দিনাজপুরে লিচু খেয়ে ১৩ শিশু’র মৃত্যু: আমেরিকান জার্নালে গবেষণা প্রতিবেদন

শাহ্ আলম শাহী,দিনাজপুর থেকেঃ

পাঁচ বছর আগে দিনাজপুরে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে ১৩ শিশুর মৃত্যুর জন্য লিচু বাগানে ছিটানো কীটনাশক ও রাসায়নিককে দায়ী করা হয়েছে আমেরিকান জার্নাল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড হাইজিনে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, লিচু বাগানে ‘মাত্রাতিরিক্ত ও অনিয়মতান্ত্রিকভাবে’ প্রয়োগ করা কীটনাশক এবং অন্যান্য রাসায়নিকে একিউট এনসেফালিটিস সিনড্রোম (এইএস) ঘটতে পারে, যাতে মস্তিষ্ক ফুলে- প্রদাহে মৃত্যু হতে পারে।
আমেরিকান জার্নাল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড হাইজিনে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে লিচু খেয়ে শুধু ওই ১৩ শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় নয়,গত বছরে দিনাজপুরে লিচু খেয়ে অসুস্থ্য হয়ে ২৪ শিশুর মুত্যু হয়েছে। সেই সাথে এখনও অসুস্থ্য ও মাসসিক ভারসাম্য হারিয়ে জীবন যাপন করছে বেশ কয়েকজন শিশু। তার মধ্যে বিরল উপজেলার যশোরাল গ্রামের জালাল হোসেনের আট বছরের ছেলে সুজন হোনের। পাঁচবছর আগে (২০১২ সালে) লিচু খেয়ে অসুস্থ হওয়ার পর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও এখনও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি সে। মাঝে মাঝেই আবোল-তাবোল বকাবকি করে ছোট এই শিশুটি। অনেক সময় ছটফট করে মাথার যন্ত্রণায়।
আমেরিকান জার্নাল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড হাইজিনে প্রকাশিত ওই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,বিষাক্ত রাসায়নিকের প্রভাবেই ২০১২ সালে ওই শিশুদের মৃত্যু হয়েছিল। এর সপক্ষে আরো প্রমাণ হিসেবে দিনাজপুরেই ২০১৫ সালের জুনের দিকে কয়েকদিনের ব্যবধানে দেড় থেকে ছয় বছর বয়সী ১১ শিশুর মৃত্যু এবং অসুস্থ হয়ে আরও ১২ শিশুর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার কথা উঠে এসেছে গবেষণায়।এসব ঘটনায় মৃত শিশুদের রক্ত ও লিচু পরীক্ষায় বিষাক্ত কীটনাশকের অস্তিত্ব পাওয়ার কথা বাংলাদেশের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) গবেষকরাও জানিয়েছিলেন।
নতুন এই গবেষণায় বলা হয়, দিনাজপুরের ওই সব লিচু বাগানে এনডোসালফানসহ বিভিন্ন শক্তিশালী কীটনাশক ব্যবহার করা হয়েছিল। বিষক্রিয়ায় মারা যাওয়া শিশুদের অনেকে নিয়মিত এসব লিচু বাগানে খেলাধুলা করত।

lichi dina

প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের প্রায় ৮০টি দেশে এনডোসালফান ব্যবহার নিষিদ্ধ হলেও বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রসহ গুটিকয়েক দেশে সীমিত আকারে এটির ব্যবহার অনুমোদিত ছিল। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রেও ওই কীটনাশক নিষিদ্ধ হয়। বাংলাদেশেও ২০১৪ সাল থেকে নিষিদ্ধ রয়েছে। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, সচেতনতার অভাবে বাংলাদেশের কৃষকদের মধ্যে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের প্রবণতা রয়েছে। এছাড়া স্বাস্থ্য সমস্যা এড়াতে কীটনাশক প্রয়োগ ও ফল আহরণের মধ্যে যে সময়ের ব্যবধান থাকতে হয় সে বিষয়ে তাদের ধারণা নেই।
প্রকাশিত নিবন্ধের প্রধান লেখক আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রের (আইসিডিডিআর,বি) বিজ্ঞানী ম. সাইফুল ইসলাম বলেন, আমাদের অনুসন্ধানে বলছে, বাংলাদেশে মৃত্যুর ঘটনায় বীজ সম্ভবত দায়ী নয়, যেহেতু এখানে লিচুর বীজ কেউ খায়নি।
এদিকে সরজমিনে দেখা গেছে,আটবছর বয়সের শিশু সুজন হোসেন পাঁচবছর আগে (২০১২ সালে) লিচু খেয়ে অসুস্থ হওয়ার পর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও এখনও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি সে। মাঝে মাঝেই আবোল-তাবোল বকাবকি করে ছোট এই শিশুটি। অনেক সময় ছটফট করে মাথার যন্ত্রণায়। দিনমজুর বাবা জালাল হোসেন জানালেন,পক্ষাঘাতগ্রস্ত হওয়া তার শিশু’র চিকিৎসা করানোর ক্ষমতাও তেমন নেই তার। সুজন হোসেন দিনাজপুরের বিরল উপজেলার যশোরাল গ্রামের জালাল হোসেনের ছেলে। চার ভাই বোনের মধ্যে দ্বিতীয় সে। দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে বাড়ির পার্শ্ববর্তী ঝাড়পুকুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।পাঁচবছর আগে লিচু খেয়ে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়ে সে। তখন বয়স ছিল মাত্র ৩ বছর। দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৭ দিন ধরে চিকিৎসার পর বাড়ি ফিরে যায়। সে সময় লিচু খেয়ে দিনাজপুরে ১৪ জন অসুস্থ হওয়ার পর একমাত্র সুজন হোসেনই মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যায়। মারা যায় বাকি ১৩ জন ভাগ্যহত শিশু। কিন্তু সুজন বেঁচে গেলেও এখনও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি বলে জানান তার পরিবারের লোকজন ও স্বজনরা।
বিরল উপজেলার যশোরাল গ্রামে সরজমিনে গিয়ে কথা হয় সুজনের বাবা দিনমজুর জালাল হোসেন সাথে। তিনি জানান, মাঝে মাঝেই মাথা গরম হয়ে আবোল তাবোল বকাবকি করে সুজন। অনেক সময় মাথার যন্ত্রণায় ছটফট করে। কিন্তু ছেলের এই অবস্থায় উন্নত চিকিৎসা করানোর সামর্থ্যও নেই তার।

জালাল হোসেন জানান, এই লিচুই যে তার সস্তানের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে-এমন জানলে কখনই সেই লিচু তার ছেলেকে খাওয়াতেন না। বাজার থেকে কম দামে গাছের ঝড়া লিচু কিনে এনে তিনি তার সন্তানকে খাইয়েছিলেন। এই প্রতিবেদকের কাছ থেকে যখন তিনি জানতে পারেন, লিচুতে বিষাক্ত কীটনাশকই তার সন্তানের এই অবস্থার জন্য দায়ী। তিনি তার সন্তানের জন্য বাগান মালিকদের দায়ী করে সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করেন।
বিষাক্ত লিচু খেয়ে ওই বছরের (২০১২ সাল) ৬ জুন থেকে ২০ জুন পর্যন্ত দিনাজপুর জেলায় মোট ১৩ জন শিশুর মৃত্যু হয়। এরা হলো বিরল উপজেলার মহেশপুর গ্রামের মো. সোহাগের মেয়ে সায়লা (৬), রামপুর গ্রামের কামরুল ইসলামের ছেলে নুর কিবরিয়া (৪), মাধববাটী গ্রামের মানিক চন্দ্র রায়ের মেয়ে তাপসী রানী রায় (২ বছর ৬ মাস), রুনিয়া গ্রামের তৈবুর রহমানের মেয়ে তাসমিমা (১০), দিনাজপুর সদর উপজেলার সুন্দরবন গ্রামের বাবুল হোসেনের ছেলে বোরহান (২), পারগাঁও গ্রাামের হেপনা সরেনের ছেলে নয়ন সরেন (২), আকবরপুর গ্রামের ধলা বাবু রায়ের ছেলে ধনঞ্জয় রায় (৬), বড়ইল গ্রামের নিশিত রায়ের মেয়ে সুবর্না রায় (৫), চিরিরবন্দর উপজেলার কৃষ্ণপুর গ্রামের মার্কুশ-এর ছেলে সাগর (৪), একই উপজেলার কাসের আহমেদের মেয়ে নার্গিস (৬), খানসামা উপজেলার চককাঞ্চনপুর গ্রামের মো. শাহজাহানের ছেলে আজিজুল ইসলাম (৬) এবং একই উপজেলার রামনগর গ্রামের রঞ্জন দাসের ছেলে রিপন দাস (১০)।

একই ঘটনায় ২০১৫ সালে দিনাজপুর জেলায় মারা যান আরও ১১ শিশু। এরা হলো- বীরগঞ্জ উপজেলার ফুলকুমার (২), শামীমা (৫), স্বপন (৬) ও মামুন (৫), বিরল উপজেলার মিলন (১৮ মাস), সামিউল (৩) ও সাকিব (৩), খানসামা উপজেলার রিমি (৪), চিরিরবন্দর উপজেলার আবু সায়েম (৪), কাহারোল উপজেলার ইয়াসমিন (৫) এবং পার্বতীপুর উপজেলার জেরিন (৫)।
বীরগঞ্জ উপজেলার ধোপাপাড়া গ্রামের মো. রবিচান জানান, তার ছয়বছর বয়সের শিশু স্বপন লিচু খেয়ে মারা যান। তিনি লিচু গাছে ক্ষতিকারক এই কীটনাশক প্রয়োগকারীদের তার শিশু হত্যাকারী হিসেবে উল্লেখ করে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন। একই কথা জানান, বীরগঞ্জের দাসপাড়া গ্রামের ফুলকুমারের বাবা গজেন দাস।

এদিকে দিনাজপুরের বিরল উপজেলার লিচুখ্যাত এলাকা মাধববাটী, সদর উপজেলা মাসিমপুর,দশমাইল, বীরগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় লিচুর বাগানকে ঘিরে বেশ কয়েক বছর ধরেই গড়ে উঠেছে কীটনাশকসহ বিভিন্ন ওষুধের দোকান।

সরেজমিনে এসব দোকানে গিয়ে দেখা যায়, তারা দোকানে যেসব কীটনাশক রেখেছে, সেগুলো হলো-ফাইটার, ক্যারোটে, যুবাস, রিভা, এমিস্টার টপসহ ইত্যাদি কীটনাশকগুলো। কিন্তু এসব কীটনাশকের বোতলের গায়ে কোন কোন উপাদান দিয়ে তৈরি তা উল্লেখ নেই।

বিরল উপজেলার সদরের কীটনাশক ব্যবসায়ী জুয়েল এবং রামপুর হাটের কীটনাশক ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম জানান, তারা শুধুমাত্র অনুমোদিত কীটনাশকগুলোই বিক্রি করে থাকেন। তিনি জানান, লিচুর মৌসুমে তাদের যে হারে কীটনাশক বিক্রি হওয়ার কথা সে তুলনায় তাদের বিক্রি হয় না। তিনি জানান, কিছু কিছু বাগান মালিক চোরাই পথে আনা বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন কীটনাশক প্রয়োগ করে থাকেন। এসব কীটনাশকের বোতলে কোনো লেভেল থাকে না বলে জানান তিনি।
এ ব্যাপারে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক গোলাম মোস্তফা জানান, লিচু খেয়ে শিশু মৃত্যুর ঘটনার পর তারা লিচু বাগানগুলোতে কী কী কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে এবং তা নিয়ম মেনেই করা হচ্ছে কি না-তা মৌসুম সময়ে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হয়। এ ছাড়াও কৃষকদের এ ব্যাপারে প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করেছেন তারা।

  •  
  •  
  •  
  •  

Tags: