ধনী দেশগুলোর ভ্যাকসিন প্রি-অর্ডার অশনিসংকেত দিচ্ছে

নিউজ ডেস্কঃ

ধনী দেশগুলো নভেল করোনাভাইরাসের দুই বিলিয়ন ডোজ কেনার জন্য প্রতিযোগিতায় নেমেছে, যা কিনা সামনের দিনগুলোতে ভ্যাকসিন সরবরাহকে মারাত্মকভাবে সীমিত করে দিতে পারে। এদিকে স্বল্প ও মধ্য আয়ের দেশগুলো ভ্যাকসিন অর্জনের আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় নিজেদের অবস্থান তৈরির জন্য সংগ্রাম করছে।

বেশির ভাগ বিশেষজ্ঞ বলছেন, ২০২০ সালের শেষ দিকে কিংবা ২০২১ সালের শুরুতে হয়তো ভ্যাকসিন অনুমোদন পাবে। তার আগে অবশ্য কার্যকারিতা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এগুলোকে বিস্তৃতভাবে তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল পার করতে হবে। রাশিয়া এরই মধ্যে ভ্যাকসিনের অনুমোদন দিলেও তারা এখনো তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল সম্পন্ন করেনি।

কিন্তু এর পরও ব্যাপকভাবে ভ্যাকিসন অগ্রিম অর্ডার করার কাজ চলমান আছে। মধ্য আগস্ট পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ছয়টি কোম্পানি থেকে ভ্যাকসিনের ৮০০ মিলিয়ন ডোজ নিশ্চিত করেছে, সঙ্গে প্রায় এক বিলিয়নের বেশি কেনার অপশনও আছে। মাথাপিছু হিসাবে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ক্রেতা হচ্ছে যুক্তরাজ্য, যারা কিনছে ৩৪০ মিলিয়ন ডোজ। যেখানে প্রতিজন নাগরিকের জন্য তারা প্রায় পাঁচটি করে ডোজ কিনছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন যারা কিনা গোষ্ঠীবদ্ধভাবে ভ্যাকসিন কিনছে এবং জাপানও নিজেদের জন্য প্রায় একশ মিলিয়ন ভ্যাকসিন ডোজ নিশ্চিত করেছে।

অগ্রিম ভ্যাকসিন কেনার জন্য এ হুড়োহুড়ি নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা হতাশা ব্যক্ত করেছেন, যারা বারবার সমতার ভিত্তিতে বিশ্বজুড়ে ভ্যাকসিন বিতরণের কথা বলে আসছিলেন। ইন্টারন্যাশনাল এইডস ভ্যাকসিন উদ্যোগের প্রধান মার্ক ফেইনবার্গ বলেন, আমরা মহামারী থেকে মুক্তি পাব না, যদি আমরা সবাই জায়গা থেকে এটা দূর করতে না পারি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিচালক টেড্রোস অ্যাডহ্যানম গেব্রেইসুস বলেন, আমাদের ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদ রোধ করতে হবে।

কোয়ালিশন ফর এপিডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস ইনোভেশনের (সিইপিআই) প্রধান রিচার্ড হ্যাটচেট বলেন, এ পরিস্থিতি ২০০৯ সালের এইচ১এন১ ইনফ্লুয়েঞ্জা প্রাদুর্ভাবের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। যখন ধনী দেশগুলো বেশির ভাগ ভ্যাকসিন সরবরাহের দখল নিয়েছিল।

যদিও ২০০৯ সালের মহামারী কভিড-১৯-এর মহামারীর চেয়ে অনেক মৃদু ছিল। এ বিষয়ে হ্যাটচেট বলেন, যদি কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন ২০০৯ সালের মতো ভুলভাবে বরাদ্দ দেয়া হয়, তবে মহামারী দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকবে। অনেক বেশি লোক মারা যাবে এবং ক্ষয়ক্ষতিও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি হবে।

আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা

ভ্যাকসিন সরবরাহ নিরাপদ করার প্রচেষ্টায় যৌথ তহবিলটিকে বলা হচ্ছে কোভ্যাক্স, যাতে নেতৃত্ব দিচ্ছে গাভি, (জেনেভাভিত্তিক একটি সংগঠন, যারা নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে ভ্যাকসিনের জন্য অনুদান দেয়)। এর সঙ্গে আছে সিইপিআই এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এর লক্ষ্য দুই বিলিয়ন ভ্যাকসিন ডোজ নিশ্চিত করা। এক বিলিয়ন হচ্ছে ৯২টি নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশের জন্য, যা বিশ্বের অর্ধেক জনসংখ্যাকে ঘিরে রেখেছে। এ অঞ্চলগুলোতে ভ্যাকসিন খুব অল্প খরচ কিংবা বিনা মূল্যে পাওয়া যাবে। এছাড়া অন্য এক বিলিয়ন ভ্যাকসিন ৭৫টি ধনী দেশের জন্য, যারা নিজেদের ভ্যকসিনের জন্য অর্থ প্রদান করবে।

কোভ্যাক্স এরই মধ্যে কিছু অর্ডার দিয়ে রেখেছে, যেমন ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ড ও ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি অ্যাস্ট্রাজেনেকার উদ্ভাবিত ভ্যাকসিনের ৩০০ মিলিয়ন ডোজ অর্ডার দিয়েছে তারা।

তবে তারা প্রয়োজনীয় প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার থেকে অনেক দূরে আছে, যা কিনা ডোনারদের কাছ থেকে প্রয়োজন হবে ভ্যাকসিন উৎপাদনকে বৃদ্ধি করতে, যাতে ২ বিলিয়ন ডোজ পাওয়া সম্ভব হয়। কিছু ধনী দেশ যেমন যুক্তরাজ্য কোভ্যাক্সের সঙ্গে যোগ দেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। নিজেদের কার্যক্রমে তারা অনেক কম ধনী দেশকেই পেয়েছে।

কিছু নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশও অবশ্য অগ্রিম কেনার পথে এগিয়ে গেছে। যেমন ব্রাজিল ও ইন্দোনেশিয়া। তারা নিজেদের দেশে তৃতীয় ধাপের ট্রায়ালে থাকা ভ্যাকসিনগুলোর কয়েক মিলিয়ন ডোজ কেনার জন্য চুক্তি করেছে। এদিকে শীর্ষস্থানীয় ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারক সংস্থা দ্য সেরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া (এসআইআই) ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ডের সঙ্গে চুক্তি করেছে প্রতি বছর এক বিলিয়ন ভ্যাকসিন উৎপাদনের জন্য। এগুলো মূলত এলএমআইসিএসকে উদ্দেশ্য করে, যেখানে কোভ্যাক্সের সঙ্গে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ডোজও আছে। যদিও এসআইআই বলেছে, অর্ধেক ডোজ ভারতের জন্য বরাদ্দ থাকবে।

হ্যাটচেট বলেছেন, কোভ্যাক্স কাজ করছে কীভাবে ভ্যাকসিন বরাদ্দ করা যায় তা নিয়ে। যেখানে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর সঙ্গে প্রস্তুতকারকদের দ্বিপক্ষীয় চুক্তিকেও বিবেচনায় রাখছেন তারা। তিনি আশা করেন, দেশগুলো যে চুক্তি সম্পন্ন করেছে তার ব্যাপারে স্বচ্ছতা বজায় রাখবে।

যখন যুক্তরাজ্য দুটি প্রস্তুতকারক কোম্পানির কাছ থেকে ৯০ মিলিয়ন ডোজ কেনার কথা ঘোষণা দিয়েছে, সরকার বলেছে, এ চুক্তি বিশ্বব্যাপী ভ্যাকসিনের সুষ্ঠু ও ন্যায়সংগত প্রাপ্তি নিশ্চিত করবে, যদিও কীভাবে হবে সেটি বলা হয়নি।

সক্ষমতার হিসাব

কোম্পানিগুলোর হিসাব অনুযায়ী যদি সামনের সারিতে থাকা সবগুলো ভ্যাকসিন অনুমোদন লাভ করে তবে ১০ বিলিয়নের বেশি ডোজ ২০২১ সালের শেষ নাগাদ উপলব্ধ হবে। এটি হিসাব করা হয়েছে মূলত প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোর সক্ষমতা অনুসারে। যদিও ভ্যাকসিনোলজিস্ট জেফরি আলমন্ড বলছেন, এ পরিসংখ্যান কিছুটা অতিরঞ্জিত বলেই মনে হচ্ছে। তারা অনুমানে বলছে। কীভাবে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো যায় তা নিয়ে চলমান আলোচনার অনেকগুলো নিয়েই আশাবাদী তিনি।

এয়ারফিনিটি নামে লন্ডনের একটি লাইফ সায়েন্স মার্কেট অ্যানালিস্টিক ফার্মের ধারণা মতে, ২০২০ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে গিয়ে এক বিলিয়ন ডোজ উপলব্ধ হবে। ২০২০ সালের মে থেকে জুন মাসের সিইপিআইয়ের একটি জরিপে ১১৩টি ভ্যাকসিনের উপাদান প্রস্তুতকারক অংশ নিয়েছিল। তাদের হিসাব মতে, ২০২১ সালের শেষ নাগাদ উৎপাদনক্ষমতা দুই থেকে চার বিলিয়ন হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।

এখন কত মানুষ ভ্যাকসিন গ্রহণ করতে পারবে তা নির্ভর করছে কত সংখ্যক ডোজ ভ্যাকসিন প্রদান করা হবে তার ওপর। মডার্না, পিফিজার, নোভাভ্যাক্সসহ অনেক কোম্পানি দুই ডোজের ভ্যাকসিন তৈরি করছে। জনসন অ্যান্ড জনসন ট্রায়াল করতে চাচ্ছে এক ডোজের ভ্যাকসিন।

  •  
  •  
  •  
  •  

Tags: