অবশেষে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেলেন বীরাঙ্গনা ফুলমতি
জিল্লুর রহমান মন্ডল পলাশ, গাইবান্ধা প্রতিনিধি:
অবশেষে স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেলেন পাকিস্তানী পাকবাহিনীর হাতে নির্যাতীত বীরাঙ্গনা রাজকুমারী রবিদাস ফুলমতি (৭৩)।
মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) ৩৩ তম সভার সোমবার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাজকুমারী রবিদাসসহ আরও ২৬ জন বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দিয়েছে সরকার।
রাজকুমারী রবিদাস ফুলমতি গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর উপজেলা সদরের উত্তরপাড়া গ্রামের মৃত কুশিরাম রবি দাসের স্ত্রী। বর্তমানে তিনি সাদুল্যাপুর উপজেলা শহরের ভূমি অফিসের সামনে রাস্তার ধারে সরকারী খাস জমিতে বসবাস করছেন। তিনি পাঁচ ছেলে-ছেলের বউ ও নাতী-নাতনীকে নিয়ে কোন রকম কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। তবে বড় ছেলে অসুস্থ্য জনিত কারণে ২৭ বছরেই মারা যান। আর একমাত্র মেয়ে তার স্বামীর বাড়িতে রয়েছে।
৪৪ বছর ধরে তিনি খেয়ে না খেয়েও দিনাতিপাত ও সংসার চালাচ্ছেন। বর্তমানে বয়ষের ভারে অনেকটা ন্যুজ্ব হয়ে পড়েছেন। ছোট ছোট রোগের কারণে শেষ বয়সে এখন আর আগের মত হাঁটাচলাও করতে পারেন না তিনি। তবে জীবনের শেষ সময়ে এসে রাষ্ট্রীয় মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেয়ে রাজকুমারী রবিদাস ফুলমতি বেশ আনন্দিত। স্বীকৃতি মেলায় তার পরিবারের লোকজনও খুব খুশি। ফুলমতির পরিবারের লোকজনের মধ্যে এখন অনেকটা আনন্দ বিরাজ করছে।
রাজকুমারী রবিদাস ফুলমতি বলেন, ‘আমি আর কয়দিন বাঁচবো। তারপরেও জীবনের শেষ সময়ে এসে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেয়েছি। এখন মরেও শান্তি পাব। কিছুটা হলেও কলংক দুর হলো। এজন্য তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন’।
তিনি আরও বলেন, ‘আমার ছোট দুই ছেলে মনিরাজ ও সুজনের কোনো কাজ নেই। মনিরাজ চলতি ডিগ্রী ফাইনাল পরীক্ষা দিচ্ছে। জীবনের শেষ সময়ে এসে তিনি ছেলে মনিরাজের জন্য একটি সরকারী চাকুরী চেয়েছেন’।
রাজকুমারী রবিদাস ফুলমতির ছেলে মনিরাজ বলেন, ‘তার মায়ের স্বীকৃতির জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রনালয়, মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর, স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কার্যালয়ের কমান্ডার, ডেপুটি কমান্ডারসহ সংশ্লিষ্টদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। এছাড়া স্থানীয়, জাতীয় পত্র-পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলে তার মাকে নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রচার হয়। এ জন্য তিনি সাংবাদিকদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন’।
তিনি আরও বলেন, ‘বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে মাকে নিয়ে অর্ধহারে-অনাহারে মানবেতর জীবন-যাপন করি। এরমধ্যে কপালে একবার জুটেছিল ২ বান্ডিল ঢেউটিন, নগদ ১০ হাজার টাকা, আর কয়েকবার সম্মননা পুরুস্কার। পাশপাশি এক্সপ্রেশন লিমিটেড কর্তৃক তার মাকে সম্মাননা ও ৫০ হাজার টাকা দেন। বর্তমানে আমাদের সংসারে অভাব-অনাটন চলছে। মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে সামান্য জায়গা থাকলেও তাতে কোন ঘর-বাড়ি নেই বললেই চলে। তবে নিজের একটা চাকুরীর জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবী জানান’।
প্রসঙ্গত: ৭১’এ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে একটি রাতে স্থানীয় এক বিহারীর সঙ্গে হঠাৎ করে পাকিস্তানী পাক বাহিনী ও তাদের সহযোগিরা রাজকুমারী রবিদাস ফুলমতির বাড়িতে প্রবেশ করে। পরে তাকে ঘর থেকে ঠেনে বের করে বাইরে এনে সম্ভাম্যহানী ঘটায় পাকিস্তানী পাক বাহিনীরা। কয়েক দফায় পাক বাহিনীরা রাজকুমারী রবিদাস ফুলমতির সম্ভাম্যহানী ঘটনা ঘটায়। এরপর ১৯৮৮ সালে স্বামী কুশিরাম রবিদাস মারা যান। স্বামী মারা যাওয়ার শোক ও পাকবাহিনীর সদস্যর অমানুষিক নির্যাতনের ক্ষত চিহ্ন নিয়ে আজও বেঁচে আছেন রাজকুমারী রবিদাস ফুলমতি।

