পেয়ারার স্বর্গ রাজ্য বরিশালের ৫৫ গ্রাম
বরিশাল সংবাদদাতা:
বরিশাল, পিরোজপুর এবং ঝালকাঠীতে চাষ হচ্ছে বাংলার আপেল খ্যাত পেয়ারা। এই পেয়ারা পাল্টে দিয়েছে এসব এলাকার ৫৫ গ্রামের চিত্র। প্রতিবছর পেয়ারার মৌসুমে উত্সবমুখর পরিবেশে কেনাবেচা হয়। বসে ভাসমান পেয়ারার হাটও। নদীপথে দেখা মেলে পর্যটকদের। দেশের চাহিদা মিটিয়ে এসব পেয়ারা রফতানি হচ্ছে বিদেশেও।
পেয়ারার রাজ্য:
বরিশাল বিভাগের সর্বত্রই কমবেশি পেয়ারা চাষ হয়। তবে বরিশাল জেলার বানারীপাড়া, ঝালকাঠী জেলার ঝালকাঠী সদর ও পিরোজপুর জেলার স্বরূপকাঠী ঘিরেই মূলত পেয়ারার বাণিজ্যিক চাষ হয়। বানারীপাড়ার ১৬ গ্রামের ৯৩৭ হেক্টর, ঝালকাঠী সদরের ১৩ গ্রামের ৩৫০ হেক্টর, স্বরূপকাঠীর ২৬ গ্রামের ৬৪৫ হেক্টর জমিতে পেয়ারা চাষ হয়। পেয়ারা চাষে এসব গ্রামের কয়েক হাজার পরিবারের দিনবদল হয়েছে।
এসব এলাকার মধ্যে ঝালকাঠীর কীর্তিপাশা, ভিমরুলী, শতদশকাঠী, খাজুরিয়া, ডুমুরিয়া, কাপুড়াকাঠী, জগদীশপুর, মীরকাঠী, শাখা গাছির, হিমানন্দকাঠী, আদাকাঠী, রামপুর, শিমুলেশ্বর গ্রামের বেশিরভাগ অংশ জুড়ে বাণিজ্যিকভাবে পেয়ারার চাষ হয়।
স্বরূপকাঠীর গ্রামগুলোর মধ্যে রয়েছে সঙ্গীতকাঠী, খায়েরকাঠী, ভদ্রানন্দ, বাচ্চুকাঠী, ভাংগুরা, আদাবাড়ী, রাজাপুর, ব্রাহ্মণকাঠী, ধলহার, জিন্দাকাঠী, আটঘর, কুড়িয়ানা, পূর্ব জলাবাড়ি, ইদিলকাঠী, আরামকাঠী, মাদ্রা, গণপতিকাঠী, আতাকাঠী, জামুয়া, জৈলশার, সোহাগদল, আদমকাঠী, অশ্বত্থকাঠী, সমীত, সেহাংগল ও আন্দারকুল।বানারীপাড়ার গ্রামের মধ্যে রয়েছে তেতলা, সৈয়দকাঠী, মালিকান্দা, ব্রাহ্মণবাড়ি, বোয়ালিয়া, জম্বুদ্বীপ, বিশারকান্দি, মরিচবুনিয়া, মুরার বাড়ি, উমরের পাড়, লবণ সড়া, ইন্দির হাওলা, রাজ্জাকপুর, হলতা ও চুয়ারিপাড়।
পেছনে ফেরা:
পেয়ারার রয়েছে ১০০টির মতো প্রজাতি। আমেরিকার নিরক্ষীয় অঞ্চল পেয়ারার আদি জন্মস্থান। পেরু থেকে মেক্সিকো পর্যন্ত এলাকায় দ্রুত বিস্তার ঘটে। ভারত, মেক্সিকো, ব্রাজিল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, বার্মা, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, হাওয়াই, ফিলিপাইন, ফ্লোরিডা প্রভৃতি দেশে ব্যাপকভাবে পেয়ারার চাষ হয়। তবে বরিশালের মাটিতে কিভাবে পেয়ারা চাষ শুরু হয়েছে সেটার সঠিক ইতিহাস জানা যায়নি।
স্থানীয়রা জানান, শত শত বছর ধরেই তারা বংশানুক্রমে পেয়ারার চাষ করছেন। তাদের মতে, প্রায় দু’শো বছর আগে স্থানীয় কালীচরণ মজুমদার ভারতের ‘গয়া’ থেকে এই জাতের পেয়ারার বীজ এলাকায় রোপণ করেন। সেই থেকেই এই অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে পেয়ারা। তবে আগে বিচ্ছিন্ন আবাদ হলেও ১৯৪০ সাল থেকে শুরু হয় পেয়ারার বাণিজ্যিক আবাদ। এই আবাদ ক্রমশ বাড়ছে।
পেয়ারা চাষ:
আষাঢ়, শ্রাবণ এবং ভাদ্র এই তিন মাস পেয়ারার মৌসুম। তবে ভরা মৌসুম শ্রাবণ মাস জুড়ে। এরপর ক্রমশ কমতে থাকে পেয়ারার ফলন। চৈত্র এবং বৈশাখের মধ্যেই পেয়ারা চাষিরা বাগানের পরিচর্যায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। সাধারণত ছোট ছোট খাল বা নালা দিয়ে বাগান মূলভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে। চাষিরা মৃতপ্রায় গাছের ডাল কেটে, মাটি আলগা করে পেয়ারা গাছ আলাদা করে যত্ন নেন। বাগানের চারদিকে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা নালা থেকে মাটি তুলে পেয়ারা গাছের গোড়ায় দেওয়া হয়।
চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পেয়ারা গাছে তেমন কোনো সার দেওয়ার প্রয়োজন নেই। শুধু পরিচর্যাই যথেষ্ট। সারাবছর তেমন কোনো কিছু করার দরকার হয় না। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসেই পেয়ারা গাছে ফুল আসতে শুরু করে। তবে বৃষ্টি শুরু না হলে পেয়ারা পরিপক্ক হয় না। জমি ভালো হলে হেক্টর প্রতি ১২-১৪ মেট্রিক টন পেয়ারা উত্পাদন হয়।
ভাসমান হাট:
ঝালকাঠী জেলা শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে ভিমরুলী গ্রামের আঁকাবাঁকা ছোট্ট খালজুড়ে সারা বছরই বসে ভাসমান হাট। তবে পেয়ারার মৌসুমে হয় জমজমাট বাজার। সপ্তাহের প্রতিদিনই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে কেনাবেচা।
ভিমরুলী হাট খালের একটি মোহনায় বসে। তিন দিক থেকে তিনটি খাল এসে মিশেছে এখানে। অপেক্ষাকৃত প্রশস্ত এ মোহনায় ফলচাষীরা নৌকা বোঝাই ফল নিয়ে ক্রেতা খুঁজে বেড়ান। ভিমরুলীর আশপাশের সব গ্রামেই ভরপুর পেয়ারা বাগান। এসব বাগান থেকে চাষীরা নৌকায় করে সরাসরি এই বাজারে পেয়ারা নিয়ে আসেন।
এছাড়া আতাকাঠী, ডুমুরিয়া, গণপতিকাঠী, শতদশকাঠী, রাজাপুর, মাদ্রা, আদমকাঠী, জিন্দাকাঠী, বর্ণপতিকাঠী, আটঘর, কুড়িয়ানা, আন্দাকুল, রায়ের হাট, ব্রাহ্মণকাঠী, ধলহার, বাউকাঠীতেও পেয়ারার হাট বসে।
পেয়ারা যায় বিদেশে:
দেশের চাহিদা মিটিয়ে বরিশালের পেয়ারা যায় ব্রাজিল, পর্তুগাল, কলম্বিয়া, মেক্সিকো, মালয়েশিয়াসহ আরো অনেক দেশে। তবে স্থানীয়দের হাতে ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নেই। ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং সিলেটের গুটিকয়েক ব্যবসায়ীই এই লাভজনক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। রায়ের হাটে পেয়ারার পাইকারী ব্যবসায়ী মিরাজ জমাদার জানান, প্রতিবছর মৌসুমের সময় দিনে ৫-৭ মন পেয়ারা সিলেটে পাঠাই। সেখান থেকে পেয়ারা যায় বিদেশে।
বিদেশের বাজার শুধু নয়, দেশীয় বাজারেও রসালো এই পেয়ারার চাহিদা অত্যাধিক। চাঁদপুর, কুমিল্লা, নোয়াখালী, ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রামে মৌসুমের সময় প্রতিদিন শত শত ট্রলার, নৌকা, ট্রাকে করে পেয়ারার চালান নিয়ে যায় ব্যবসায়ীরা।
সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেই:
প্রায় বছরই পেয়ারার ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার কারণে হাজার হাজার চাষী মুনাফা বঞ্চিত হচ্ছেন। চাষীরা জানান, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগ থাকলে মৌসুমি এ ফল পেয়ারা বছরজুড়ে ভোক্তাদের চাহিদা মেটাতে পারত। এ থেকে উত্পাদিত জ্যাম-জেলি দেশি বাজারে চাহিদা পূরণ করে বিদেশেও রফতানি করা সম্ভব হতো। তবে এ অঞ্চলে পেয়ারা সংরক্ষণের জন্য গড়ে উঠেনি কোন হিমাগার বা জেলি তৈরির কারখানা।
চাষিদের যতো দুঃখ:
প্রতিবছর পেয়ারা ফলন ভালো হয়। তবে পেয়ারা চাষীদের দুঃখ যেনো যায় না। স্থানীয় চাষিরা জানান, প্রতিবছর মৌসুমের সময় পেয়ারার দাম পড়ে যায়। বাগানে অনেক সময় প্রতি মণ পেয়ারা ৪০ টাকা মণ দরেও বিক্রি হয়। সাধারণত দর ভালো থাকলে বাগানে পেয়ারার মণ ১০০ থেকে ১৮০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। ভাদ্রের দিকে ফলন কমে গেলে ২৫০ টাকা পর্যন্ত এই দর ওঠে। তবে বাগান থেকে মোকামের মধ্যে পার্থক্য প্রচুর। আগস্টের প্রথম দিকে বাগানে ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা দরে পেয়ারার মন হলেও মোকামে তা ২২০ থেকে ২৫০ টাকা দরে বিক্রি হয়। খুচরা ব্যবসায়ীরা ২২০ থেকে ২৫০ টাকা দরে পেয়ারা কিনে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা মন দরে শহরে খুচরা বিক্রি করে থাকে। বাগান থেকে ভোক্তা পর্যন্ত ৩ হাত ঘুরে ১০ গুণ বেশি দামে পেয়ারা কিনে খেতে হয়।
মুক্তিযুদ্ধে পেয়ারা বাগান:
মুক্তিযুদ্ধে বরিশাল অঞ্চলের স্বরূপকাঠী-ঝালকাঠী ও বানারীপাড়ার ৩৬টি গ্রামের পেয়ারা বাগানের ভূমিকা রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে এসব পেয়ারা বাগানে মুক্তিযোদ্ধারা ঘাঁটি গড়ে তোলে ও বহু অপারেশন চালায়। ১৯৭১ সালে পেয়ারা বাগানের ৩৬ গ্রামে যাতায়াত বলতে ছিল একমাত্র নৌকা। দুর্গম যাতায়াতের কারণে এখানে বসে নিরাপদে থেকে অপারেশন চালানো সহজ ছিল।


