‘হাবু ধান’ বিঘায় ৩৫ মণ, লাভবান হচ্ছে কৃষক

যশোর সংবাদদাতা:
যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার পাইকপাড়া এলাকার কৃষক সত্যজিৎ বিশ্বাস হাবু (৪০)। তার চাষ করা ধানটি জনপ্রিয়তা পেয়ে নাম হয়েছে ‘হাবু ধান’। এ ধান চাষে বিঘায় (৫০ শতক) ৩০ থেকে ৩৫ মণ ধান পাচ্ছেন তিনি ও অন্যান্য কৃষকরা। ফলে এলাকায় ‘হাবু ধান’ চাষ ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এ ধানের সুনাম ছড়িয়ে পড়ায় যশোরের বাইরের কৃষকরাও আসছেন বীজ কিনতে।

এ ধান চাষের ইতিহাসের খোঁজ করতে গিয়ে জানা যায়, বছর পাঁচেক আগে ভারতের রাজস্থানে বেড়াতে গিয়েছিলেন কৃষক সত্যজিৎ বিশ্বাস হাবু। ফেরার সময় সঙ্গে এনেছিলেন ‘অচেনা’ জাতের ধানের চারটি ছটা। কৌতুহলবশত তিনি সেই ধানের বীজ জমির এক কোণায় বপণ করেন। এক সময় তিনি দেখতে পান ধানগাছে অবিশ্বাস্য রকমের ছড়া। ফলনও যেকোনও ধানের চেয়ে বেশি। এরপর সেই ধান থেকে বীজ এবং পরে ৩০ শতক জমিতে চাষ করেন। ধান ঘরে তুলে মেপে দেখেন ২৪ মণ।

এর পর থেকে আর পেছনে ফেরেননি তিনি। এখন শুধু হাবু নন, এ জাতের ধানের ফলন দেখে রীতিমত বিস্মিত প্রতিবেশীরাও। এরপর গ্রামের কৃষকরা হাবুর কাছ থেকে অচেনা এ ধানের বীজ সংগ্রহ করে চাষ শুরু করেন। অন্যান্য ধানের চেয়ে ফলন বেশি হওয়ায় খুশি হন কৃষকরা। আর তখন থেকেই স্থানীয় কৃষকরা ‘অচেনা’ এ ধানের নাম দেন ‘হাবু ধান’। এরপরের কাহিনী ইতহাসের মতো। টানা চার বছর ধরে ‘হাবু ধান’ চাষ বিস্তৃত লাভ করেছে গোটা বাঘারপাড়া উপজেলাজুড়ে।

মাঠ থেকে হাবু ধান নিয়ে বাড়ি ফিরছেন কৃষক কালীপদপাইকপাড়া গ্রামের ষাটোর্ধ কৃষক কালীপদ বিশ্বাস বলেন, ‘চার বছর ধরে হাবু ধান চাষ করছি। ফলন ভাল পাচ্ছি। দামও বেশি।’ তিনি আরও জানান, ‘হাবু ধান চাষে বিঘায় (৫০ শতক) ৩০ থেকে ৩৫ মণ ধান পাওয়া যায়। গত বছর প্রতিমণ ১ হাজার ১০ টাকা দরে এ ধান বিক্রি করেছিলাম। যা অন্যান্য (জিরা মিনিকেট ব্যতীত) ধানের চেয়ে ৩শ’/৪শ’ টাকা বেশি।’

কালীপদ বিশ্বাসের স্ত্রী অমেলা রাণী বলেন, ‘হাবু ধানের ভাত খুবই সুস্বাদু। দেখতে অনেকটা পোলাওয়ের চালের মতো।’

কড়াইতলা গ্রামের মধ্যবয়সী কৃষক সাগর হোসেন জানান, ‘গত ৩/৪ বছর ধরে আমি প্রায় ৭/৮ বিঘা জমিতে হাবু ধান চাষ করছি। এবারও একই পরিমাণ জমিতে হাবু ধান চাষ করেছি। কারণ অন্যান্য জাতের ধানের তুলনায় হাবু ধানের ছড়ায় ধানের দানার সংখ্যা থাকে বেশি।’ তিনি আরও বলেন, ‘অন্যান্য ধানের ছড়ায় ২শ’/৩শ’ দানা মিললেও হাবু ধানের ছড়াগুণে পাওয়া গেছে ৪৫০ থেকে সাড়ে ৫শ’ দানা।’

কৃষক কালীপদ ও সাগরের মত রায়পুর ইউনিয়নের কয়ালখালি গ্রামের মনিরুজ্জামানও তিন বছর ধরে হাবু ধান চাষ করছেন। এবারও তিনি ২ বিঘা জমিতে এ ধানের চাষ করেছেন। তিনি বলেন, ‘সার, কীটনাশক ও সেচ খরচ মিলে তার বিঘা প্রতি প্রায় ৭ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।

পাইকপাড়া গ্রামের তরুণ কৃষক লিটন বিশ্বাস জানান, ‘গেল বছর নওগাঁ থেকে কয়েকজন ব্যবসায়ী তার কাছে এসেছিলেন হাবু ধানের বীজ কিনতে। তাদের কাছে ১ লাখ ৯০ হাজার টাকার ধানবীজ বিক্রি করেন তিনি।’

ধান মাড়াইয়ে ব্যস্ত কৃষক হাবু ও তার স্ত্রীএদিকে কৃষকরা অভিযোগ করেন, ‘কৃষি অফিস থেকে এ ধান চাষে প্রয়োজনীয় কোনও পরামর্শই পান না তারা। পরামর্শ চাইলে তাদের বলা হয়, এ ধানের অনুমোদন নেই। তাই পরামর্শ দেওয়া যাবে না। ফলে বাধ্য হয়ে ‘অনুমান’ করে ওষুধ ব্যবহার করতে হয় কৃষকদের।’

এ বিষয়ে দরাজহাট ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মায়া মিনা খাতুন বলেন, ‘কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হয় না-এটা ঠিক না। আমরা প্রতিনিয়ত রোগ পরিচর্যা বিষয়ে কৃষকদের পরামর্শ দিয়ে থাকি। এ ক্ষেত্রে নাটিভো নামক একটি ছত্রাকনাশক ওষুধ স্প্রে করার পরামর্শ দেওয়া হয় তাদের।’

আরেক উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা বিজন কুমার বলেন, ‘বাইরের জাত হওয়ায় এ ধান সম্পর্কে জানা না থাকায় পরিচর্যার বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না।’

বাঘারপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জাহিদুল করিম বলেন, ‘এ ধানের জাত সম্পর্কে কিছু জানি না। তবে এ ধানের নমুনা শস্য কর্তন করে পরীক্ষা করে দেখেছি। চিকন ও ফলন ভালই। দামও বেশি। কৃষক লাভবানও হচ্ছে।’

  •  
  •  
  •  
  •  

Tags: