কেমন আছেন চাতাল কন্যারা ?

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি:

দেশের চাউল উৎপাদনের অন্যতম মোকাম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ। এখাকার তিন শতাধিক চালকলে কাজ করেন দশ হাজারেরও বেশি নারী শ্রমিক। দিন রাত বৃষ্টিতে ভিজে রোদে পুড়ে মানুষের অন্ন যোগানো এই শ্রমিকেরা ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছেন যুগের পর যুগ।

তাদের ঘাম ঝরা পরিশ্রমের নামমাত্র দিয়ে চাতাল মালিকরা প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ টাকা আয় করে বিত্ত-বৈভবের পাহাড় গড়ছেন।

জানা যায়, ১৯৮০ সালের প্রথম দিকে আশুগঞ্জে চাতাল কলের গোড়াপত্তন শুরু হয়। ধীরে ধীরে সড়ক পথ, রেলপথ ও নৌপথে যোগাযোগ সহজ ও অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধার কারনে এখানে এ শিল্পের দ্রুত প্রসার ঘটে। এছাড়া এখানে দেশের অন্যতম বৃহত্তম আশুগঞ্জ তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গ্যাসের সহজ লভ্যতার ফলে চাতাল কল স্থাপন দিনে দিনে বৃদ্ধি পেতে থাকে।

এ চাতাল কলগুলো থেকে প্রতিদিন ৩০/৩৫ হাজার টন চাল দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে। আর এই চাতাল কলগুলোতে ধান সিদ্ধ করা থেকে শুরু করে চাউল বস্তাবন্দী করা পর্যন্ত সকল কাজ করতে হয় নারী শ্রমিকদের। কিন্তু এসমস্ত নারী শ্রমিকরা হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রম করেও ঠিকমত বেতন পায় না,এ অভিযোগ তাদের ।

তারা জানান, ভোর থেকে শুরু করে সারাদিন পরিশ্রম করতে হয়। পরিশ্রম অনুযায়ী বেতন না পেয়ে একবেলা খেয়ে অন্যবেলা না খেয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন তারা।

জন্মনিয়ন্ত্রণ কি এ কথা জানেন না এখানকার অনেক নারী। তাদের একজন নারী শ্রমিক সবুরা খাতুন(২৬)। তিনি জানান, তার বিয়ে হয়েছে একই চাতাল কলের শ্রমিক শফিক এর সাথে ২০০২ সালে। বর্তমানে তার ৫ ছেলে ১ মেয়ে। তিনি জানান, তার ছেলেমেয়েরা এক বছর পর পর জন্ম নিয়েছে। জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি কি এবং তা কিভাবে ব্যবহার করতে হয় তা সে জানে না এবং এ পর্যন্ত সরকারী কোন পরিবার পরিকল্পনা কর্মীও তাদের কাছে যায়নি। যার ফলে প্রতি বছর তাদের মধ্যে জনসংখ্যার হার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর কারণ এখানে শিক্ষার কোন সুযোগ নেই। এখানকার নারী শ্রমিকদের ছেলেমেয়েরা একটু বড় হলেই চলে বাল্যবিবাহ। যার ফলে পড়ালেখা করার কোন সুযোগ পায় না।

একই অবস্থা দেখা যায় এখানকার অন্যান্য চাতাল কলগুলোতে। চাতাল কলগুলোতে শ্রমিকদের নিয়ে কোন নীতিমালা না থাকায় যে যা মনে চায় তাই করে।

আবার অনেকেই জীবনকে বাঁচানোর জন্য পরিবার-পরিজনের তাগিদে এ হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করতে বাধ্য হচ্ছেন। এদের কারো বাড়ি কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা,সুনামগঞ্জ, বরিশাল, সাতক্ষীরা, নওগাঁ ও ময়মনসিংহ। তারা কেউ কেউ এই কাজ করছেন জন্ম থেকেই। আবার কেউ বা কাজের সন্ধানে এসে কাজ করছেন।
তাদের মধ্যে একজন নূরজাহান। তিনি ২০ বছর যাবৎ এখানে কাজ করছেন। তার ৬ মেয়ে ১ ছেলে। তিনি জানান, চাতাল কলে কাজ করে প্রতি মাসে যে সামান্য পরিমাণ টাকা পাওয়া যায় তা দিয়ে দু’ বেলা পেট পুরে খাওয়াই জোটে না। তার উপর ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার কথা চিন্তাই করা যায় না। তার কাজের পাশাপাশি ছেলেমেয়েদের দিয়েও কাজ করাতে হচ্ছে।

তবে তিনি চিন্তিত এই ভেবে, যে তার ৬ টি মেয়েকে কিভাবে বিয়ে দিবে। কারণ বিয়ে দিতে গেলে প্রয়োজন মোটা অংকের টাকা। যা যৌতুক বাবদ ছেলে পক্ষকে দিতে হয়। কিন্তু তিনি যে কাজ করছেন সে কাজ করে যা পান বর্তমান দ্রব্যমূল্যের বাজারে তা থেকে টাকা জমিয়ে রাখা যায় না।

মাজেদা বেগম বলেন, দিন-রাত পরিশ্রম করে যে আয় হয় তা দিয়ে কোন রকমে খেয়ে না খেয়ে বেঁচে আছি। মাঝে মধ্যে অসুস্থ হলে ডাক্তার দেখানো তো দুরের কথা ঔষুধ কেনার টাকাই থাকে না।

  •  
  •  
  •  
  •  

Tags: