বৃষ্টি-বন্যা ছাড়াই পানির নিচে ফসল
পটুয়াখালী সংবাদদাতা:
পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার বীজবর্ধন খামারের মুগডালের প্রথম ধাপের ফসল পাকতে শুরু করেছে। গত সপ্তাহ ধরে পানির নিচে তলিয়ে থাকায় ফল নষ্ট হচ্ছে; ইনসেটে দ্বিতীয় ধাপের ফুল বের হলেও গাছ পচে যাচ্ছে।
মুগ ডালের প্রথম ধাপের ফল এখন পাকতে শুরু করেছে। এরপর দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ ধাপের ফল বের হবে। সেই ফল গোলায় উঠবে। মধ্য ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত মুগ চাষের সময়। কিন্তু বৃষ্টি, বন্যা শুরু হওয়ার আগেই প্রথম ধাপের ফলসহ গাছ জোয়ারের পানিতে পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এমন অবস্থা দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চলের (বরিশাল-পটুয়াখালী) বীজবর্ধন খামার দশমিনার।
শুধু মুগই নয়, জোয়ারের পানিতে পচে নষ্ট হয়ে গেছে আলু। ক্ষতির মুখে সয়াবিন, ফেলন, তিলসহ বিভিন্ন প্রজাতির রবিশস্য। পানি শুধু ফসলই ভাসিয়ে নিচ্ছে না, প্রতিদিনই তেঁতুলিয়া নদীর থাবায় ছোট হয়ে যাচ্ছে বীজবর্ধন খামার। ফলে খামারটি অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। শুরু থেকে এ অবস্থায় থাকায় বীজ উত্পাদন হয়তো কঠিন হয়ে পড়বে।
সরেজমিনে ওই খামার ঘুরে দেখা গেছে, একরের পর একর জমির মুগ জোয়ারের পানির নিচে। জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে মুগের প্রথম পর্যায়ের ফল বের হওয়ার পরপর গাছ পচে গেছে। ফলে চলতি মৌসুমে মুগের উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় চার ভাগের এক ভাগে নেমে আসবে। অকালে জলাবদ্ধতার কারণে গাছ মরে যাওয়ায় যা উত্পাদন হবে সেই ফল পুষ্ট হবে না। ফলে যতটুকু মুগ এ বছর পাওয়া যাবে, তা বীজ হিসেবে ততটা মানসম্মত হবে না। ইতিমধ্যে জোয়ারে ভেসে যাওয়ায় ক্ষেত থেকে অসময়ে আলু তুলতে হয়েছে। ওই আলুর বেশির ভাগই পচে গেছে।
চলতি মৌসুমে ওই খামারে ২০ একর জমিতে আলু, ৫০ একর জমিতে মুগ, দুই একর জমিতে সয়াবিন, পাঁচ একর জমিতে তিল, ২৫ একর জমিতে খেসারি, ১০ একর জমিতে ফেলন, পাঁচ একর জমিতে সূর্যমুখী ও ২০ একর জমিতে গম চাষ করা হয়। উন্নত জাতের বীজের জন্য এসব ফসল চাষ করা হলেও অধিকাংশ ফসল জোয়ারের পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
উন্নত বীজ উত্পাদনের স্বার্থে মাঠপর্যায়ে কাজ করা বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) সহকারী পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম, মো. মামুনুর রেজা, মো. ইকবাল হোসেন ও সুনীতি কুমার সাহা জানান, খামারের চারদিকে বেড়িবাঁধ না থাকায় জোয়ারের পানি সহজেই খামারে ঢুকে পড়ায় দ্রুত পচনশীল ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাঁরা মনে করেন, এ ক্ষেত্রে জরুরি ভিত্তিতে বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রয়োজন।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালে কৃষি মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব অর্থায়নে ২৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে বীজবর্ধন খামারের এ প্রকল্প নেওয়া হয়। দশমিনার চর বাঁশবাড়িয়া ও চর বোতামে ১০৪৪.৩৬ একর জমির ওপর ওই বছরের ১৯ মার্চ খামারের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। ওই জমি অধিগ্রহণে ব্যয় হয় প্রায় ৩৯ কোটি টাকা। পর্যায়ক্রমে ওখানে নির্মিত হয় বীজ সংরক্ষণের জন্য গুদাম, ওই প্রকল্পে কর্মরতদের জন্য নির্মিত হয় বহুতল অফিস ও আবাসিক ভবন। ইতিমধ্যে জমি চাষ করে বীজ উত্পাদন ও পরিবহনের জন্য কয়েক কোটি টাকার বিভিন্ন উত্পাদন যন্ত্রাংশ কেনা হয়েছে। প্রকল্প চালু হওয়ার পর ২৮০ একর জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ২৫০ কোটি টাকার মধ্যে ইতিমধ্যে বিভিন্ন খাতে প্রকল্পের ১০৬ কোটি টাকা ব্যয় হলেও প্রকল্পটি এখন পর্যন্ত সম্ভাবনা তৈরি করতে পারেনি।
এদিকে সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ভৌগোলিক বা অবস্থানগত কারণে নদীর পারে গড়ে তোলা প্রকল্পের ওই জমি আগে থেকেই তেঁতুলিয়ার অব্যাহত ভাঙনের মুখে ছিল। তাই প্রকল্প গ্রহণ করার আগে ভাঙন রোধে ব্লক দিয়ে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হলে প্রায় ৩০০ একর জমি নদীগর্ভে বিলীন হতো না। পরিকল্পনায় ভুল থাকায় প্রকল্পটি অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। ভাঙন রোধে পরিকল্পিত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে পুরো খামারটি শিগগিরই বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
২০১৪ সালে ভাঙন রোধে নৌবাহিনী প্রায় তিন কিলোমিটার নদীর গতিপথ পরিবর্তনের জন্য নদী খনন করে। এতে ব্যয় হয় প্রায় ১৮ কোটি টাকা। কিন্তু ওই টাকা ব্যয়ে যে খননকাজ সম্পন্ন করা হয়েছে, তা কোনো কাজেই আসেনি বলে দাবি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। বরং ভাঙন আগের চেয়ে আরো তীব্র হয়েছে। ভাঙনের তীব্রতায় হুমকির মুখে রয়েছে নতুন একাধিক ভবন। বর্তমানে ড্রেজিং করে নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কাজ চললেও তা খামারের কোনো উপকারে আসছে না।
অন্যদিকে জনপ্রিয় সুগন্ধি কালিজিরা বা বালাম প্রজাতির ধানবীজসহ স্থানীয় জাতের ডাল ও তৈলবীজ সংগ্রহ করে কৃষকের মাধ্যমে তা ছড়িয়ে দিতে চায় সরকার। একই সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের শস্যভাণ্ডারের সুনাম ধরে রাখতে পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার চর বাঁশবাড়িয়া ও চর বোতামে এ বীজবর্ধন খামার গড়ে তোলা হয়। ওই খামারকে ঘিরে কৃষক ও বিএডিসি স্বপ্ন দেখা শুরু করে। কিন্তু পরিকল্পনার অভাবে সেই স্বপ্ন ম্লান করে দিচ্ছে রাক্ষুসে তেঁতুলিয়া নদী।
ওই খামারের প্রকল্প পরিচালক আলমগীর হোসেন বলেন, ‘বেড়িবাঁধ না থাকায় খামারে যেসব সমস্যা তৈরি হচ্ছে, তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। পক্ষান্তরে ভাঙন রোধে নদীর গতিপথ পরিবর্তন করে দুই বছর ধরে ড্রেজিংয়ের কাজ চলছে।’
সূত্র: কালেরকন্ঠ

