শুধু সরিষা থেকে ২ কোটি টাকার মধু!
সনজিৎ কুমার মহন্ত, রংপুর প্রতিনিধি:
রংপুর অঞ্চলে মৌ চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। আগে বিক্ষিপ্ত ভাবে দুএকটি সংগঠনের উদ্যোগে এবং ব্যক্তি পর্যায়ে বক্সের মাধ্যমে মৌ চাষ হলেও চলতি বছরেই প্রথম কৃষি বিভাগের পৃষ্টপোষকতায় পরিকল্পিত ভাবে মধু চাষ শুরু হয়েছে। শুধু সরিষা নয় আম লিচু ধনিয়া এবং মিষ্টি কুমড়া সহ অন্যান্য ফসলের মৌসুমেও মৌ চাষ করলে সারা বছরেই মধু পাওয়া যাবে পাশাপাশি মৌমাছির মাধ্যমে পরাগয়নের ফলে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।
এদিকে দেশ বিদেশে মধুর ব্যাপক চাহিদা থাকায় স্বল্প পুঁজিতে মৌ চাষ করা সম্ভব বলে মৌ চাষের সাথে সংশিলষ্টের দাবি।
আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, শুধু সরিষা চাষের ওপর নির্ভর করে ২০১৫-১৬ মৌসুমে প্রায় ১হাজার ৪শ ১৪ মণ মধু সংগৃহীত হয়েছে। যার বাজার মূল্য প্রায় ২কোটি টাকা। উৎপাদিত মধু মাত্র ৫ হাজার ৯শ ৯৯ হেক্টর সরিষার জমি থেকে ৩ হাজার ৬৪৮ টি বক্সের মাধামে সংগৃহীত হলেও তা আরো কয়েক গুণ বেশি জমিতে মৌ চাষ করা সম্ভব ছিলো। কিন্তু পর্যাপ্ত মৌচাষী না থাকায় তা সম্ভব হয়নি বলে সূত্রটি জানায়।
রংপুর জেলায় ১শ ৫০ হেক্টর জমিতে ৮৮টি বাক্সের মাধ্যামে মধু সংগৃহীত হয়েছে ৩শ৩০ কেজি। গাইবান্ধা জেলায় ২শ ৫৩ হেক্টর জমিতে ৯শ ৯টি বাক্সের মাধ্যামে মধু সংগৃহীত হয়েছে ৭ হাজার ৭৩৫ কেজি। কুড়িগ্রাম জেলায় ৫ হাজার ৩শ ৪৭ হেক্টর জমিতে ২ হাজার ৫শ ৪৮টি বক্সের মাধ্যামে মধু সংগৃহীত হয়েছে ৪৮ হাজার ৩২৫ কেজি, লালমনিরহাট জেলায় ১৪ হেক্টর জমিতে ৮৩টি বাক্সের মাধ্যামে মধু সংগৃহীত হয়েছে ১শ ১২ কেজি এবং নীলফামারী জেলায় ২শ ৩৫ হেক্টর জমিতে ২০টি বক্সের মাধ্যামে মধু সংগৃহীত হয়েছে ৪০ কেজি।
কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারি উপজেলার কোমর ডাঙ্গি গ্রামের মৌ চাষী ফরহাদ আলী বলেন, গত ১৫ নভেম্বর থেকে ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত সরিষার জমিতে ২শ বক্স্রের মাধ্যমে ১শ ৮ মণ মধু সংগ্রহ করেছেন। এ ছাড়া ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে ২০ মার্চ পর্যন্ত লিচুর বাগানে বাক্স বসিয়ে ২৭ মণ মধু সংগ্রহ করেছেন। মধু আরো বেশি সংগ্রহ হতো কিন্তু শিলাবৃষ্টির কারনে তা সম্ভব হয়নি। তার উৎপাদিত মধু প্রতি মণ ৭ হাজার টাকা পাইকারি দরে প্রাণ গ্রুপকে দিয়েছেন। বর্তমানে তিনি মধু সংগ্রহের জন্য তার মৌমাছির বাক্স সহ খুলনার সুন্দর বন এলাকায় অবস্থান করছেন। তার ৪জন কর্মচারী রয়েছে। তাদের প্রত্যেককে ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা করে মাসে দিতে হয়।
তিনি বলেন, গত ৩ বছর থেকে মৌ চাষের সাথে সংপৃক্ত। ১টি বক্সে মৌমাছি আছে ৩৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার পর্যন্ত। প্রথমদিকে একটি বক্সে মৌমাছি ভরাতে খরচ হয়েছে প্রায় ৬ হাজার টাকা। পরে নিজের উৎপাদিত মৌমাছি দিয়ে আস্তে আস্তে বক্স বৃদ্ধি করেছেন। এমনকি বর্তমানে তিনি ২ থেকে ৩ লাখ টাকার মৌমাছি বিক্রি করেছেন।
স্থানীয় মৌ চাষীর সংখ্যা কম হলেও খুলনা ,সাতক্ষিরা এবং ঝিনাইদহ সহ বিভিন্ন এলাকা থেকে উল্লেখযোগ্য হারে মৌচাষী রংপুর অঞ্চলে আসা অব্যাহত রয়েছে। নাম না করার শর্তে বেশ কয়েকজন মৌচাষী বলেন, রাস্তায় মাঝে মাঝে পুলিশ টাকার জন্য বাক্স বহনকারি ট্রাক আটক করে বিভিন্ন অজুহাতে হয়রানি করছেন। তাদের দাবি আপনাদের কামাই ভালো তাই আমাদের কিছু দিতে হবে। বিশেষ করে খুলনা রুটে এ ধরনের হয়রনি বেশি হচ্ছে তিনি দাবি করেন।
দীর্ঘ দিন এ অঞ্চলে হতদরিদ্রদের সংঘটিত করে বক্স্রে মধু চাষের মাধ্যমে জীবন মানের পরিবর্তনের সুযোগ করে দেয়া অন্যতম আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবি সংগঠন কেয়ার বাংলাদেশ এর গ্রামীণ অতি দরিদ্র কর্মসূচীর পরিচালক আনোয়ারুল হক বলেন, মৌচাষে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এগিয়ে আসা একটি ইতিবাচক প্রদক্ষেপ। এতে তাদের ব্যাপক লোকবলকে কাজে লাগিয়ে মৌচাষকে স্থায়ি রুপ দেয়া সম্ভব । যা দারিদ্র বিমোচনে বিরাট ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি কোন ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার ছাড়াই ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। তিনি বলেন ২০০৬ সাল থেকে কেয়ার এ ঞ্চলে মৌচাষে পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছে। বর্তমানে তাদের ২ হাজার বাক্স আছে ।
আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যান বিশেষজ্ঞ খোন্দকার মেসবাহুল ইসলাম বলেন, তাদের মহাপরিচালকের নির্দেশেই মৌচাষ বৃদ্ধিতে আগ্রহীদের প্রশিক্ষণ সহ বিভিন্ন ভাবে সহযোগিতা করা হচ্ছে। চলতি বছরে ৫ হাজার ৯শ ৯৯ হেক্টর সরিষার জমিতে মৌ চাষ করা হলেও এবারেই প্রায় ৪৪ হাজার ৭শ ৫ হেক্টর সরিষার জমিতে মৌ চাষ করা সম্ভব ছিলো। তাই মৌ চাষী বৃদ্ধির জন্য কৃষি বিভাগ থেকে বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, মৌ চাষের ফলে একদিকে যেমন মধু বিক্রির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। অন্যদিকে ফসলের জমিতে পরাগায়নের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। তিনি বলেন শুধু সরিষা চাষ থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মধু পাওয়া গেলেও আম লিচু এবং মিষ্ঠি কুমড়া সহ অন্যান্য ফসলে মৌ চাষ করে সারা বছর মধু পাওয়া সম্ভব।

