সাড়া ফেলেছে আবদুল লতিফের ভেষজ বালাইনাশক
জিল্লুর রহমান পলাশ, গাইবান্ধা প্রতিনিধি:
নিজ ইচ্ছা শক্তি ও আধুনিক চিন্তা-ধারাকে কাজে লাগিয়ে গাইবান্ধার আবদুল লতিফ দেশিয় গাছ, লতাপাতা ও কান্ড দিয়ে উদ্ভাবন করেছেন ব্যতিক্রমধর্মী ভেষজ বালাইনাশক কিটনাশক। বাজারের চড়ামূল্যের রাসায়নিক কিটনাশকের পরিবর্তে স্বল্প দামের এই ভেষজ বালাইনাশক কিটনাশক ব্যবহারে ক্ষতিকর পোকা মাকড়, রোগ বালাই ও বিভিন্ন ধরণের মড়ক থেকে রক্ষা পাচ্ছে সবজি-ফসলের জমি।
এদিকে, ভেষজ বালাইনাশক কিটনাশক ব্যবহারে বিষমুক্ত সবজি ও ফসল উৎপাদনে লাভবান হচ্ছেন কৃষকরা। ইতোমধ্যে আবদুল লতিফের উদ্ভাবিত ভেষজ বালাইনাশক কৃষকের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। পাশাপাশি উৎপাদিত ভেষজ বালাইনাশক কিটনাশক ব্যবহার করে ভাল ফলনে আর্থিক লাভে কৃষকের মুখে হাঁসি ফুটে উঠেছে।
আবদুল লতিফ (৪০) জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কাটাবাড়ী ইউনিয়নের বোগদা গ্রামের আব্দুল লতিফের ছেলে। তিনি এসএসসি পাশের পর কারিগরি শিক্ষার প্রতি আকৃষ্ট হন। পাশাপাশি ফসলি জমিতে বর্তমান বাজারের চড়ামূল্যের রাসায়নিক কিটনাশকের পরিবর্তে ভেষজ কিটনাশক উদ্ভাবিত ও তার ব্যবহার নিয়ে ভাবতে থাকেন। একপর্যায়ে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে তিনি কৃষি কাজে মনোযোগী হয়ে পড়েন।
নিজের একান্ত প্রচেষ্টা আর ইচ্ছা শক্তি দিয়ে ২০০৮ সালে সবজি-ফসলের পোকা-মাকড়, রোগ-বালাই দমনে ভেষজ বালাইনাশক কিটনাশক উদ্ভাবিত শুরু করেন। পরে ২০১০ সালে তিনি পরিক্ষামূলক ভেষজ বালাইনাশক কিটনাশক বেশ কিছু ফসলি জমিতে ব্যবহার করেন। ওই সময়ে তিনি স্থানীয় কৃষকদের মাঝে বিনামুল্যে এসব ভেষজ বালাইনাশক কিটনাশক বিতরণ করেন। সেই থেকে গত ৬ বছর ধরে আবদুল লতিফের ভেষজ বালাইনাশক কিটনাশক ব্যবহারে কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন আর সফল হয়েছেন তিনি।
ভেষজ বালাইনাশক কিটনাশক উদ্ভাবনকারী আবদুল লতিফ দ্য রিপোর্টকে জানান, ফসলের পোকা মাকড় দমনে বিঘা প্রতি বাজারে প্রচলিত রাসায়নিক কিটনাশ ব্যবহারে ৭০০ থেকে ৮০০ ও সেক্সফেরোমোনে ৫০০ টাকা খরচ হয়। কিন্তু ভেষজ বালাইনাশক কিটনাশক ব্যবহারে বিঘা প্রতি খরচ হয় মাত্র ৫০ থেকে ১০০ টাকা। এতে প্রতি বিঘায় ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা সাশ্রয় হচ্ছে কৃষকদের। পাশাপাশি উৎপাদিত ভেষজ বালাইনাশক কিটনাশক ব্যবহারে স্বাস্থ্যঝুঁকি ছাড়াই পরিবেশবান্ধবভাবে বিষমুক্ত বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করতে পারছেন কৃষকরা।
তিনি আরও জানান, স্থানীয়ভাবে ভেষজ বালাইনাশক কিটনাশক উদ্ভাবিত হলেও দিনদিন চাহিদা বেড়ে যাচ্ছে। এ কারণে তিনি নিজস্ব জমিতে ভেষজ বাগান তৈরী করেছেন। তাছাড়া আশপাশের বন জঙ্গল থেকে বিভিন্ন গাছ,লতাপাতা ও কান্ড সংগ্রহ করেন। সংগ্রহ করা ভেষজ গাছ ও লতাপাতার মধ্যে নিমপাতা, মেহগনি গাছের বিচিসহ বিভিন্ন গাছ ও পাতা রয়েছে। এসব ভেষজ গাছ, লতাপাতা ও কান্ড পানির মধ্যে ভরে পাত্রে রেখে দেন। এরপর কিছুদিন যাওয়ার পর তা পাত্র থেকে বের করে আবারও পানি দিয়ে মিশ্রিত করা হয়। পরে ছেকনি দিয়ে ছেকে বোতলজাত করা হয়। বোতলে থাকা ভেষজ বালাইনাশক ফসলি জমির পরিমান মতো পানি মিশিয়ে স্প্রে করা হয়।
আবদুল লতিফ জানান, বর্তমানে তার উদ্ভাবিত ভেষজ বালাইনাশক কিটনাশক ‘আদর্শ এগ্রোফার্মের ব্যানারে সাদিফা’ নামে বাজারজাত করছেন। ইতোমধ্যে ভেষজ বালাইনাশক কিটনাশক জেলার মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। তবে প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে সারাদেশের কৃষকদের মাঝে ভেষজ বালাইনাশক কিটনাশকের ব্যবহার বাড়াতে সরকারকে উদ্যোগী হওয়ার দাবী জানান।
বোগদহ গ্রামের সরিষা চাষী লাল মিয়া অনেকটা হাসি ভরা মুখে জানান, লাউ কুমড়া, বেগুনসহ সব ধরনের সবজি ও সরিষা ভুট্টা ধানসহ অন্যান্য ফসলেও স্থানীয়ভাবে উদ্ভাবিত ভেষজ বালাইনাশক কিটনাশক ব্যবহার করছেন। প্রথম দিকে মনে কিছুটা শংকা নিয়ে ব্যবহার করলেও পরে ফল ভালো পাওয়ায় এখন অনেকটা ভেষজ বালাইনাশক কিটনাশকের প্রতি নির্ভরশীল।
একই গ্রামের হয়রত আলী, আজিবর রহমান ও নুরুল ইসলাম জানান, চলতি মৌসুমে এলাকার প্রায় তিন শতাধিক কৃষক লতিফের উদ্ভাবিত ভেষজ বালাইনাশক কিটনাশক ব্যবহার করছেন। ভেষজ বালাইনাশক ব্যবহারে তারা ভালো ফলন পেয়েছেন। অল্প সময়ের মধ্যে ভেষজ বালাইনাশকের আরও দ্বিগুন চাহিদা বেড়ে যাবে।
যমুনাপাড়ার সবজি চাষি নজরুল ইসলাম ভেষজ বালাইনাশক সর্ম্পকে জানান, বর্তমানে বাজারে পাওয়া আসল মোড়কে নকল রাসায়নিক কিটনাশক ব্যবহারে ফসলি জমির পোকামাকড় কমছে না। উল্টো এসব ব্যবহারে ফসলের ক্ষতি হচ্ছে। সেই সাথে নষ্ট হচ্ছে আবাদি জমির উর্বরতা। ফলে খারাপ ফলন ও আর্থিক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন চাষীরা। এ কারণে অল্প টাকায় ভেষজ বালাইনাশক ব্যবহারে ফসলের জমির পোকামাড়ক থাকছেনা। পাশাপাশি ফসলের উৎপাদনও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
আবদুল লতিফের উদ্ভাবিত ভেষজ বালাইনাশক ফসলে ব্যবহার করে মড়ক ও পোকা মাকড় দমনে ভাল ফলনের খবর পেয়ে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ছাহেরা বানু সম্প্রতি আবদুল লতিফের ভেষজ বাগান ও ভেষজ বালাইনাশক ব্যবহার করা বিভিন্ন ফসলি জমি পরিদর্শন করেন। এসময় সবজি-ফসলের জমিতে ভেষজ বালাইনাশক ব্যবহারে কি পরিমানে উপকার হয় তা কৃষকদের কাছে জানতে পারেন।
আবদুল লতিফের উদ্ভাবিত ভেষজ বালাইনাশক সর্ম্পকে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ছাহেরা বানু দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘লতিফের ভেষজ বালাইনাশক ব্যবহারে কৃষকরা ফসল ফলিয়ে লাভবান হচ্ছেন। তবে উৎপাদিত এসব ভেষজ বালাইনাশক ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হবে। পরীক্ষা শেষে ভেষজ বালাইনাশকের গুনাগুন নিশ্চিত হলে আরও বেশি পর্যায়ের কৃষকরা যাতে এর ব্যবহার করে সেজন্য তাদের পরামর্শ দেওয়া হবে’।

