ঐ দূর পাহাড়ে…
মো. আব্দুর রহমান, বাকৃবি:
সেমিস্টার সমাপনী হয়ে যথারীতি ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। এদিকে শীতের আগমনী বার্তাও চলে এসেছে। এ অবস্থায় কোথাও ঘুরে আসলে মন্দ হয় না। গ্রুপের বন্ধুরা মিলে ঠিক করলাম বিরিশিরি যাবো। যেই কথা সেই কাজ।
শনিবার সকাল ৭টায় সকালের নাস্তা করে ক্যাম্পাস থেকে রওনা দিলাম আমরা ১০জন (আনন্দ, কংগ্রিভ, শুভ, মিজান, তারেক, রূপন, সুকুমার, মুক্তা, তিথি এবং আমি)। ব্রিজ মোড় থেকে সিএনজি করে চললাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বিরিশিরির উদ্দেশ্যে। পথিমধ্যে নাচ, গান আর হইহূল্লোর করতে করতে আমরা পেীঁছে গেলাম সুসং, দুর্গাপুর। বিরিশিরি নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুর উপজেলায় অবস্থিত।
এরপর সেখানে সবাই চা খেয়ে ৫টা রিক্সা ভাড়া করে চললাম বিরিশিরির অপার সৌন্দর্য দেখার জন্য। পথিমধ্যে পেলাম সোমেশ্বরী নদী। সোমেশ্বরী নদীকে বিরিশিরির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মধ্যমণি বলা যায়। চারপাশে পাহাড়ে ঘেরা সোমেশ্বরীর উচ্চতা বাড়ার সাথে সাথে পানির রংও পাল্টায়। আমরা এই নদী নৌকা করে পার হলাম। গ্রীষ্মের মৌসুমে এ নদী হেটে পার হওয়া যায়। সোমেশ্বরী নদীর কোল ঘেঁষেই রানীখং মিশনটি একটি উঁচু পাহাড়ে অবস্থিত। ১৯১০ সালে এ রাণীখং মিশনটি স্থাপিত হয়। যেখান থেকে প্রকৃতিকে আরও নিবিড়ভাবে উপভোগ করা যায়।
নদী পার হয়েই গেলাম বিজয়পুরে অবস্থিত চীনামাটির পাহাড়। বিরিশিরির মূল আকর্ষণ হচ্ছে এই চীনামাটির পাহাড়, যার বুক চিরে জেগে উঠেছে নীলচে-সবুজ পানির হ্রদ। ছোট বড় টিলা-পাহাড় ও সমতল ভূমিজুড়ে প্রায় ১৫ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৬০০ মিটার প্রস্থ এই খনিজ অঞ্চল। খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী ১৯৫৭ সালে এই অঞ্চলে সাদামাটির পরিমাণ ধরা হয় ২৪ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন, যা বাংলাদেশের ৩শ বছরের চাহিদা পূরণ করতে পারে। খনিগুলো থেকে মাটি খনন করায় এসব হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে। সাদা মাটি পানির রঙটাকে যেন আরো বেশি গাঢ় করে দিয়েছে। সবাই মিলে পাহাড়ে উঠলাম, ছবি তুললাম, নিচে নেমে হ্রদের পানিতে নেমে নিজেদের জুড়িয়ে নিলাম। হ্রদের পানি এক জায়গায় সবুজ তো অন্য জায়গায় নীল। গোসল করার কোন প্রস্তুতি নিয়ে যাইনি বলে সকলে আফসোস করলাম। ভাবলাম পরের বার যদি আসি তাহলে শুধু গোসল করার জন্যই আসব।
পাহাড় থেকে নেমে গেলাম পাহাড়ী কালচারাল একাডেমী। এখানকার আধিবাসীদের শতকরা ৬০ ভাগই গারো, হাজং ইত্যাদি নৃগোষ্ঠীর। এখানে আছে টুঙ্কা বিপ্লবের কয়েকটি স্মৃতিস্তম্ভ। গারো ও হাজং ছাড়া প্রায় সবকটি গোষ্ঠীই বাংলা ভাষাভাষি। সেখান থেকে গেলাম সেন্ট যোসেফের গীর্জা। গীর্জাটা বেশ সাজানো গোছানো, নীরব আর খুব সুন্দর। গীর্জার সামনেই রয়েছে যিশুর মূর্তি। এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৯১২ সালে। এখানে কর্তব্যরত সিস্টারা জানালেন প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাস। বিভিন্ন স্থাপনার মধ্যে এখানে রয়েছে যীশু খ্রিস্টের মূর্তি, শিশুদের বিদ্যাপাঠের স্থান ও বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন। সেখান থেকে গেলাম বিজয়পুর ক্যাম্প, যেখানে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিএসএফ) সদস্যরা সীমান্ত রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন। সেখান থেকে ফিরে গেলাম রামকৃষ্ণ মন্দির এবং সব শেষে লোকনাথ মন্দির।
এবার ফেরার পালা। পথিমধ্যে আবার দেখা হলো সোমেশ্বরী নদীর সাথে। শেষ বিকেলের আলোয় নদীর সৌন্দর্য আমাদের সকলকে গ্রাস করে নিচ্ছিল। নয়নাভিরাম পানির ঢেউ টান ছিলো বারবার। দুর্গাপুর ফিরে সবাই মিলে দুপুরের খাবার খেলাম। অত:পর সাদা মাটির দেশকে বিদায় জানিয়ে ক্যাম্পাসে সন্ধ্যার আগেই ফিরে আসলাম। যাবার সময় সকলের মধ্যে যে আনন্দ ছিল তা ফেরার পথে কিছুটা ম্লান হয়ে গেছিলো, শুধমাত্র আবার ফিরে আসার প্রতিক্ষায়।
________________________________________________
লেখক: শিক্ষার্থী
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ-২২০২

