শিম চাষে বেকার আবদুল হামিদের ভাগ্য বদল
পাবনা প্রতিনিধি:
ঈশ্বরদী উপজেলা বাংলাদেশের এক বৈচিত্র্যময় কৃষিসমৃদ্ধ অঞ্চল। বাংলাদেশে কৃষির বিভিন্ন খাতে রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত প্রায় ১০-১২ জন কৃষক/খামারির বাস ঈশ্বরদীতে। এসব বিখ্যাত কৃষক ও খামারিদের সংস্পর্শে কৃষির সাথে সাথে ঈশ্বরদীর অনেক কর্মহীন, ভূমিহীন, বেকার যুবক যুবতীর জীবনও বদলে গেছে। এমনই একজন বেকার যুবকের বদলে যাওয়া জীবনের গল্প শুনতে গিয়েছিলাম মুলাডুলি ইউনিয়নের মুলাডুলি গুদামপাড়া গ্রামে। আসুন তাহলে শুনি এবার তার সংগ্রাম ও সাফল্যের কাহিনী।
বেকার, ভূমিহীন হামিদ। পরিবারের একমাত্র ছেলে সন্তান সে এবং বাকি তিনজন বোন। বসতবাড়ি ছাড়া হামিদের বাবার আর কোন জমি ছিল না। তুলনামূলক ছোট পরিবার। গরীব বাবার অনেক আশা ও স্বপ্ন ছিল একটা মাত্র ছেলেকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করবেন। ছেলে বড় চাকুরি করবে। কিন্তু সবার সব আশা তো আর পূরণ হয় না। যাই হোক গ্রামের স্কুলের পড়া পাশ করে আর হামিদের লেখাপড়া হয়নি। আমাদের দেশে এ রকম একটা পরিবারের একজন ছেলের শ্রম বিক্রি ছাড়া তখন আর কি ই বা করার থাকে। কিন্তু হামিদ শ্রম বিক্রি না করে প্রথমে ১ বিঘা জমি লিজ নিয়ে কৃষি কাজ শুরু করেন।
এটা ২০০৪-২০০৫ সনের কথা। এই অঞ্চলে অনেক বড় বড় কৃষক অন্যের শত শত বিঘা জমি বার্ষিক চুক্তিতে একটা নির্দিষ্ট হারে মূল্য নির্ধারণ করে লিজ নিয়ে আবাদ করে থাকেন। প্রথমবারে হামিদের লিজের টাকা পরিশোধ করে সামান্য লাভ হয়। পরের বছর তিনি আরো দুই বিঘাসহ মোট তিন বিঘা জমিতে শিম লাগান এভাবে বাড়তে বাড়তে এই বছরে তার ১০ বিঘা জমিতে শিমের আবাদ ছিল। প্রতি বিঘা জমির লিজের মূল্য ১৪ হাজার টাকা।
তিনি জানান জমি তৈরি, সার, কীটনাশক, শ্রমিক খরচ ইত্যাদি উৎপাদন খরচ বাবদ প্রতি বিঘা জমিতে খরচ হয় ২৫-৩০ হাজার টাকা এবং গড়ে এক বিঘা জমিতে ৫৫-৬০ মণ শিম পাওয়া যায় এ হিসেবে শিম বিক্রয় হয় ৮০-৮৫ টাকা এবং গড়ে প্রতি বিঘা জমিতে ৪৫-৫০ হাজার টাকা নীট লাভ হয়। আমার সাথে যে সময়ে তার সাথে হয় সে সময়ে তার ক্ষেতের প্রায় ৭০ ভাগ প্রোডাকশন শেষ হয়ে গেছে। ভালো দামের আশায় তিনি তার প্রায় জমিতে আগাম জাতের শিমের আবাদ করেন। তিনি খাতা-কলম ছাড়াই মুখে মুখে হিসেব কষে বলেন, এ বছরে তার নীট লাভ হবে প্রায় ৪-৫ লাখ টাকা।
গত বছর তিনি তিন ধরনের জাতের শিম আবাদ করেছেন- ১. অটো শিম ২. পুঁটি শিম ও ৩. রুপভান জাতের শিম। তবে বেশিরভাগই ছিল অটোশিম। অটো ও রুপভান জাতের শিমের ফলন বেশি হয় এবং তুলনামূলকভাবে রোগবালাই কম হয় এবং পুঁটি জাতের শিমের ফলন কম হয় তবে রোগবালাই বেশি হয় বলে পরিচর্যা বেশি করা লাগে। অটো ও রুপভান জাতের ফলন যেখানে ৬০ মণ সেখানে পুটি জাতের শিমের ফলন হয় ৩৫-৪০ মণ। অটো ও রুপভান শিম আকারে বড় এবং সবুজ রঙের এবং পুটি শিম সাদা রঙের ও আকারে ছোট। পুঁটি শিমের বিঘাপ্রতি ফলন কম হলেও গ্রাহক চাহিদা এবং দাম বেশি বলে তিনি জানান। স্থানীয়ভাবে যে নামে পরিচিত এরকম আরো অনেক জাতের শিমের নাম শোনালেন হামিদ। সরু লম্বা একটা শিম দেখিয়ে তিনি বললেন- এটা কাকিলা জাতের শিম এবং নাবি জাতের এই শিমের বাজারমূল্য অন্যান্য শিমের দামের প্রায় দেড়গুণ।
বারি শিম১, বারি শিম২, ইপসা শিম১, ইপসা শিম২ ইত্যাদি এসব বইয়ের ভাষার শিমের জাতের সাথে এখানকার কৃষকরা শিমের জাতের যে নাম বলেন তার অনেকগুলোরই নাম মিলে না। জাতের নামে কি যায় আসে আমরা চাই ভালো উৎপাদন, কৃষক এবং গ্রাহকের লাভের বিষয়টি। আমি আগেই উল্লেখ করেছি এই এলাকার কৃষকরা সৃজনশীল, অভিজ্ঞ ও পরিশ্রমী। মুলাডুলি ইউনিয়নের বেশিরভাগ জমি নিচু বলে বর্ষাকালে পানির নিচে ডুবে থাকে। এ জন্য জমি জো আসবে তারপর শিমের বীজ রোপণ করা হবে এ সময় পর্যন্ত এখানকার কৃষকরা অপেক্ষা করেন না। নিচু জমিতে পানির মধ্যে সারিবদ্ধভাবে মাটির ডিবি তৈরি করে জমি প্রস্তুতি শুরু করেন এবং বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে বীজ বপন করেন। আষাঢ়-শ্রাবণ মাসেও বীজ বপন করা যায় তবে তা শিমের জাতের ওপর ভিত্তি করে।
অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া জানা মানুষের এই সমাজে ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য কোন চাকুরি নাই। ছোট-খাট ব্যবসা আর শ্রম বিক্রি বা দিন মজুরি ছাড়া উপায় থাকে না। কিন্তু আব্দুল হামিদ এসব পথে না যেয়ে আমাদের কৃষ্টি ও ঐতিহ্যের মাঝেই বেঁচে থাকার অবলম্বন খুঁজেছেন এবং তিনি পেরেছেন। অন্যের জমি লিজ নিয়ে শিম চাষ শুরু করে তিনি আধাপাকা একটা বাড়ি করেছেন। তার বাড়িতে বর্তমানে ৮টি গরু রয়েছে এর মধ্যে ৩টি দুধালো গাভী। ২৫ কাঠা জমি কিনেছেন। তিন বোনের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর বৃদ্ধ বাবা-মা ও দুই ছেলে-মেয়ে সহ তার পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৬ জন। ছোট্ট সংসারের ছোট ছোট আশা পূরণের স্বপ্ন বীজ বুনেছেন মনে, দুই ছেলে-মেয়েকে অনেক লেখাপড়া করাবেন যতদূর সম্ভব।
অদম্য ইচ্ছা, মনোবল, কর্মস্পৃহা আর পরিশ্রম একজন মানুষকে অনেক বড় কিছু করতে না পারলেও ভালোভাবে বেঁচে থাকার, সমাজের মর্যাদা নিয়ে থাকার রসদ ঠিকই জোগায়। ভূমিহীন, কর্মহীন নিরূপায় যুবক হামিদ এ সমাজের এমন একজন দৃশ্যমান দৃষ্টান্ত। আব্দুল হামিদ’রা শুধু নিজেরা একাই এগিয়ে যাবে না; আমি, আপনি, সমাজ ও দেশও তার সাথে এগিয়ে যাবে, এগিয়ে যাক স্বপ্নপূরণের দিকে।

