ত্রীর সকল কাজে তিনি এখন সহযোগিতা করেন। এদিকে তার স্ত্রীর মৎস্য খামারে কাজ করে অনেক পরিবারও আর্থিক সচ্ছলতার মুখ দেখেছে বলে জানান তিনি।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা এএসএম সানোয়ার রাসেল বলেন, নিজের পরিশ্রমের মাধ্যমে খায়রুন নাহার একজন নারী হয়েও অনন্য উচ্চতার শিখরে পৌঁছেছেন। তার পাশাপাশি যেন উপজেলার অন্য নারীরাও মাছ চাষে আগ্রহী হন সে জন্য নারীদের উদ্বুদ্ধ করা হবে। মাছ চাষে খায়রুন নাহার সারাদেশের জন্য মডেল। খায়রুন নাহার শুধু নিজে সফল হননি, তার হ্যাচারিতে বেকার যুবক ও নারীরা নিয়মিত কাজ করে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগও তৈরি করেছেন।

ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাজীব কুমার সরকার বলেন, একজন সফল উদ্যোক্তা খায়রুন নাহার। নিজের কর্মপ্রচেষ্টার মাধ্যমে তিনি জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কৃতও হয়েছেন। এটি নারীদের জন্য গর্বের। তাকে দেখে নারীরা উদ্বুদ্ধ হলে মাছ চাষে বিপ্লব ঘটতে পারে।

  •  
  •  
  •  
  •  

Tags: