দেশের প্রথম নারী ট্রেনচালক ছালমার সফলতার গল্প
নারী ডেস্ক:
বাংলা সাহিত্যে এমএ পড়ুয়া এ মেয়েটি খুঁজে নিতে পারতেন এক স্বস্তির চাকরি। কিন্তু তা তিনি করেননি। ২০০৪ সালের ৮ মার্চ ‘বিশ্ব নারী দিবসে’ চাকরি নেন রেলওয়ে ট্রেন চালক হিসেবে। ওই সময় দেশে প্রথম নারী ট্রেনচালক হিসেবে তাকে নিয়োগ দেয়া হয়। সেই থেকে ট্রেন চালিয়ে আসছেন ছালমা খাতুন। পরে ২০১২ সালের শেষে দিকে পর্যায়ক্রমে রেলওয়েতে আরও ১২ জন নারী ট্রেনচালকের নিয়োগ হয়। ছালমা খাতুন দিন নেই রাত নেই, বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও ট্রেন চালান।
নারীর অগ্রগতি সূচকে দেশ অনেক দূর এগিয়েছে। নারী আর অবরোধবাসিনী নন। একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশ রেলওয়েতে সাব-লোকোমোটিভ ছালমা খাতুন নিজ যোগ্যতায় জায়গা করে নিয়েছেন। একটা সময় ছিল যখন ট্রেন চালাতেন শুধু পুরুষ চালক। ২০০৪ সাল থেকে সে চিত্র বদলাতে থাকে। সেথেকে পুরুষ চালকের সঙ্গে এ পেশায় কাজ করছেন নারী চালকরাও।
ছালমা খাতুন ট্রেন চালাতে গিয়ে কখনও কখনও জীবন-মরণের মুখোমুখি হয়েছেন, আবার কখনও সামলিয়েছেন ভয়াবহ দুর্ঘটনা। ছালমা খাতুন ঘরও সামলান। আড়াই বছরের মেয়ে লাবণ্যকে মানুষ করার দায়িত্বও তার কাঁধেই। ছালমা খাতুনের গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইল জেলার ভূঞাপুরের অর্জনা গ্রামে। তার বাবা বেলায়েত হোসেন বেশ কয়েক বছর আগে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। মা সায়েরা বেগমসহ তিন ভাই দুই বোন রয়েছেন। ভাই বোনের মধ্যে ছালমা খাতুন চতুর্থ।
এই চ্যালেঞ্জিং পেশা সম্পর্কে ছালমা খাতুন বলেন, নারী হয়েও আমি পুরুষের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ট্রেন চালাচ্ছি। এটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং পেশা। এ পেশায় মেয়েদের অবস্থান এখনও যথাযথ হয়নি। যথেষ্ট স্বল্পতা রয়েছে । এখনও আমাদের কর্মক্ষেত্রে বিশেষ করে ড্রেসিংয়ের কোনো জায়গা নেই। বেতনও কম। নারী উন্নয়ন, নারী অগ্রগতিতে দেশ যখন এগিয়ে চলছে, সেখানে মেয়েশিশুরা কেনো বর্বর নির্যাতনের শিকার হবে। ঘর থেকে বের হলেই কেন যৌন হয়রানির শিকার হতে হবে নারী ও মেয়েশিশুকে। অনেক সময় আমাকেও ‘চালক’ বলে তুচ্ছ -তাচ্ছিল্য করা হয়, ঘরে-বাইরে, কর্মস্থলে। অথচ আমরা ট্রেনচালক, বিমানের পাইলটের চেয়েও কম নই। রোদ-বৃষ্টি কিংবা ঝড়-তুফানে দিনরাত যে কোনো সময়ে ৭০০ থেকে আড়াই হাজার যাত্রী নিয়েও ট্রেন চালাই। পুরুষ চালকদের বিশ্রামের জায়গাসহ পর্যাপ্ত পরিমাণ সুযোগ-সুবিধা থাকলেও আমাদের নেই। সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ি ট্রেনে ইট নিক্ষেপ ও চোরাকারবারিদের ত্রাসের কারণে। এ পেশায় দায়িত্ব খুবই গুরুত্বপূণ, একটু অসতর্ক হলেই বিপদ অনিবার্য। ঝুঁকিপূর্ণ এ চাকরিতে বেতন যথাযথ নয়। বর্তমানে আমি ঢাকা বিভাগে ট্রেন চালাচ্ছি। এখনও আন্তঃনগর ট্রেন চালাইনি । আর মাত্র এক বছর পরই আন্তঃনগর ট্রেন চালাতে পারব।
ছালমা খাতুন আরো জানান, মানুষের প্রতি ভালোবাসা থেকেই এ পেশায় আসা। শুরু থেকে এ পর্যন্ত হাজার বিপত্তিতেও হার মানেননি তিনি। শুধু ট্রেন চালনা নয়, এ পেশায় ট্রেনের ইঞ্জিন মেরামত থেকে শুরু করে রক্ষণাবেক্ষণের কাজও শিখতে হয়। ভয়ভীতি, হুমকি আর সন্ত্রাসকে উপেক্ষা করেই নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হয় তাদের। রেললাইন দিয়ে মানুষ যখন বীরদর্পে হাঁটে তখন বড় কষ্ট হয়। প্রায় দুর্ঘটনার শিকার হন ওই সব লোক। চলন্ত ট্রেনে যারা পাথর ছুঁড়ে মারে পত্রপত্রিকার মাধ্যমে এর কুফলগুলো তুলে ধরতে হবে। ট্রেনচালকের পেশা চ্যালেঞ্জিং পেশা। ইঞ্চি ধরে ধরে ট্রেন চালাতে হয়। বিমান কিংবা আধুনিক প্রাইভেটকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালানো গেলেও ট্রেনের বেলায় তার উল্টো। বিন্দুমাত্র অমনোযোগী হলেই নির্দিষ্ট স্থানে ট্রেন দাঁড় করানো যায় না।
কেন এ পেশা বেছে নিলেন জানতে চাইলে ছালমা খাতুন বলেন, চ্যালেঞ্জিং পেশায় কাজ করার আগ্রহ ছোটবেলা থেকেই। প্রিয় খেলনা ছিল ট্রেন, সেই থেকেই ট্রেনের প্রতি ভালোবাসা। প্রায় সময়ই অনেকেই আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন। ওই সময় আমার ভালো লাগে যেমন, তেমনি খারাপও লাগে। কারণ নানা ভঙ্গিতে আমাকে নিয়ে কথা বলেন অনেকেই। কেউ কেউ বলেন, মেয়ে হয়ে ট্রেন চালাচ্ছে বাবারে, এ পেশায় মেয়েরা আসনের কী দরকার’? আমার শুধু একটাই কথা, শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে না দেখলেও মানুষ যেন আমাদের ঘৃণার চোখে না দেখেন।
সূত্র: যুগান্তর

