ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অপরাধী মাদকসম্রাট পাবলো এসকোবা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
কলম্বিয়ার মাদকসম্রাট পাবলো এসকোবারকে বলা হয় ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অপরাধী। ধারণা করা হয়, মাদক উৎপাদন ও পাচার করে তিনি ৩০ বিলিয়ন ইউএস ডলারের বেশি অর্থ উপার্জন করেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি তার অর্থ ও ক্ষমতা দিয়ে কলম্বিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন তা দমন করার জন্য পাশের দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা নিতে হয়েছিল এবং কলম্বিয়ান সরকার ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তার সুবিস্তৃত মাদকসাম্রাজ্যের পতন হয়েছিল।

পাবলো এসকোবারের জন্ম ১৯৪৯ সালে এবং মেডেলিনের কাছেই তার বেড়ে ওঠা। মেডেলিনের তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল অস্থিতিশীল; যেখানে হত্যা ও হিংস্রতা ছিল খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। এ রকম পরিস্থিতিতে বেড়ে ওঠা একজন কিশোরের অপরাধের ফাঁদে জড়িয়ে পড়া খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। স্কুল থেকে বহিষ্কার হওয়ার পর তিনি ছোটখাটো অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। মাদক ব্যবসায় তার আগমন খুব কম বয়সেই। মেডেলিনের এক ল্যাবে মাদকের কাঁচামাল বহন করা দিয়ে শুরু হয় তার মাদক ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ততা। তারপর ধীরে ধীরে তিনি নিজেকে নিয়ে যান অন্য এক উচ্চতায়।

প্রথমে বিমানে করে কলম্বিয়া থেকে পানামা হয়ে তার মাদক পাচার হতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। এটি সবচেয়ে নিরাপদ ও ঝুঁকিহীন পথ বিধায় তিনি ১৫টি বিমান কেনেন শুধু মাদক পাচারের জন্য। এমনকি ১টি জেট ও ৬টি হেলিকপ্টার ছিল তার মাদক পরিবহনের জন্য। ধীরে ধীরে একটা সময় তিনি হয়ে ওঠেন মেডেলিনের সবচেয়ে বড় ড্রাগলর্ড। তবে এর আগে মেডেলিনের মাদকসাম্রাজ্য নিজের আয়ত্তে আনার জন্য তিনি ১৯৭৫ সালে মেডেলিনের বিখ্যাত মাদক পরিবাহক ও সন্ত্রাসী ফ্যাবিও রেস্ট্রোপোকে হত্যা করেন।

পাবলোর নেতৃত্বে বিশাল পরিমাণ কোকো পেস্ট যা কোকেন নামক মাদকদ্রব্যের মূল উপাদান তা বলিভিয়ায় অবস্থিত তার ল্যাবগুলোয় সরবরাহ করা হতো এবং সেখানেই কোকেন উৎপাদন করে কলম্বিয়ায় পাঠানো হতো। পরে সেগুলো বিমানে করে পাচার করা হতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। যুক্তরাষ্ট্রে পাচারকৃত কোকেনের আশি শতাংশই ছিল এসকোবারের নিয়ন্ত্রণে। এটি মার্কিন সরকারের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তারা পাবলোর এই সাম্রাজ্য নির্মূল করার জন্য তাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু পাবলো ছিল বেপরোয়া। স্বয়ং কলম্বিয়ান সরকার তার ক্ষমতা ও সাম্রাজ্যকে সমীহ করে চলত।

পাবলো এসকোবার যখন তার সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত সীমায় তখন তিনি কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হওয়ার স্বপ্ন দেখা শুরু করলেন। এজন্য তিনি তার প্রভাব ও অর্থের ব্যবহার করে ১৯৮১ সালে কলম্বিয়ার কংগ্রেসের সদস্যপদ লাভ করেন। কিন্তু তার অপরাধ জনসম্মুখে প্রকাশ হয়ে যাওয়ায় তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। প্রেসিডেন্ট হওয়ার স্বপ্নভঙ্গের পর পাবলো আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠেন। তার হিংস্রতা ও জেদের কারণে কলম্বিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। তিনজন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীসহ হাজারো লোক বিশেষ করে সাংবাদিক, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিচারক, সরকারি কর্মকর্তা তার ত্রাসের শিকার হন। তখন পাবলোকে বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ফোর্বস ম্যাগাজিন তাকে বিশ্বের সপ্তম ধনী হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। তার সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল বিপুল পরিমাণ প্রশিক্ষিত সৈন্য ও সন্ত্রাসী, ব্যক্তিগত চিড়িয়াখানা, কলম্বিয়ার এমন কোনো শহর নেই যেখানে তার অট্টালিকাস্বরূপ বাড়ি ছিল না।

পাবলো ছিলেন একজন বুদ্ধিদীপ্ত অপরাধী। তিনি জানতেন তার সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখা আরও সহজ হবে যদি তিনি সাধারণ মানুষের ভালোবাসা অর্জন করতে পারেন। এজন্য তিনি মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ করে পার্ক, স্কুল, মাঠ, গির্জা এমনকি গরিব ও গৃহহীনদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করেন। তার কৌশল সফলতার দেখা পায়। তিনি কলম্বিয়ার সাধারণ মানুষের কাছে রবিনহুডের খেতাব পান। সাধারণ মানুষের ভালোবাসা আর সমর্থনই মূলত তাকে প্রেসিডেন্ট হওয়ার স্বপ্ন দেখায়।

তবে ধীরে ধীরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ও পাবলোর লাগামছাড়া সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য কলম্বিয়ান সরকার তার বিরুদ্ধে একরকম যুদ্ধ ঘোষণা করে। তার ল্যাবগুলো আটক ও বাজেয়াপ্ত করা হয়। অবশেষে পাবলো ১৯৯১ সালে কলম্বিয়ান সরকারের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন। তখন সরকারের দায়িত্বে ছিলেন প্রেসিডেন্ট সিজার গাভিরিয়া। তবে এটি ছিল নামমাত্র আত্মসমর্পণ।

আত্মসমর্পণের শর্তানুসারে তাকে নিজের জন্য বিলাসবহুল কারাগার বানানোর অনুমতি দেওয়া হয়, যেখানে ক্যাসিনোসহ নাইট ক্লাবও ছিল। এমনকি কারাগারের গার্ড ছিল তার নিজ হাতে বাছাই করা বিশ্বস্ত কর্মচারীরা। ১৯৯২ সালে পাবলো কারাগার থেকে পালিয়ে যান যখন তাকে নিয়মিত কারাগারে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ। এরপর দীর্ঘ ১৬ মাস পাবলোকে খোঁজা হয় কলম্বিয়াজুড়ে।

ধীরে ধীরে তার সাম্রাজ্যের পতন ঘটতে থাকে। তার বিশ্বস্ত লোকগুলো হয় আটক না হয় খুন হতে থাকে। কলম্বিয়া সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়ায় পাবলোর সাম্রাজ্যের পতন। দুটি প্রতিষ্ঠান তাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছিল। একটি হলো সার্চ ব্লক সেটি মার্কিন প্রশিক্ষিত কলম্বিয়ান টাস্কফোর্স এবং ‘লস পেপেস’ নামের একটি ছায়া সংগঠন যা গঠিত হয়েছিল পাবলোর আগ্রাসনের শিকার হয়ে নিহত হওয়া লোকজনের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে। পাবলোর সাম্রাজ্যের শেষের দিকে এ দুটি সংগঠনের প্রভাবে পাবলো, যে কিনা একসময় পৃথিবীর সপ্তম ধনী ব্যক্তি ছিলেন তার অর্থাভাব দেখা দেয়। সব সঙ্গীকে হারিয়ে পাবলো এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পালিয়ে বেড়াতে থাকেন।

অবশেষে ২ ডিসেম্বর, ১৯৯৩ সালে সার্চ ব্লক পাবলোকে খুঁজে পায়, মেডিলিনের একটি সাধারণ বাসায়। দীর্ঘ বন্দুকযুদ্ধের পর ছাদ থেকে পালাতে গিয়ে পাবলো গুলিবিদ্ধ হন এবং সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুবরণ করেন। জঘন্য অপরাধী হলেও কলম্বিয়ার সাধারণ মানুষের অনেকে এখনো তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে তার দাতব্য কাজের জন্য।

  •  
  •  
  •  
  •