আধুনিক উপায়ে আনারস চাষ, বিপণন এবং সংরক্ষণ পদ্ধতি

হালিমা তুজ্জ সাদিয়াঃ

আনারস একটি পুষ্টিকর ও সুস্বাদু ফল। আনারসের বৈজ্ঞানিক নাম Anarus comosus; এটি Bromeliaceae পরিবারভুক্ত। গবেষকদের ধারণা আনারসের উৎপত্তিস্থল ব্রাজিলে।

আনুমানিক ১৫৪৮ সালের দিকে আমাদের অঞ্চলে আনরস এসেছে। আনারস উৎপাদনের শীর্ষে দেশগুলোর মধ্যে আছে কোস্টারিকা, ব্রাজিল, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ইন্ডিয়া। ২০১৪ সালের হিসাব মতে, বিশ্বে প্রায় সাড়ে ২৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন আনারস উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে কোস্টারিকায় পৃথিবীর ১১% আনারস উৎপাদিত হয়। বাংলাদেশের সিলেট, মৌলভীবাজার, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং টাঙ্গাইল জেলায় ব্যাপকভাবে চাষ হয়। ঢাকা, নরসিংদী, কুমিল্লা, দিনাজপুর জেলাতেও আনারস চাষা করা হয়। তবে পার্বত্য চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার, শ্রীমঙ্গল ও টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর এলাকার আনারস একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল হিসেবে বিবেচিত।

বর্তমানে দেশে ৫০ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমিতে আনারসের চাষ হচ্ছে।

বাণিজ্যিকভাবে আনারস একটি গুরুত্বপূর্ণ ফল। এটি এর মনােরম স্বাদ এবং গন্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়। এটি ভিটামিন এ এবং বি এর একটি ভাল উৎস এবং ভিটামিন সি, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, পটাসিয়াম এবং আয়রনের মতাে খনিজে সমৃদ্ধ। তাজা খাওয়া ছাড়াও ফলটি বিভিন্ন আকারে ক্যান সংগ্রহ এবং প্রক্রিয়াজাত করা যায়। বিশ্বে মোট বার্ষিক ১৪.৬টন ফল উৎপাদন হয়।

আনারসের বেশ কয়েকটি জাত আছে যা বিশ্ব সমাদৃত। এর মধ্যে হানিকুইন, জায়ান্টকিউ, ক্যালেন্ডুলা সবচেয়ে জনপ্রিয়।

স্বাভাবিক অবস্থায় আনারসের বীজ হয় না। তাই বিভিন্ন ধরনের চারার মাধ্যমে আনারসের বংশবিস্তার হয়। সাধারণত পার্শ্ব চারা, বোঁটার চারা, মুকুট চারা ও গুঁড়ি চারা দিয়ে আনারসের বংশবিস্তার হয়। এর মধ্যে পার্শ্ব চারা বাণিজ্যিকভাবে চাষের জন্য সবচেয়ে ভালো।

উপযুক্ত জলবায়ু:
ভারী বৃষ্টিপাতের অঞ্চলগুলি আনারসগুলি চাষের জন্য সেরা। সর্বোত্তম বৃষ্টিপাত প্রতি বছর ১৫০০ মিমি। যদিও এটি ৫০০ মিমি থেকে ৫৫৫০ মিমি বৃষ্টিপাত যুক্ত অঞ্চলে ভালোভাবে চাষ করা যেতে পারে।

আনারসটি আর্দ্র ক্রান্তীয় অঞ্চলে চাষের জন্য উপযুক্ত। ফল অভ্যন্তরে সেইসাথে সমুদ্র উপকূলে ভাল বৃদ্ধি হয়। তাপমাত্রা ১৫.৫ থেকে ৩২.৫ সেন্টিগ্রেড হওয়া ভালো। বেশি তাপমাত্রা, উজ্জ্বল রােদ এবং ছায়া ক্ষতিকারক।

উপযুক্ত মাটি:
আনারস চাষের জন্য ৫.৫ থেকে ৬.০ পিএইচ সমৃদ্ধ অ্যাসিডযুক্ত মাটি সর্বোত্তম হিসাবে বিবেচিত হয়।
আনারস লাগানোর সময় জমিটি ভালভাবে শুকানাের প্রয়োজন হয়। ভারি মাটিতে এই ফল ভালো হয় না।

জমি প্রস্তুতি:
জমিটিতে আল তৈরী করে জমি প্রস্তুত করা হয়। জমির প্রকৃতির উপর নির্ভর করে সুবিধাজনক দৈর্ঘ্যের পরিংখান প্রায় ৯০সেমি এবং প্রস্থ ১৫-৩০সেমি।

চাষের জন্য উপযোগী মৌসুম:
এটি একটি আর্দ্র গ্রীষ্মমন্ডলীয় উদ্ভিদ। সমতল অঞ্চলে এবং উচ্চতায় ৯০০ মিটারের মধ্যে ভালভাবে বৃদ্ধি পায়। এটি খুব উচ্চ তাপমাত্রা বা তুষারপাত সহ্য করতে পারে না।

সধারনত ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ফুল দেয় এবং ফল জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রস্তুত হয়ে থাকে। কখনও কখনও অন্য মৌসুমেও ফুল দেখা যায় এবং সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বরে ফল দেয়।

প্রয়ােজনীয় রােপণ সামগ্রী:
সাধারণত গাছটির উপরের অংশ তথা মুকুট দ্বারা নতুন গাছ তৈরি করা হয়। এই পদ্ধতিতে রােপণের ১২ মাস পরে গাছটি থেকে আনারসটি তোলার সময় মুকুট বাদ দেওয়া হয় যা থেকে নতুন গাছ তৈরি করা হয়।

গাছ লাগানোর ঘনত্ব:
বাণিজ্যিকভাবে চাষ করার জন্য রোপনের ঘনত্ব ৫৩,৪০০ গাছ/হেক্টর পরামর্শ দেওয়া হয়। উচ্চ বৃষ্টিপাত এবং পার্বত্য অঞ্চলে গাছের ঘনত্ব ৩১০০০/হেক্টর এর কিছুটা কম হওয়া উচিত।

সেচের প্রয়ােজনীয়তা:
বেশিরভাগ সময় বৃষ্টিপাতের পরিস্থিতিতে নির্ভর করে এই ফল চাষ করা হয়। পরিপূর্ণ সেচ, সর্বোত্তম বৃষ্টিপাত হওয়া অঞ্চলে ভাল আকারের ফল উৎপাদন করতে সহায়তা করে।
তবে অন্য সময়েও গাছটি রোপন করা যায়। অল্প বৃষ্টিপাত এবং গরম আবহাওয়ার ক্ষেত্রে ২০-২৫ দিনের মধ্যে একবার সেচ দেওয়া যেতে পারে।

গাছের পােকা এবং রােগসমূহ:
গাছটিকে পোকামাকড় এবং রোগ জীবানু থেকে মুক্ত রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, আনারস রােপণের আগে জীবানুনাশক মিশিয়ে বীজ শোধন করে নিতে হবে।

সংগ্রহ ও ফলন:
গাছ রােপণের ১২-১৫ মাস পরে ফুল ফোটে। জাত ও তাপমাত্রার উপর নির্ভর করে রােপণের ১৫-১৮ মাস পরে ফল পরিপক্ব হয়ে যায়।

ফল সাধারণত ফুল ফোটার প্রায় ৫ মাস পরে পাকে। গড় ফলন হেক্টর প্রতি ৫০-৬০টন। গাছ লাগানোর পর প্রায় পাঁচ বছর পর্যন্ত গাছটি বেঁচে থাকতে পারে। যদিও বাণিজ্যিকভাবে চাষ করার জন্য গাছ উপড়ে ফেলে পুনরায় নতুন গাছ লাগানো হয়।

বিপণন:
বর্তমান বাজারগুলিতে সর্বদা আনারসের খুব ভাল চাহিদা থাকে। খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পেও এটির উচ্চ চাহিদা আছে। আনারসকে নেপাল, যুক্তরাজ্য, স্পেন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে রপ্তানি করা হয়।

আনারস সংরক্ষণ :
আমাদের দেশে আনারস সাধারণত তাজা পাকাফল হিসেবে গ্রহণ করা হয়। শরীরের চাহিদামতো পুষ্টি সরবরাহ করতে হলে ফল উৎপাদন, আহরণ, বাজারজাতকরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদিত ফলের এক বিরাট অংশ সংগ্রহের পর বিভিন্ন পর্যায়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশে উৎপাদিত ফল ও সবজির ২৫ থেকে ৪০ ভাগই সংগ্রহের পর বিভিন্ন পর্যায়ে নষ্ট হয়ে যায়। তাই মানুষের যথাযথ পুষ্টি যোগানে বাংলাদেশে নিরাপদ ফল চাষের গুরুত্ব যেমন অধিক- অপরদিকে বিশাল পরিমাণের এই ফলমূল পঁচনের হাত থেকে বাঁচাতে প্রক্রিয়াজাত সম্পর্কে অবগত থাকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে ভরা মৌসুমে ফলের অধিক সরবরাহের ফলে দাম অনেক কমে যায়, ফলে কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়। ফলে সংগ্রহের পর যথাযথভাবে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ করা হলে একদিকে অপচয় কমবে, অপরদিকে উৎপাদনকারীরাও ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হবে না। উন্নত প্যাকেজিংয়ের মাধ্যমে বেশি দিন ফল সংরক্ষণ, আকর্ষণীয় বাজারে মূল্য প্রাপ্তি এবং বিদেশে রপ্তানিসহ সর্বোপরি সকলের পুষ্টি নিশ্চিত সম্ভব।

 

  •  
  •  
  •  
  •