ভারতে নতুন করে করোনার ভয়াবহতার পেছনে ট্রিপল মিউট্যান্ট ভ্যারিয়েন্ট?
এস এম আবু সামা আল ফারুকী:
সম্প্রতি ভারতে করোনা রোগীর সংখ্যা যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে তা এর আগে কোথাও দেখা যায়নি। গেল বৃহস্পতিবার, ভারতে একদিনে প্রায় ৩.১৪ লাখ করোনা রোগী শনাক্ত করা হয় যা এ পর্যন্ত পাওয়া একদিনে করোনা শনাক্তের সর্বোচ্চ রেকর্ড। একই সাথে মৃতের সংখ্যাও আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত যায়গা পাওয়া যাচ্ছে না। শশ্মানে মরদেহের লাইন পড়ে আছে। মরদেহ সৎকারের জন্য অপেক্ষা করছে স্বজনরা। কিন্তু এত বিপুল সংখ্যক মরদেহ সৎকার করতে রীতিমত হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। নতুন যে ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া গেছে তার আক্রমনে রোগীর দেহে অক্সিজেন সংকট দেখা দিচ্ছে কিন্তু হাসপাতালগুলোতে পাওয়া যাচ্ছে না পর্যাপ্ত অক্সিজেন সিলিন্ডার।
ইতোমধ্যে গবেষকরা পশ্চিমবঙ্গে করোনার নতুন একটি সংস্করন বা ধরন (স্ট্রেইন) আবিস্কার করেছেন এবং তারা ধারণা করছেন যে, নতুন এই স্ট্রেইনটি আগের সকল স্ট্রেইন থেকে বিপজ্জনক ও দ্রুত বিস্তারে সক্ষম। এটিকে তারা ট্রিপল মিউট্যান্ট ভ্যারিয়েন্ট (বি.১.৬১৮) বা “বেঙ্গল স্ট্রেইন” নামকরন করেন। নামের সাথে মিল রেখে করোনার এই স্ট্রেইন বা জাত এর আগে তিনবার বৈশিষ্ট্য বদলিয়ে বর্তমান রূপ নিয়েছে। এর আগে ভারতে ডাবল মিউট্যান্ট ভ্যারিয়েন্ট (বি.১.৬১৭) বা দুইবার বৈশিষ্ট্য বদলেছে এমন করোনার স্ট্রেইন পাওয়া যায়। যা ভারত ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়াম, জার্মানি, আয়ারল্যান্ড, নামিবিয়া, নিউজিল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য ও আরো অনেক দেশে পাওয়া গেছে।
সম্প্রতি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে এটি আরো একবার বৈশিষ্ট্য বদল করে বর্তমান রূপ লাভ করেছে। এই পরিবর্তনগুলোর মধ্যে রয়েছে ভাইরাসের গাঠনিক ও রাসায়নিক পরিবর্তন। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন এ বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত শনাক্তকৃত করোনা রোগীর মধ্যে ১৫ শতাংশ নতুন এই ট্রিপল মিউট্যান্ট ভ্যারিয়েন্ট দ্বারা আক্রান্ত।
তবে এই নতুন জাতের উপর করোনা ভ্যাক্সিন কাজ করতে পারবে কিনা সে বিষয়টি এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। ভাইরাস খুব দ্রুত নিজের বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন আনতে পারে যা ভাইরাসের কার্যপ্রক্রিয়াকে ক্রমাগত পরিবর্তিত করে। এই পরিবর্তনের ফলে ভাইরাসটি শরীরের সুরক্ষা ব্যবস্থাকে অতিক্রম করার ক্ষমতাও অর্জন করতে পারে।
পশ্চিমবাংলায় করোনার যে নতুন জাতটি পাওয়া গেছে তা ভ্যাক্সিনের ফলে তৈরি হওয়া সুরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে পারবে কিনা এ ব্যপারে এখনই বিজ্ঞানিরা নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারছেন না। তবে তারা আশাবাদী যে বর্তমান টিকা এই নতুন ধরনের বিরুদ্ধে কাজ করতে পারবে। এই নতুন প্রজাতির অনেক বৈশিষ্ট্যই এখনো তাদের কাছে অজানা এবং এটি নিয়ে বিস্তর অনুসন্ধান প্রয়োজন।
ভারতের ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব বায়োমেডিক্যাল জিনোমিকের শ্রীধর চিহ্নস্বামী, টাইমস অফ ইন্ডিয়াকে এক সাক্ষাতকারে বলেন,”আপনি যদি এর আগে করোনার অন্য কোনো স্ট্রেইন দ্বারা আক্রান্ত হন বা ভ্যাক্সিন নিয়েও থাকেন তবুও আপনি নতুন এই ভ্যারিয়েন্ট দ্বারা আক্রান্ত হতে পারেন।”
এমনকি ভাইরাসটির দ্রুত বিস্তারের ক্ষমতার জন্যই ভারতে এত দ্রুত এর সংক্রমন হচ্ছে কিনা সেটি নিয়েও বিজ্ঞানিদের মধ্যে সংশয় রয়েছে।
যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল মাইক্রোবায়োলজির অধ্যাপক রবি গুপ্তা বিবিসিকে বলেন, ভারতের অধিক জনসংখ্যা এবং ঘন জনবসতি করোনার বিস্তার এবং নতুন ধরন তৈরির জন্য উপযুক্ত। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হোলি উৎসব এবং বর্তমানে চলমান বিধানসভার নির্বাচনে যে জনসমাগম হয়েছে সেখানে কাউকে সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখতে দেখা যায়নি। মাস্কের ব্যবহারও অতি নগন্য। এই অসাবধানতাই ভারতের বর্তমান করোনার ভয়াবহ অবস্থার কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রতিবেশি দেশ হওয়ায় বাংলাদেশেও করোনার এই নতুন ধরন ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি। এ ব্যপারে এখনই সতর্ক হওয়ার উপদেশ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ভারত থেকে আসা লোকদের কঠোর কোয়ারেন্টিনে রাখার পরামর্শ তাদের। বর্তমানে করোনার বিস্তার রোধে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত সাময়িক বন্ধ করেছে সরকার।

